মন্ত্রীর মন্ত্রণালয় গুচ্ছ হলে সচিবের নয় কেন

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
কয়েক দিন পরপরই মন্ত্রিসভায় রদবদল হয়। দুনিয়াজোড়া এই প্র্যাকটিস। দায়িত্ব নেওয়ার ছয় মাসের মাথায় গত ২২ আগস্ট রদবদল হয়েছে তারেক রহমানের মন্ত্রিসভায়ও। কিন্তু এ রদবদলেও মন্ত্রণালয়ের গুচ্ছায়নের বিষয়টি অটুট আছে। এক মন্ত্রীর হাতে আছে একাধিক মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব। এরকম নজির একাধিক।
বিষয়টি নিছক দায়িত্ব বণ্টন হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। যেসব মন্ত্রণালয় কাছাকাছি ধরনের কাজ করে, সেগুলো আগলানোর দায়িত্ব একই মন্ত্রীর হাতে দেওয়ার মধ্যে সমন্বয় বাড়ানোর চিন্তা রয়েছে। আর সেখান থেকেই সামনে আসে বড় প্রশ্ন— মন্ত্রীদের দায়িত্ব যদি গুচ্ছভিত্তিক করা যায়, প্রশাসনিক কাঠামোও কি সেই বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হওয়া উচিত নয়?
সড়ক পরিবহন ও সেতু, রেলপথ এবং নৌপরিবহনের মতো পরস্পর-সম্পর্কিত খাত একই মন্ত্রীর দায়িত্বে থাকলে একটি সমন্বিত পরিবহন নীতি প্রণয়নের সুযোগ তৈরি হয়। একইভাবে অর্থ ও পরিকল্পনা, শিক্ষা ও প্রাথমিক ও গণশিক্ষা কিংবা বাণিজ্য, শিল্প এবং বস্ত্র ও পাটের মতো ঘনিষ্ঠ খাতগুলোকে একই রাজনৈতিক নেতৃত্বের অধীনে রাখারও যুক্তি অনেক। কাজের মিল আছে মহিলা ও শিশুবিষয়ক এবং সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়েরও। কৃষির সঙ্গে একজনে ন্যস্ত মৎস্য ও প্রাণিসম্পদও। এভাবেই সাজানো বর্তমান মন্ত্রিসভা।
শিল্প, বাণিজ্য ও বস্ত্র একজনের হাতে। আগে সামলেছেন তিনজনে। তিনটি মন্ত্রণালয়ই উৎপাদন, শিল্পায়ন, রপ্তানি, আমদানি ও বাজার ব্যবস্থাপনার সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত। স্থানীয় শিল্পকে সুরক্ষা দেওয়া এবং আমদানিনীতি নির্ধারণ— ওতপ্রোত সম্পর্কিত। এক মন্ত্রিত্বে তিন মন্ত্রণালয়ের নীতির মধ্যে সমন্বয় সহজ। আগে কোনো একটি শিল্পসংক্রান্ত বিষয়ে তিন মন্ত্রীর মধ্যে সমন্বয়ের প্রয়োজন হলে সময় লাগত। এখন একই রাজনৈতিক নেতৃত্বের অধীনে থাকায় আন্তঃমন্ত্রণালয় সমন্বয় স্তর কমতে পারে। হ্রাস পাবে ঠেলাঠেলির সুযোগও।
তবে সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়া সহজ হওয়ার বদলে কখনো আরও জটিল হতে পারে। যদি তিন মন্ত্রণালয়ের সচিব ও কর্মকর্তারা আগের মতো আলাদা কাঠামোতেই কাজ করেন, তাহলে মন্ত্রীর ওপর সমন্বয়ের অতিরিক্ত চাপ তৈরি হতে পারে। কারণ দিনশেষে সব মন্ত্রণালয় আসলে মন্ত্রীরই।
কর্মকর্তাদের দক্ষতা-অভিজ্ঞতা যথাযথভাবে কাজে লাগানো যাচ্ছে না। কোন কর্মকর্তা কোন বিষয়ে দক্ষ, কোন বিষয়ে প্রশিক্ষণ নিয়েছেন, কোন বিষয়ে উচ্চশিক্ষা বা গবেষণা করেছেন— তার ভিত্তিতে দীর্ঘমেয়াদি ক্যারিয়ার পরিকল্পনা আছে, বাস্তবায়ন নেই। একজন কর্মকর্তা শিক্ষার ওপর প্রশিক্ষণ নিয়ে দেশে ফিরে খাদ্য মন্ত্রণালয়ে পোস্টিং পাচ্ছেন। পরিবার-পরিকল্পনা নিয়ে কাজ করা কর্মকর্তা পরিকল্পনা কমিশনে গিয়ে সড়ক বা অবকাঠামো প্রকল্প নিয়ে কাজ করছেন। আধুনিক ফাইন্যান্স ম্যানেজমেন্টে উচ্চশিক্ষা নিয়ে দেশে ফিরে কোনো কর্মকর্তাকে যদি অর্থ মন্ত্রণালয়ের বদলে অন্য একটি মন্ত্রণালয়ে কাজ করতে হয়, তাহলে রাষ্ট্রের বিনিয়োগের সুফল কোথায়? জনগণের অর্থে পিএইচডি করা কর্মকর্তাও যদি গবেষণার বিষয় থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন দায়িত্বে চলে যান, তাহলে সেই জ্ঞান অর্জনের উদ্দেশ্যই প্রশ্নের মুখে পড়ে।
