গরিবের বন্ধু ডা. খোকন রেজা

নিজ চেম্বারে রোগী দেখছেন ডা. খোকন রেজা
যেখানে একজন এমবিবিএস চিকিৎসক ফি নেন ৫০০ থেকে ৬০০ টাকা, সেখানে মাত্র ৫০-১০০ টাকায় বা কোনো কোনো রোগীকে বিনামূল্যে চিকিৎসাসেবা দিয়ে মানবতার অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন মেহেরপুরের গাংনী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের মেডিকেল অফিসার মো. খোকন রেজা।
প্রতিদিন বিকাল থেকে রাত পর্যন্ত স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে তার কোয়ার্টারের ছোট্ট চেম্বারে ভিড় করেন রোগীরা। তাদের কেউ দিনমজুর, কেউ কৃষক, কেউবা রিকশাচালক, আবার কেউ বিধবা।
অর্থের অভাবে যেন কেউ চিকিৎসা বঞ্চিত না হন, এই বিশ্বাস থেকে বছরের পর বছর ধরে তিনি হাসপাতালে সরকারি দায়িত্ব পালন শেষে ব্যক্তিগত চেম্বারে নামমাত্র ফিতে রোগী দেখেন। অনেক রোগীর আর্থিক অবস্থার কথা জেনে ফি নেন না। কখনো প্রয়োজনীয় পরামর্শ ও ওষুধ দিয়ে সাহস জোগান। তার এই অসাধারণ মানবিক উদ্যোগের কারণে এরই মধ্যে তিনি এলাকার মানুষের কাছে ‘গরিবের ডাক্তার’ হিসেবে পরিচিতি পেয়েছেন।
খোকন রেজার বাড়ি ময়মনসিংহ সদরের চুকাইতলা-আকুয়া এলাকায়। স্ত্রী ও দুই মেয়েকে নিয়ে তার সংসার। ১৯৯৪ সালে ময়মনসিংহ মুকুল নিকেতন থেকে মাধ্যমিক ও আনন্দমোহন কলেজ থেকে ১৯৯৬ সালে উচ্চমাধ্যমিক পাস করেন। ২০০৬ সালে রংপুর মেডিকেল কলেজ থেকে এমবিবিএস পাস করেন তিনি। ২০১২ সালের ডিসেম্বরে তিনি মেহেরপুরের গাংনী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে মেডিকেল অফিসার হিসেবে যোগ দেন। এর পর থেকে নিষ্ঠা, আন্তরিকতা ও মানবিক আচরণের মাধ্যমে তিনি হাজারো মানুষের আস্থা অর্জন করেছেন।
আগামীর সময়কে ডা. খোকন রেজা বলেছেন, ‘আমি যখন গাংনী স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে যোগদান করি, তখন থেকে মনে হয়েছে, এখানকার মানুষ খুবই অবহেলিত। অধিকাংশ মানুষ নিম্ন আয়ের কৃষক। অনেকের ওষুধ কেনার টাকা নেই। হাসপাতালের দেওয়া ওষুধের বাইরেও নিজের টাকায় ওষুধ কিনে অসুস্থ মানুষকে সুস্থ করেছি। একজন চিকিৎসক হিসেবে নয়; একজন মানুষ হিসেবে মানুষের উপকারে আসতে পেরে নিজের কাছে ভালো লাগা তৈরি হয়েছে। এটা আমার পারিবারিক শিক্ষা।’
‘আমার নির্ধারিত কোনো ফি নেই। কেউ ১০০ টাকা, ৫০ টাকা দেয়। প্রতিদিন যাদের চিকিৎসা দিই, তাদের বেশিরভাগের কাছ থেকে টাকা নিই না’— যোগ করেন তিনি।
খোকন রেজার কাছে চিকিৎসা নিতে আসা ষাটোর্ধ্ব আবু তালেবের ভাষ্য, চিকিৎসা নিতে এলে খোকন রেজা আমার পেশা ও পরিচয় জানতে চান। আমি দিনমজুর জেনে তিনি আমার কাছ থেকে কোনো টাকা নেননি। উপরন্তু আমাকে বিনা পয়সায় অনেক ওষুধ দিয়ে বললেন দোয়া করতে।
আরেক রোগী খাদিজা বেগম জানালেন, শ্বাসকষ্ট নিয়ে তিনি ডা. খোকন রেজার কাছে এসেছেন। তাকে ওষুধ-ইনহেলার দিয়েছেন বিনামূল্যে।
গাংনী সরকারি পাইলট হাইস্কুল অ্যান্ড কলেজের সাবেক শিক্ষক সিরাজুল ইসলাম বলেছেন, ডা. খোকন রেজা প্রমাণ করেছেন— মানুষের প্রতি ভালোবাসা, দায়িত্ববোধ ও সেবার মানসিকতা একজন চিকিৎসকের সবচেয়ে বড় পরিচয়। তার এই মানবিক উদ্যোগ শুধু গাংনী বা মেহেরপুরেই নয়; সারা দেশের চিকিৎসক সমাজের জন্যও হতে পারে অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত।
গাংনী স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা একরামুল হক বললেন, ‘আমি এখানে যোগদান করার পর থেকে দেখি, খোকন রেজা হাসপাতালে দায়িত্ব পালন শেষে বাসায় রোগী দেখেন বিনামূল্যে। এখানে অনেক ক্লিনিক বা ডায়াগনস্টিক সেন্টার থাকলেও তিনি কোথাও বসেন না। রোগীরাও তাকে চেনেন চিকিৎসাপাগল মানুষ হিসেবে।’
মেহেরপুরের সিভিল সার্জন আবু সাইদের ভাষ্য, একজন মানুষের জীবন-জীবিকার ক্ষেত্রে যেমন অর্থের প্রয়োজন আছে, তেমনি মানুষের ভালোবাসা আর দোয়ারও প্রয়োজন আছে। ডা. খোকন রেজা বর্তমান সমাজের এক দৃষ্টান্ত।




