বেতন বাড়ল সেবার মান বাড়বে কি

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
দীর্ঘদিন নতুন বেতন কাঠামো না হওয়ায় মূল্যস্ফীতি, বাসা ভাড়া, শিক্ষা, চিকিৎসা ও নিত্যপণ্যের ব্যয় বৃদ্ধির তুলনায় সরকারি কর্মচারীদের প্রকৃত আয় কমেছে। বিশেষ করে নিম্ন ও মধ্যম গ্রেডের কর্মচারীদের জন্য সংসারের প্রয়োজনীয় ব্যয় নির্বাহ করা কঠিন হয়ে পড়েছে। এ প্রেক্ষাপটে তাদের বেতন সমন্বয়ের অর্থনৈতিক ও সামাজিক যৌক্তিকতা রয়েছে। নতুন পে স্কেল ক্রয়ক্ষমতা বাড়াবে, জীবনযাত্রায় কিছুটা স্বস্তি দেবে এবং ঋণনির্ভরতা কমাতে সহায়তা করতে পারে।
তবে বেতন বৃদ্ধির ফলে সরকারি কর্মচারীদের ভোগব্যয় ও অর্থনীতিতে সামগ্রিক চাহিদা বাড়বে। সে তুলনায় পণ্য ও সেবার সরবরাহ না বাড়লে মূল্যস্ফীতির ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি হতে পারে। খাদ্য, বাসস্থান, পরিবহন, শিক্ষা ও চিকিৎসার মতো খাতে এ প্রভাব তুলনামূলক বেশি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। অনেক সময় বাড়িওয়ালা, পরিবহন মালিক ও ব্যবসায়ীদের একটি অংশ পে স্কেল ঘোষণাকে সামনে রেখে আগাম দাম বাড়ানোর চেষ্টা করে। ফলে প্রকৃত চাহিদা বৃদ্ধির আগেই মূল্যবৃদ্ধির প্রত্যাশা বাজারকে প্রভাবিত করতে পারে।
অবশ্য বেতন বাড়লেই মূল্যস্ফীতি অনিবার্যভাবে অনেক বেড়ে যাবে— এমন সরল সিদ্ধান্তে পৌঁছানো ঠিক হবে না। এর প্রভাব নির্ভর করবে বেতন বৃদ্ধির পরিমাণ, অর্থের সংস্থান, বাজারে পণ্যের সরবরাহ এবং রাজস্ব ও মুদ্রানীতির সমন্বয়ের ওপর। পে স্কেল যেহেতু পর্যায়ক্রমে বাস্তবায়িত হচ্ছে, তাই অতিরিক্ত চাহিদার চাপও একবারে না এসে ধীরে ধীরে আসবে। এ সময়ে সরকারকে খাদ্যপণ্যের সরবরাহ স্বাভাবিক রাখা, উৎপাদন ও আমদানির প্রতিবন্ধকতা দূর করা এবং পরিবহন ও বিপণনব্যবস্থার ব্যয় কমানোর দিকে নজর দিতে হবে। বাজারে প্রতিযোগিতা নিশ্চিত করার পাশাপাশি মজুদদারি ও অযৌক্তিক মূল্যবৃদ্ধির বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে। শুধু বিচ্ছিন্নভাবে বাজার অভিযান নয়, উৎপাদন থেকে খুচরা বিক্রি পর্যন্ত সরবরাহব্যবস্থার দুর্বলতা দূর করাই বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
তবে সরকারি পে স্কেলের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে বেসরকারি খাতের সব প্রতিষ্ঠানের পক্ষে একই হারে বেতন বাড়ানো সম্ভব নয়। তাদের বেতন দেওয়ার সক্ষমতা নির্ভর করে উৎপাদনশীলতা, বিক্রি, মুনাফা, রপ্তানি আয় এবং প্রতিষ্ঠানের আকারের ওপর। বৃহৎ প্রতিষ্ঠান কিছুটা সমন্বয় করতে পারলেও ক্ষুদ্র ও মাঝারি প্রতিষ্ঠান বেশি চাপে পড়তে পারে। ব্যয় হঠাৎ বেড়ে গেলে কোনো কোনো প্রতিষ্ঠান নতুন নিয়োগ কমাতে, কর্মী ছাঁটাই করতে, অনানুষ্ঠানিক কর্মসংস্থান বাড়াতে অথবা পণ্য ও সেবার দাম বাড়াতে পারে। ফলে বেসরকারি খাতে বেতন সমন্বয়ের বিষয়টি বাস্তবসম্মত, খাতভিত্তিক ও আলোচনানির্ভর হওয়া প্রয়োজন।
