ডেঙ্গু মোকাবিলায় কৌশল বদলানো জরুরি

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
ডেঙ্গু দিন দিন বাড়ছে। পাঁচ-ছয় বছর ধরে আমরা দেখছি, বৃষ্টির ধরন বদলে গেছে। ফলে অক্টোবর-নভেম্বর পর্যন্ত ডেঙ্গুর প্রকোপ থাকে। এ সময়টাতেই সাধারণত ডেঙ্গু সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছায়। এরপর ধীরে ধীরে কমতে শুরু করে। তবে একেবারে চলে যায় না। এবারের পরিস্থিতি বুঝতে হলে গত বছরের চিত্রটিও সামনে রাখতে হবে। গত বছর ডেঙ্গুর যে রোগতাত্ত্বিক গ্রাফ ছিল, এবারও অনেকটা সে গ্রাফই অনুসরণ করছে। তবে পার্থক্য হলো, গ্রাফটি গত বছরের তুলনায় আরও ওপরে উঠে গেছে। অর্থাৎ আমরা আগের বছরের চেয়েও বেশি ঝুঁকিপূর্ণ পরিস্থিতির মধ্যে আছি।
আগস্টের শুরুর দিক পর্যন্ত মৃত্যুর সংখ্যা গত বছরের তুলনায় কম ছিল। কিন্তু রোগীর সংখ্যা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে হাসপাতালে চিকিৎসাব্যবস্থার ওপর চাপও বাড়ছে। আমাদের ডেঙ্গু চিকিৎসা ঢাকাকেন্দ্রিক হয়ে পড়েছে। ফলে যেসব রোগী কমিউনিটি পর্যায়ে শনাক্ত হওয়ার ও চিকিৎসার সুযোগ পেত, সেটা না পেয়ে তাদের অনেকেই খারাপ অবস্থায় হাসপাতালে আসছে। কমিউনিটি পর্যায়ে ব্যবস্থা না নেওয়ার কারণে গুরুতর রোগীর সংখ্যা বাড়ছে। হাসপাতালের সক্ষমতার বাইরে যদি গুরুতর রোগীর সংখ্যা চলে যায়, তাহলে স্বাভাবিকভাবে মৃত্যুর সংখ্যাও বাড়বে। এটি আমাদের স্বাস্থ্যব্যবস্থার একটি মৌলিক দুর্বলতা। দীর্ঘদিন ধরে এ সমস্যা চলে আসছে; কিন্তু এ দুর্বলতা কাটিয়ে ওঠার কোনো কার্যকর উদ্যোগ সরকারের তরফ থেকে দেখা যাচ্ছে না।
ডেঙ্গু এখন আর শুধু শহরের রোগ নয়। এটি গ্রামেও ছড়াচ্ছে। ডেঙ্গু যখন শহরের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল, তখনই জনগণকে সম্পৃক্ত করে বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে পরিচ্ছন্নতা অভিযান চালানোর কথা আমরা বলেছিলাম। ঢাকা শহরে তখন যদি এ ধরনের কার্যক্রম যথাযথভাবে করা যেত, তাহলে হয়তো সারা দেশে এভাবে ডেঙ্গু ছড়িয়ে পড়ত না। কিন্তু কোনো এক অজানা কারণে সেটি করা হলো না। মূলত ২০১৯ সালে ডেঙ্গুর মহামারীর পর এটি সারা দেশে ছড়িয়ে পড়েছে। এখন ৬৪ জেলাতেই ডেঙ্গু পাওয়া যাচ্ছে। এমনকি দুর্গম পাহাড়ি এলাকা থেকেও এডিস মশার অস্তিত্ব এবং ডেঙ্গু রোগীর খবর আসছে।
এখানে সরকারের নীতিগত দুর্বলতাটি স্পষ্ট। সরকারের ডেঙ্গু ব্যবস্থাপনাটা এমন যে, একজন রোগী যখন হাসপাতালে ভর্তি হয়, অধিকাংশ ক্ষেত্রে দেখা যায় রোগীটি মৃত্যুঝুঁকিতে রয়েছে। অথচ সরকারের কৌশল হওয়া উচিত ছিল— রোগী যেন কোনোভাবেই এমন অবস্থাতেই না পৌঁছায়। অর্থাৎ গ্রাম পর্যায়ে বা শহরের ওয়ার্ড পর্যায়ে মৃত্যুঝুঁকিতে পড়ার আগেই ডেঙ্গু শনাক্ত ও চিকিৎসার আওতায় আনতে হবে। গ্রামাঞ্চলে সরকারের যে চিকিৎসা কাঠামো আছে, সেগুলোকে কাজে লাগাতে হবে। সেগুলোকে সঠিকভাবে সাজাতে প্রয়োজনীয় সহায়তা দিতে হবে।
