জুলাইয়ের পর নতুন ভয়ও তৈরি হয়েছে

জুলাই গণঅভ্যুত্থান নিয়ে আলোচনায় একটি যুক্তি প্রায়ই সামনে আসে, অনেকেই বলেন আন্দোলনটি শেষ পর্যন্ত ব্যর্থ হয়েছে। এর পক্ষে কিছু কারণও দেখানো হয়। জুলাইয়ের ছাত্র নেতৃত্বের একটি অংশ ক্ষমতার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে সমাজের হিতের জন্য নয়; বরং ব্যক্তিস্বার্থে কাজ করেছে। তাদের কারও কারও বিরুদ্ধে দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি এবং ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগ উঠেছে। জুলাই থেকে জন্ম নেওয়া রাজনৈতিক দলের বিরুদ্ধেও অভিযোগ আছে। বলা হচ্ছে, দলটি ধীরে ধীরে ডানপন্থী রাজনীতির দিকে ঝুঁকেছে। অনেকেই অভিযোগ করছেন, সামগ্রিকভাবে ডানপন্থী শক্তির উত্থান ঘটেছে। অন্যদিকে জুলাইয়ের আরেক বড় অংশীদার বিএনপি ক্ষমতায় গিয়ে আবার পরিচিত ধারার রাজনীতি শুরু করেছে। পুরনো রাজনৈতিক সংস্কৃতি খুব বেশি বদলায়নি। আন্দোলনের মধ্যে থাকা অনেক অরাজনৈতিক মানুষও পরে নিজ নিজ কাজে ফিরে গেছে। অনেকে রাষ্ট্রীয় সহিংসতা, মৃত্যু, ভয় এবং অনিশ্চয়তার ট্রমা নিয়ে নিজেদের জীবন সামলাতে ব্যস্ত হয়ে পড়েছে।
আমি এসব অভিযোগের গুরুত্ব অস্বীকার করছি না। এর পেছনে হয়তো বাস্তব কারণ ও যুক্তি আছে। মানুষের হতাশারও ভিত্তি আছে। কিন্তু শুধু পরবর্তী নেতৃত্বের ব্যর্থতা দিয়ে জুলাইয়ের মতো এত বড় এক রাজনৈতিক আন্দোলনের মূল্য নির্ধারণ করা ঠিক হবে না। কোনো গণঅভ্যুত্থানের সাফল্য শুধু এ দিয়ে বিচার করা যায় না, যে তার নেতারা পরে কতটা নৈতিক ছিলেন। আন্দোলন থেকে জন্ম নেওয়া দল কতটা আদর্শবাদী ছিল, তা-ও একমাত্র মাপকাঠি নয়। দেখতে হবে, আন্দোলনটি রাষ্ট্র ও রাজনীতিতে নতুন কোনো সুযোগ তৈরি করেছে কি না।
এ জায়গা থেকে আমার মনে হয়, জুলাইয়ের সবচেয়ে বড় সাফল্য হলো নির্বাচনী রাজনীতির দরজা আবার খুলে দেওয়া। ২০১৪, ২০১৮ ও ২০২৪ সালের নির্বাচনকে কোনোভাবেই স্বাভাবিক ও গ্রহণযোগ্য বলা যায় না। ফলে জনগণের ভোটের মাধ্যমে সরকার পরিবর্তনের সুযোগ প্রায় বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। নির্বাচনের মাধ্যমে রাজনৈতিক বিরোধ মীমাংসা করার আর কোনো সুযোগ ছিল না। নিয়ন্ত্রিত নির্বাচন ক্ষমতাসীনদের বৈধতা তৈরির একটি প্রশাসনিক প্রক্রিয়ায় পরিণত হয়েছিল। জুলাই সেই বন্ধ জায়গাটিতে বড় একটি ধাক্কা দিয়েছে। নির্বাচনী রাজনীতিতে ফিরে যাওয়ার সুযোগ তৈরি করেছে।