সার্বিকভাবে, নতুন পে স্কেলকে প্রয়োজনীয় আয় সমন্বয় হিসেবে দেখা যায়। তবে এর পূর্ণ যৌক্তিকতা প্রতিষ্ঠিত হবে তখনই, যখন সুষ্ঠু অর্থায়ন ও মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি সরকারি সেবায় পরিমাপযোগ্য উন্নতি আসবে
তৈরি পোশাকশিল্প আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতা, জ্বালানির অনিশ্চয়তা, ঋণের উচ্চ ব্যয় এবং উৎপাদন খরচ বৃদ্ধির চাপে রয়েছে। তাই এ খাতে মজুরি সমন্বয়ের ক্ষেত্রে শ্রমিকের জীবনযাত্রার ব্যয় এবং শিল্পের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা— দুটিই বিবেচনায় নিতে হবে। কম মজুরিও দীর্ঘমেয়াদে টেকসই নয়; এতে শ্রমিকের পুষ্টি, স্বাস্থ্য, মনোবল ও উৎপাদনশীলতা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। মজুরি বৃদ্ধির পাশাপাশি শ্রমিকের দক্ষতা উন্নয়ন, আধুনিক ব্যবস্থাপনা, নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি সরবরাহ, প্রযুক্তির ব্যবহার এবং উচ্চমূল্যের পণ্য উৎপাদনের ওপর গুরুত্ব দিতে হবে।
ব্যাংক, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, পরিবহন, তথ্যপ্রযুক্তি এবং অন্যান্য সেবা খাতেও বেতন বাড়ানোর চাপ তৈরি হতে পারে। প্রতিষ্ঠানগুলো যদি এই অতিরিক্ত ব্যয়ের পুরোটা গ্রাহকের ওপর চাপিয়ে দেয়, তাহলে সেবার মূল্য বাড়বে এবং মূল্যস্ফীতির পরিধি আরও বিস্তৃত হবে। তাই এককভাবে সব প্রতিষ্ঠানের ওপর চাপ প্রয়োগের পরিবর্তে খাতভিত্তিক সংলাপ, নিয়মিত মজুরি পর্যালোচনা এবং মূল্যস্ফীতি ও উৎপাদনশীলতার সঙ্গে সংগতিপূর্ণ বেতন নির্ধারণের ব্যবস্থা প্রয়োজন।
পে স্কেলের কারণে সরকারের ব্যয় বৃদ্ধির বিষয়টিও গুরুত্বের সঙ্গে দেখতে হবে। এটি শুধু এক বছরের অতিরিক্ত ব্যয় নয়; বরং একটি স্থায়ী আর্থিক দায়। মূল বেতনের সঙ্গে বিভিন্ন ভাতা এবং ভবিষ্যৎ পেনশন ব্যয়ও বাড়বে। ফলে পরিচালন ব্যয়ের অংশ বেড়ে গেলে স্বাস্থ্য, শিক্ষা, সামাজিক সুরক্ষা, অবকাঠামো রক্ষণাবেক্ষণ এবং উন্নয়ন কর্মসূচির জন্য অর্থের সুযোগ সংকুচিত হতে পারে।
বাংলাদেশে এমনিতেই রাজস্ব আহরণ দুর্বল এবং বাজেট ঘাটতি রয়েছে। অতিরিক্ত ব্যয় মেটাতে সরকার ব্যাংক থেকে বেশি ঋণ নিলে বেসরকারি খাতের জন্য ঋণের প্রাপ্যতা কমতে এবং সুদের হারের ওপর চাপ সৃষ্টি হতে পারে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের অর্থায়ন বা নতুন টাকা সৃষ্টির ওপর নির্ভরতা বাড়লে মূল্যস্ফীতির ঝুঁকিও বাড়বে। আবার প্রয়োজনীয় উন্নয়ন ও সামাজিক ব্যয় ব্যাপকভাবে কমানো হলে প্রবৃদ্ধি, কর্মসংস্থান এবং নিম্ন আয়ের মানুষের কল্যাণ ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
