৩ হাজার বাসেই বদলানো সম্ভব ছবি

অধ্যাপক মোয়াজ্জেম হোসেন, লেখক ও গণপরিবহন বিশেষজ্ঞ
পৃথিবীর প্রায় সব বড় শহরগুলোয় বাস ব্যবস্থাপনা হলো গণপরিবহনের মূল মেরুদণ্ড। কিন্তু আমাদের দেশে গণপরিবহনের মেরুদণ্ড বাস সেবাকে রেখে দেওয়া হয়েছে সেকেলে অবস্থায়। অদক্ষতা, অব্যবস্থাপনা ও নিম্নমানের হওয়ায় মাথা তুলে দাঁড়াতে পারছে না এই খাত। কয়েক দশক ধরে মূল মেরুদণ্ড যদি এমন খারাপ অবস্থায় থাকে, তাহলে ছোটখাটো সমাধান দিয়ে পুরো ছবি বদলানো যাবে না।
এখন পর্যন্ত কোনো সরকারই মানসম্পন্ন করতে পারেনি বাস সেবার ব্যবস্থাপনা। শুধু তাই নয়, কোনো সরকার বিজ্ঞানসম্মত উপায়ে বাসের সক্ষমতা বাড়াতে হয়নি উদ্যোগী। এখান থেকে সমাধানের পথ কিন্তু সহজ। গণপরিবহন ব্যবস্থা ঠিক করতে হলে মেরুদণ্ড ঠিক করতে হবে। মেট্রোরেল কিন্তু আমাদের গণপরিবহনের মেরুদণ্ড না, বাসই মেরুদণ্ড। বাসব্যবস্থাকে কার্যকরী, মানসম্মত ও সুব্যবস্থাপনার আওতায় নিয়ে আসতে হবে। এই তিনটি শব্দ প্রতিষ্ঠিত করতে যা যা করা দরকার সরকারকে তাই করতে হবে।
আমি মনে করি, বিআরটিসির মতো একটা সরকারি কোম্পানিই শুধু ঢাকার বাস পরিচালনার দায়িত্বে থাকা দরকার। বাস ব্যবসাকে বেসরকারি খাত থেকে বের করে আনতে হবে। সব বেসরকারি কোম্পানিকে চোখ বন্ধ করে বাদ দিয়ে দিতে হবে। সরকার তিন মাসের নোটিস দিয়ে বলবে, উচ্চমানের তিন হাজার বাস নামাব। ঢাকার সব বাসকে একেবারে সরিয়ে ফেলে বা ঢাকার বাইরে নিয়ে যাব। এবং এসব বাসকে সড়কে চলার জন্য আলাদা লেন বাস ‘বে’ করে নির্দিষ্ট স্টপেজ ছাড়া কোথাও না থামানোর ব্যবস্থা করতে হবে। এক কোম্পানির এক রঙয়ের সব বাস থাকবে। নির্দিষ্ট সময় পর পর স্টপেজে বাস আসবে।
মনে রাখতে হবে, মানসম্মতভাবে পরিচালিত করতে গেলে গণপরিবহন কখনো লাভজনক ব্যবসা হতে পারে না। এটি মূলত সেবা, যেটি জনগণ তার করের পয়সা থেকে প্রত্যাশা করে। সেটিকে এখানে ব্যবসা করার জন্য ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। এখন ব্যবসায়ী যেকোনো মূল্যে টাকা তুলতে চাইবেই। মূল্যটা হলো— বাজে বাস, বাজে সেবা, বাজে চালক— সব কিছুই নিম্নমানের হবে।
সরকার যখন উন্নত সেবা দিতে চাইবে, তখন টাকা একটু বেশি খরচ হবে। যেটি সরকার ভর্তুকি হিসেবে করের টাকা থেকে দেবে। মেট্রোরেলেও তো পরিচালন ব্যয়ে সরকার ৩০-৪০ শতাংশ ভর্তুকি দিচ্ছে এই মুহূর্তে। পৃথিবীর সব জায়গায়ই কম বেশি ভর্তুকি দিতে হয়। বাসে উন্নত সেবা দিতে পারলে ঢাকায় ছোট গাড়ির সংখ্যা কমে যাবে।
বেশি কিছু না, মাত্র ৮ হাজার কোটি টাকা খরচ করলেই এই বাসে ছবি বদলানো সম্ভব। মাত্র তিন হাজার নতুন বাস নামালেই পুরনো জঞ্জাল দূর করা সম্ভব। এটা বাস্তবায়ন করতে যদি ব্যাটারির রিকশা সরাতে হয়, তাহলে সেটিই করতে হবে। বিদ্যমান বাস সব ফেলে দিতে হলে সেটিই করতে হবে। প্রয়োজনে নতুন কোম্পানিতে বাস চালানোর জন্য ১০ লাখ টাকা বেতন দিয়ে যদি এমডি (ব্যবস্থাপনা পরিচালক) নিয়োগ দিতে হয়, তাহলে সেটিই করতে হবে। অর্থাৎ সরকার যদি মনে করে বাসের বর্তমান ছবি লজ্জার, তাহলে যা যা করা দরকার তাই করতে হবে। আমাদের লাখ কোটি টাকার প্রকল্পের মধ্যে মাত্র ৮ হাজার কোটি টাকা বিনিয়োগ করাকে আমি মনে করি ফরজ। আর না করাকে মনে করি অপরাধ।
লেখক: গণপরিবহন বিশেষজ্ঞ, বুয়েট