বর্তমান মন্ত্রিসভা একটি বড় সুযোগ তৈরি করেছে। বছরের পর বছর একইভাবে পড়ে থাকা প্রশাসন নামের জড়তার প্রাচীরে সামান্য চিড় ধরেছে। এ চিড় ধরেই সংস্কার করতে হবে
এখনো অনেক কর্মকর্তা পিএইচডি করছেন, বিদেশে প্রশিক্ষণ নিচ্ছেন, আন্তর্জাতিক সংস্থায় লিয়েনে কাজ করছেন। দুই-তিন বছর বিদেশি প্রতিষ্ঠানে সংশ্লিষ্ট বিষয়ে কাজ করে দেশে ফেরার পর স্বাভাবিক প্রত্যাশা থাকে, তিনি তার অর্জিত অভিজ্ঞতা দেশের সংশ্লিষ্ট খাতে কাজে লাগাবেন। কিন্তু বাস্তবে অনেক সময় সেই ধারাবাহিকতা থাকে না। এতে কর্মকর্তা হয়তো দায়িত্ব পালন করছেন, কিন্তু তার বিশেষায়িত জ্ঞান ও রাষ্ট্রের বিনিয়োগ— দুটিই পুরোপুরি কাজে লাগছে না।
কেন এমন হয়? কারণ প্রশাসনে কর্মকর্তার ক্যারিয়ার প্ল্যানিংয়ের চেয়ে রাজনৈতিক পরিচয়ের তত্ত্বতালাশ বেশি গুরুত্বপূর্ণ। খোঁজা হয় ‘তুমি কোন ছাতার তলার কর্মকর্তা’। গালভরা নির্লজ্জের আস্ফালন এখানে নিত্যযাত্রী। কোথায় পোস্টিং পেলেন, কার কী পরিচয়— এসব আলোচনার বাইরে গিয়ে কে কোন বিষয়ে দক্ষ এবং সেই দক্ষতা কোথায় সবচেয়ে বেশি কাজে লাগবে, সেই প্রশ্নটি যথেষ্ট গুরুত্ব পায় না।
ক্যারিয়ারে এগুলো নিশ্চিত হয় না বলেই প্রশাসন নড়বড়ে। সেখানে আজ ভুলের মেলা বসে গেছে। আমলাদের বুক থেকে উৎসারিত হয় না দেশপ্রেম। খুঁড়িয়ে-জিরিয়ে-থেমে চলা প্রশাসনের এ হচ্ছে স্বাভাবিক গতি। আকারে বাড়লেও প্রকারে বাড়ছে না। প্রশাসনকে না ধারণ করেই অন্যদের শেখাতে গিয়ে পরিণত হচ্ছেন হাস্যকর উদাহরণে।
বিষয়গুলো আচমকা বা আচানক নয়; বরং দীর্ঘদিনের পরিক্রমা। এদ্দিনে কদ্দূর এলো তার মূল্যায়ন হওয়া উচিত ছিল। আমরা সেখানে যেতে পারছি কোথায়? তখন আকবর আলি খান বেঁচেছিলেন। তার গুলশানের বাসায় লাইব্রেরিতে কথা হচ্ছিল। সর্বজনশ্রদ্ধেয় এ পণ্ডিত আমলার মনেও ছিল ক্যারিয়ার প্ল্যানিং। তার মত ছিল— মন্ত্রণালয়ের কাজের ধরন ও পারস্পরিক সম্পর্কের ভিত্তিতে সাধারণ, অর্থনৈতিক এবং ভৌত-সামাজিক অবকাঠামো— এ তিন গুচ্ছে বিন্যস্ত করা যায়। গঠন করা যায় সিনিয়র ম্যানেজমেন্ট পুল (এসএমপি)— যেখানে থাকবেন উপসচিব, যুগ্ম সচিব, অতিরিক্ত সচিব ও সচিবরা। উপসচিব পদে প্রবেশ হবে প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষায়। সব ক্যাডারের আট বছরের চাকরির অভিজ্ঞ কর্মকর্তারা পরীক্ষায় অংশ নিতে পারবেন। তার আগে প্রত্যেকে গুচ্ছ পছন্দের অপশন দেবেন। তৃতীয় গ্রেড পর্যন্ত কর্মকর্তাদের গুচ্ছে যোগদানে অগ্রাধিকার থাকবে। তৃতীয় গ্রেড পর্যন্ত কর্মকর্তা ও সহায়ক কর্মচারীরা গুচ্ছের মন্ত্রণালয়গুলোর মধ্যে আবর্তিত হবেন। বিশেষ প্রয়োজনে উপসচিব ও তদূর্ধ্ব পদের ১০ শতাংশ অন্য গুচ্ছ থেকে পূরণ করা যাবে।
মোদ্দাকথা, বর্তমান মন্ত্রিসভা একটি বড় সুযোগ তৈরি করেছে। বছরের পর বছর একইভাবে পড়ে থাকা প্রশাসন নামের জড়তার প্রাচীরে সামান্য চিড় ধরেছে। এ চিড় ধরেই সংস্কার করতে হবে। মন্ত্রীদের কয়েকটি মন্ত্রণালয় গুচ্ছ করে দায়িত্ব দেওয়া হলে সচিব নয় কেন? আর তার চেয়েও বড় প্রশ্ন— সচিব বা কর্মকর্তা যে বিষয়েই দক্ষ, সেই দক্ষতা রাষ্ট্র কাজে লাগাবে না কেন?
প্রশাসনিক সংস্কারের আসল লক্ষ্য হওয়া উচিত শুধু কাঠামো বদলানো নয়; সঠিক মানুষকে সঠিক জায়গায় কাজে লাগিয়ে রাষ্ট্রের সক্ষমতা বাড়ানো।
লেখক: উপসম্পাদক, আগামীর সময়



