রাস্তা থেকে রাজপ্রাসাদে

সংগৃহীত ছবি
বছর কুড়ি আগে ফরাসি স্টুডিও খেলাধুলা নিয়ে একটা অ্যানিমেশন সিরিজ বানিয়েছিল, চলতি ভাষায় আমরা যেটাকে বলি কার্টুন। ফরাসিতে ‘ফুট ২ রু’, ইংরেজিতে স্ট্রিট ফুটবল, বাংলায় বলা যায় গলি ফুটবল। যেভাবে হরতালের দিনে কিংবা মাঠগুলো দখল হয়ে যাওয়ার কারণে রাজধানী ঢাকার অ্যাপার্টমেন্টের গ্যারেজে, এলাকার রাস্তায় কংক্রিটের ওপর স্থানীয় শিশু-কিশোররা ফুটবল খেলে, প্যারিসের উপকণ্ঠে সস্তা বাসা ভাড়ার এলাকাগুলোতে যেখানে অভিবাসীরা গাদাগাদি করে থাকে, সেখানেও পার্কিং লট আর গ্যারেজে চলে নিজস্ব ধরনের ফুটবল। অ্যানিমেশনে দেখানো হয়, পাঁচটি অনাথ কিশোর-কিশোরীর গল্প, যাদের ভালোবাসা ফুটবল ঘিরে আর এই ফুটবলই তাদের জীবন বদলে দেয়। কে জানত, এ কল্পনাই একদিন সত্যি হবে, কিলিয়ান এমবাপ্পে আর ওসমান দেম্বেলেদের মতো বৈশ্বিক তারকা ফুটবলাররা উঠে আসবেন এই স্ট্রিট ফুটবল থেকে!
ফুটবলের জন্ম যদিও ইংল্যান্ডে, খেলাটা প্রাণ পেয়েছে দক্ষিণ আমেরিকায়। ইউরোপের রসকষহীন শারীরিক লড়াই নয়, ব্রাজিলের নাচের ছন্দের আদলে জিঙ্গা ফুটবলই দর্শককে আনন্দ দিয়েছে বেশি। পেলে, রোনালদিনহো থেকে নেইমার, প্রত্যেকের ফুটবল সত্তার মাঝেই লুকিয়ে ছিল এক নৃত্যশিল্পী। তারা বল পায়ে নাচের মুদ্রার মতোই ভঙ্গিতে প্রতিপক্ষকে বোকা বানাতেন। তবে আধুনিক যুগের শক্তি আর গতিনির্ভর ফুটবলে শুধু সাবলীলতা দিয়ে টিকে থাকা যায় না। এখানেই এগিয়ে গেছে ফ্রান্স। তারা প্রতিভা তুলে এনেছে স্ট্রিট ফুটবল থেকে। অল্প জায়গায় বল নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা, ট্যাকটিক্যাল ভিশন আর ধূর্ততা— স্ট্রিট ফুটবলের এই কৌশলের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ফরাসি ফুটবল একাডেমিগুলোর ইয়ুথ ডেভেলপমেন্ট প্রোগ্রামের শিক্ষা। ফল— ফ্রান্স পেয়েছে রীতিমতো অপ্রতিরোধ্য একটা দল আর প্রতিভাবান ফুটবলার অনিঃশেষ প্রবাহ।
ক্যাফে আর জাদুঘরের শহর প্যারিসের বাইরেও একটা প্যারিস আছে, যে জায়গাকে বলে বেলিয়ঁ। মূল শহর থেকে দূরে, একরঙা ইটের বাড়ির লম্বা সারি, যেখানে ছোট ছোট ঘরে গাদাগাদি করে থাকে শ্রমজীবী মানুষ। এখানে ফুটবল জীবনের মতোই। খেলার জন্য জায়গা সেখানে বড্ড সীমিত, সময় আরও কম আর যেকোনো ছোট ভুলের মাশুল দিতে হয় হাতেনাতে। ওয়ান-অন-ওয়ান (১X১) লড়াইয়ে প্রতিপক্ষকে ড্রিবলিংয়ে পরাস্ত করতে না পারলে বল পায়ে থাকবে না, এটিই সেখানকার অলিখিত নিয়ম। ঠাসবুনন ভিড়ের মধ্যেও বলের নিয়ন্ত্রণ রাখতে হবে, ভিড়ের মিছিলে সতীর্থকে খুঁজে বের করে পাস দিতে হবে, সেটিও মুহূর্তের সিদ্ধান্তে। আর মনে রাখতে হবে একটা কথা, এখানে ফেয়ারপ্লে বলে কোনো কিছুর অস্তিত্ব নেই। ছোটবেলা থেকেই এভাবে খেলতে খেলতে রপ্ত হয়ে যায় ফুটবলের কৌশল, তারপর ইস্টারের ছুটিতে এই শিশুদের জীবনে আসে সেই চরম পরীক্ষার দিন। ১২ বছর বয়সী শিশুদের পরীক্ষা নেওয়া হয় ক্লেয়ারফন্টেইন একাডেমিতে ভর্তির জন্য, যেখানে সুযোগ পাওয়া মানেই জীবন বদলে যাওয়া। ফ্রান্সের এই এলিট ফুটবল একাডেমিতে বছরে মাত্র ২২ জন ফুটবলার সুযোগ পায়, তারা সপ্তাহে ছয় দিন সেখানে অনুশীলন করে, পড়ালেখা করে, খেলার কৌশল ও তত্ত্ব শেখে আর সপ্তাহান্তে বাড়ি গিয়ে পাড়ার ক্লাবে খেলে। ক্লেয়ারফন্টেইনের মতো আরও অনেক একাডেমি আছে ফ্রান্সে, সবই কাছাকাছি ধাঁচের।
ইউরোপের প্রথাগত একাডেমিগুলো যেখানে শিশুদের চিরাচরিত নিয়মে শেখাচ্ছে, যেমন স্পেন শেখাচ্ছে পজেশনভিত্তিক ফুটবল আর ইতালিতে ট্যাকটিকসই হয়ে গেছে মধ্যমণি, সেখানে ফরাসি কোচ দিদিয়ের দেশমই প্রথম ভেবেছেন স্ট্রিট ফুটবলের কৌশলকেই জাতীয় দলের জন্য উপযোগী করতে, রাস্তায় ফুটবল খেলার সেই বুনো একরোখা ভাবটাকে দিয়েছেন পদ্ধতিগত চেহারা। তাতেই ফ্রান্স জন্ম দিয়েছে নতুন এক ফুটবল শৈলির, যা তাদের করে তুলেছে রীতিমতো অপ্রতিরোধ্য।