২০২৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচন নিখুঁত ছিল না। আওয়ামী লীগ নির্বাচনে অংশ নিতে পারেনি। দলটির রাজনৈতিক কার্যক্রম নিষিদ্ধ ছিল এবং নিবন্ধনও স্থগিত ছিল। ফলে দেশের একটি বড় রাজনৈতিক ধারার মানুষ ও সংগঠন নির্বাচনের বাইরে ছিল। এটি অবশ্যই একটি গুরুতর সীমাবদ্ধতা। তারপরও নির্বাচনটি ২০১৪, ২০১৮ ও ২০২৪ সালের তুলনায় বেশি প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক ছিল। রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে বাস্তব প্রতিযোগিতা ছিল। ভোটের মাধ্যমে ক্ষমতা নির্ধারণের একটি পথ আবার তৈরি হয়েছিল। আমার মনে হয়, এখানেই জুলাইয়ের সব থেকে বড় সার্থকতা। আমি মানি নির্বাচন গণতন্ত্রের জন্য যথেষ্ট নয়। কিন্তু নির্বাচন ছাড়া গণতান্ত্রিক সমাধানের পথও থাকে না।
নির্বাচনের পথ বন্ধ হয়ে গেলে রাজনৈতিক বিরোধ জমতে থাকে। তার শান্তিপূর্ণ সমাধান আর থাকে না। তখন রাজনীতি আদালত, প্রশাসন, পুলিশ, রাজপথ কিংবা সহিংসতার ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে
নির্বাচন চালু থাকলে জনগণ কোনো দলের দুর্নীতি, ব্যর্থতা বা কর্তৃত্ববাদী আচরণের বিরুদ্ধে ভোট দিতে পারে। নতুন রাজনৈতিক দলও জনগণের বিচারের বাইরে থাকে না। পুরনো দলকেও তার কাজের জবাব দিতে হয়। কিন্তু নির্বাচনের পথ বন্ধ হয়ে গেলে রাজনৈতিক বিরোধ জমতে থাকে। তার শান্তিপূর্ণ সমাধান আর থাকে না। তখন রাজনীতি আদালত, প্রশাসন, পুলিশ, রাজপথ কিংবা সহিংসতার ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে।
জুলাই আরেকটি বড় পরিবর্তন এনেছে। রাষ্ট্র ও সমাজে যে প্রচণ্ড ঝাঁকুনি লেগেছে, তা সমাজের সবার জন্য না হলে একটা বড় অংশের মানুষের জন্য অনেক ভয় ভেঙে দিয়েছে। আগে যেসব প্রতিষ্ঠান, ব্যক্তি বা ক্ষমতাকেন্দ্র নিয়ে কথা বলা কঠিন ছিল, এখন সেগুলো নিয়ে বেশি প্রশ্ন উঠছে। মানুষ আগের তুলনায় বেশি কথা বলছে। বেশি সমালোচনা করছে। কিন্তু এ পরিবর্তন একমুখী নয়। জুলাইয়ের পরে নতুন ভয়ও তৈরি হয়েছে সমাজের একটি অংশের মানুষের জন্য। বিশ্ববিদ্যালয়, গণমাধ্যম এবং সাংস্কৃতিক পরিসরে অনেক ক্ষেত্রে তালিকা তৈরি হয়েছে। মানুষকে রাজনৈতিক পরিচয়ের ভিত্তিতে চিহ্নিত করা হয়েছে। চাকরি বা পদ থেকে সরানোর দাবি উঠেছে। অনেক ক্ষেত্রে এটি উইচ-হান্টিংয়ের রূপ নিয়েছে। এ দুই বাস্তবতাকেই একসঙ্গে দেখতে হবে।