শহরে প্রাথমিক ও মধ্যবর্তী চিকিৎসা কাঠামো নেই বললেই চলে। ফলে সরাসরি মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ওপর প্রাথমিক, মাধ্যমিক ও জটিল রোগীর চাপ একসঙ্গে পড়ে। অথচ শহরেই ঘনবসতি বেশি এবং ডেঙ্গুর প্রাদুর্ভাবও বেশি। এক্ষেত্রে প্রশিক্ষিত টেকনিশিয়ান, স্বেচ্ছাসেবক কিংবা মেডিকেলের শিক্ষার্থীদের কাজে লাগিয়ে ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় অস্থায়ী পরীক্ষাকেন্দ্র করা যেতে পারে। একটি টেবিল-চেয়ার নিয়ে বসেও কাজটি করা সম্ভব। কিংবা ভ্রাম্যমাণ গাড়ির মাধ্যমে কমিউনিটি পর্যায়ে রোগীর পরীক্ষা চালানো যেতে পারে— যাদের জ্বর আছে, তারা আসুন, পরীক্ষা করুন এবং হাতে হাতে ফলাফল নিয়ে যান। এর গুরুত্ব অনেক। একজন শ্রমজীবী মানুষ একদিন কাজ না করলে তার আয় বন্ধ হয়ে যায়। নিম্নমধ্যবিত্ত মানুষের ক্ষেত্রেও একই বাস্তবতা। ফলে জ্বর হয়েছে; কিন্তু ডেঙ্গু কি না জানেন না— এমন অবস্থায় তিনি হয়তো কাজ করতে বেরিয়ে পড়েন। কিন্তু পরীক্ষা করে যদি জানা যায় তার ডেঙ্গু হয়েছে, তাহলে তাকে অন্তত কয়েক দিন বিশ্রামে রাখা সম্ভব। এরপর প্রয়োজনীয় পরীক্ষা করে কাজে ফেরার ব্যবস্থা করা যায়।
ইন্দোনেশিয়ায় ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে নাগরিকদের ব্যাপকভাবে সম্পৃক্ত করা হয়েছে। হাজার হাজার স্বেচ্ছাসেবককে যুক্ত করা হয়েছে। সরকার মহামারীর সময়ের মতো করে কাজে নেমেছে। ফলে সেখানে ডেঙ্গুর প্রকোপ আগের তুলনায় এখন অনেক কম। অথচ আমাদের দেশে এখনো গতানুগতিকভাবে ধোঁয়া ছিটানো, দু-এক জায়গায় লার্ভি সাইড দেওয়ার মধ্যেই কার্যক্রম সীমাবদ্ধ থাকে। তাও বড়জোর বিভাগীয় শহরগুলোতেই সীমাবদ্ধ। গ্রাম তো দূরের কথা, উপজেলা সদরেও সেবাটুকু পৌঁছায়নি।
আমরা ম্যালেরিয়া নিয়ন্ত্রণ করতে পেরেছি, কালাজ্বরের মতো রোগ প্রায় নির্মূলের পর্যায়ে নিয়ে যেতে পেরেছি। তাহলে ডেঙ্গু কেন পারব না? না পারার কোনো কারণ নেই। প্রয়োজন সরকারের পক্ষ থেকে সঠিক নীতি, সঠিক কর্মপদ্ধতি, যোগ্য ও অভিজ্ঞ মানুষকে কাজে লাগানো এবং সর্বোপরি জনগণকে সম্পৃক্ত করা
ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে জনগণকে সম্পৃক্ত করার কোনো বিকল্প সরকারের হাতে নেই। কারণ সীমিতসংখ্যক সরকারি কর্মী নামিয়ে সারা দেশের পরিচ্ছন্নতা অভিযান পরিচালনা করা সম্ভব নয়। ফলে জনগণকে শেখাতে হবে, কীভাবে পরিচ্ছন্নতা অভিযান চালাতে হবে এবং কীভাবে মশার প্রজননস্থল ধ্বংস করতে হবে। কমিউনিটি পর্যায়ে যথাযথভাবে কাজ করা গেলে মৃত্যুর হার দ্রুত কমানো সম্ভব। আমরা ম্যালেরিয়া নিয়ন্ত্রণ করতে পেরেছি, কালা জ্বরের মতো রোগ প্রায় নির্মূলের পর্যায়ে নিয়ে যেতে পেরেছি। তাহলে ডেঙ্গু কেন পারব না? না পারার কোনো কারণ নেই। প্রয়োজন সরকারের পক্ষ থেকে সঠিক নীতি ও কর্মপদ্ধতি গ্রহণ, অভিজ্ঞ মানুষকে কাজে লাগানো এবং সর্বোপরি জনগণকে সম্পৃক্ত করা।
ডেঙ্গুর বিষয়ে আরেকটি বিষয় পরিষ্কার করা প্রয়োজন। অনেকেই বলছেন, ডেঙ্গু নাকি রূপ বদল করছে। আসলে ডেঙ্গু ভাইরাসের চারটি সেরোটাইপ— ১, ২, ৩ ও ৪ ঘুরেফিরে সংক্রমণ ঘটায়। ডেঙ্গুর কোনো নতুন রূপ তৈরি হয়েছে, বিষয়টি এমন নয়। ডেঙ্গুতে অভ্যন্তরীণ রক্তক্ষরণ হলে শরীরের বিভিন্ন অঙ্গ ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। লিভার, স্প্লিন, কিডনি বা পেটে ক্ষতি হলে তার আলাদা আলাদা লক্ষণ দেখা দিতে পারে। সে অনুযায়ী চিকিৎসকদের প্রস্তুত থাকতে হয়। ঝুঁকির আরেকটি কারণ হলো, দ্বিতীয়বার আক্রান্ত হওয়া। একজন ব্যক্তি একটি সেরোটাইপে আক্রান্ত হওয়ার পর সেই সেরোটাইপের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ ক্ষমতা তৈরি করে। পরে অন্য সেরোটাইপে আক্রান্ত হলে গুরুতর অবস্থার ঝুঁকি বাড়তে পারে।
ধরা যাক, গত বছর ঢাকায় সেরোটাইপ-২ বেশি ছিল এবং সেরোটাইপ-৩ কম ছিল। এবার যদি সেরোটাইপ-৩ বেশি থাকে, তাহলে গত বছর সেরোটাইপ-২-এ আক্রান্ত ব্যক্তিদের এবার সেরোটাইপ-৩-এ আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে। এ কারণে পরিস্থিতি জটিল হতে পারে। আবার সেরোটাইপ-১ বা ৪-এর প্রাধান্য দেখা দিলে ঝুঁকি আরও বাড়তে পারে। ২০২৩ সালের মতো ভয়াবহ পরিস্থিতির আশঙ্কাও তখন সৃষ্টি হতে পারে। বর্তমানে চারটি সেরোটাইপই কমবেশি পাওয়া যাচ্ছে; কোনটি বেশি প্রভাবশালী, সেটিই গুরুত্বপূর্ণ।
এডিস মশা নিয়ন্ত্রণে নতুন নতুন পদ্ধতি সামনে আসছে। বিশেষত জেনেটিক্যালি মডিফায়েড মশা বা ওলবাকিয়ার কথা বেশি আলোচিত হচ্ছে। ডেঙ্গু নির্মূলে কোনো পদ্ধতিকে বাদ দেওয়ার সুযোগ নেই। সব পদ্ধতিরই পরীক্ষা করা উচিত। তবে বাংলাদেশের মতো ঘনবসতির একটি দেশে কোনো একটি পদ্ধতি দিয়েই সমস্যার সমাধান হবে— এমনটি ভাববার কারণ নেই। যেসব এলাকায় ডেঙ্গু এখনো সীমিত, সেখানে ওলবাকিয়া ধরনের পদ্ধতি প্রয়োগ করা যেতে পারে।
সবচেয়ে বড় কথা, আমাদের কৌশল বদলাতে হবে। রোগী গুরুতর হওয়ার পর হাসপাতালে ছুটলে হবে না; রোগী গুরুতর পর্যায়ে পৌঁছানোর আগেই ডেঙ্গু শনাক্ত করতে হবে। এরপর কমিউনিটিতে চিকিৎসা ও পর্যবেক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে। ডেঙ্গুর বিরুদ্ধে লড়াই শুধু চিকিৎসার নয়, এটি সরকার, স্থানীয় প্রশাসন, সামাজিক সংগঠন এবং সাধারণ মানুষের সম্মিলিত লড়াই। আমাদের সেই সম্মিলিত উদ্যোগ নেওয়ার সক্ষমতা আছে। প্রয়োজন শুধু সঠিক নীতি, সঠিক কর্মপদ্ধতি এবং সবাইকে একসঙ্গে কাজে নামানোর রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক সদিচ্ছা।
লেখক: সাবেক প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা, আইইডিসিআর