বাস্তবতা হলো, একটি আন্দোলন কয়েক সপ্তাহের মধ্যে সরকার পতন ঘটাতে পারে। কিন্তু সমাজের রাজনৈতিক সংস্কৃতি এত দ্রুত বদলায় না। এর জন্য বছরের পর বছর কাজ করতে হয়। বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চা চালু রাখতে হয়। রাজনৈতিক ও সামাজিক এনগেজমেন্ট ধরে রাখতে হয়।
বাংলাদেশে কর্তৃত্ববাদ শুধু একজন শাসক বা একটি দলের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। অনেক ক্ষেত্রেই এটি প্রশাসনে, রাজনৈতিক দলে, বিশ্ববিদ্যালয়ে, সংবাদমাধ্যমে এমনকি আমাদের দৈনন্দিন রাজনৈতিক ভাষার মধ্যেও রয়েছে। তাই সরকার বদলালেই সমাজ গণতান্ত্রিক হয়ে যাবে, আমি এমন আশা করি না, এমন আশা বাস্তবসম্মত নয়। সে কারণেই আমি জুলাই-পরবর্তী অবস্থাকে পুরোপুরি হতাশাজনক বলতে চাই না। আমি একে একটি চলমান রাজনৈতিক পরিবর্তনের অংশ হিসেবে দেখি।
এ বিষয় অস্বীকার করার উপায় নেই যে, আওয়ামী লীগের নিষিদ্ধ থাকা একটি বড় রাজনৈতিক সংকট ভবিষ্যতের জন্য তৈরি করেছে। আপাতত এর কোনো সমাধান নিয়ে আলাপ সমাজে নেই। ন্যায়বিচার ছাড়া এ বিষয়ের যেকোনো সমাধান রাজনৈতিক জটিলতা বাড়াবে ৈব কমাবে না। রাজনৈতিক প্রতিশোধও একটি বড় সংকট। উইচ-হান্টিং সংকট। নতুন দলের আদর্শিক বিচ্যুতি সংকট। পুরনো দলের পুরনো অভ্যাসও সংকট। কিন্তু আমি বিশ্বাস করি, নির্বাচনী প্রতিযোগিতা নিয়মিত থাকলে এসব সংকটের রাজনৈতিক সমাধানের সুযোগ থাকে। জনগণ ভোটের মাধ্যমে প্রতিক্রিয়া জানাতে পারে। তারা সরকারকে বিচার করতে পারে। বিরোধী দলকে বিচার করতে পারে। আন্দোলন থেকে উঠে আসা নতুন শক্তিকেও বিচার করতে পারে। জুলাইয়ের আগে এ সুযোগ প্রায় বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। জুলাই কোনো বিপ্লব নয়, এটি একটি গণঅভ্যুত্থান। এর সব প্রতিশ্রুতিও পূরণ হয়নি। কিন্তু এটি রাজনীতির একটি বন্ধ দরজা খুলেছে। রাজনীতিতে গণতন্ত্রের অপরিহার্য শর্ত প্রতিযোগিতামূলক নির্বাচন ফেরত এনেছে। জুলাইয়ের সব থেকে বড় পাওয়া সেটিই। এখন প্রশ্ন হলো, আমরা সেই দরজাটি আরও স্বচ্ছ ও প্রতিযোগিতামূলক করব নাকি প্রতিশোধ, নিষেধাজ্ঞা এবং একচেটিয়া ক্ষমতার রাজনীতির মাধ্যমে আবার বন্ধ করে দেব।
জুলাইয়ের ভবিষ্যৎ শুধু তার নেতাদের ব্যক্তিগত সাফল্য বা ব্যর্থতা দিয়ে নির্ধারিত হবে না। এটি নির্ধারিত হবে বাংলাদেশ নিয়মিত নির্বাচন, বহুদলীয় প্রতিযোগিতা, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা এবং রাজনৈতিক বিরোধের শান্তিপূর্ণ সমাধানের পথ ধরে রাখতে পারে কি না, তার ওপর।
লেখক: ডক্টরাল ফেলো, জর্জিয়া স্টেট ইউনিভার্সিটি, যুক্তরাষ্ট্র