এই ব্যয়ের অর্থায়নে সাধারণ মানুষের ওপর পরোক্ষ করের বোঝা বাড়ানোও কাম্য নয়। ভ্যাট ও ভোগকর বাড়লে নিম্ন ও মধ্যম আয়ের মানুষ তুলনামূলকভাবে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। সরকারকে তাই করের হার নির্বিচারে না বাড়িয়ে করের আওতা সম্প্রসারণ, উচ্চ আয়ের ব্যক্তিদের কর পরিপালন নিশ্চিত করা, অযৌক্তিক কর অব্যাহতি পর্যালোচনা, কর ফাঁকি রোধ এবং কর প্রশাসনকে ডিজিটাল ও স্বচ্ছ করার দিকে যেতে হবে। একই সঙ্গে অপ্রয়োজনীয় সরকারি ব্যয়, অপচয় এবং কম অগ্রাধিকারসম্পন্ন প্রকল্প থেকে সাশ্রয় করতে হবে। পে স্কেলের প্রতিটি পর্যায় বাস্তবায়নের সঙ্গে রাজস্ব আদায়, মূল্যস্ফীতি, সরকারি ঋণ এবং বাজেট ঘাটতির পরিস্থিতি নিয়মিত পর্যালোচনা করা প্রয়োজন।
স্বল্পমেয়াদে নতুন পে স্কেল সরকারি কর্মচারীদের নামমাত্র ও প্রকৃত আয় বাড়াবে। বিশেষ করে নিম্ন গ্রেডের কর্মীদের বেতন তুলনামূলক বেশি সমন্বয় করা হলে এর সামাজিক সুফলও বেশি হবে। তারা আয়ের বড় অংশ খাদ্য, বাসস্থান, চিকিৎসা ও সন্তানের শিক্ষায় ব্যয় করেন। বেতন কাঠামোয় সর্বনিম্ন ও সর্বোচ্চ বেতনের ব্যবধান যেন অযৌক্তিকভাবে না বাড়ে, সেদিকেও নজর দেওয়া প্রয়োজন।
কিন্তু মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ করা না গেলে কয়েক বছরের মধ্যে বেতন বৃদ্ধির একটি বড় অংশ মূল্যবৃদ্ধিতে হারিয়ে যেতে পারে। বিশেষ করে বাসাভাড়া ও বিভিন্ন সেবার মূল্য দ্রুত বাড়লে নতুন বেতনের প্রকৃত সুবিধা কমে যাবে। তাই পে স্কেলকে বিচ্ছিন্ন সিদ্ধান্ত হিসেবে না দেখে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, সামাজিক সুরক্ষা, আবাসন, গণপরিবহন এবং সুলভ স্বাস্থ্য ও শিক্ষা সুবিধার সঙ্গে যুক্ত করে দেখতে হবে। নিয়মিত ও পূর্বানুমানযোগ্য পদ্ধতিতে জীবনযাত্রার ব্যয় পর্যালোচনা করা গেলে দীর্ঘ বিরতির পর একবারে খুব বড় সমন্বয়ের প্রয়োজনও কমবে।
বেতন বৃদ্ধির সঙ্গে সরকারি সেবার মানের বিষয়টিও সরাসরি যুক্ত হওয়া উচিত। সরকারি কর্মচারীদের উন্নত জীবনযাপনের অধিকার রয়েছে। একই সঙ্গে বেতন বৃদ্ধির ব্যয় জনগণের করের অর্থ থেকে বহন করা হবে। তাই জনগণেরও দ্রুত, স্বচ্ছ ও হয়রানিমুক্ত সেবা পাওয়ার অধিকার রয়েছে। তবে শুধু বেতন বাড়ালেই সেবার মান স্বয়ংক্রিয়ভাবে উন্নত হবে বা দুর্নীতি বন্ধ হয়ে যাবে— এমন ধারণা বাস্তবসম্মত নয়। এর জন্য প্রশাসনিক সংস্কার, কার্যকর তদারকি এবং জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে।
পাসপোর্ট, ভূমি নিবন্ধন, কর, লাইসেন্স, সামাজিক সুরক্ষা, স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও স্থানীয় সরকারের সেবা নিতে মানুষকে যেন বারবার অফিসে যেতে না হয়, অপ্রয়োজনীয় কাগজ জমা দিতে না হয় এবং মধ্যস্বত্বভোগীর সহায়তা নিতে না হয়। প্রতিটি সেবার জন্য প্রয়োজনীয় কাগজপত্র, নির্ধারিত ফি ও সর্বোচ্চ সময় প্রকাশ করতে হবে। আবেদন গ্রহণের রসিদ, অনলাইনে অগ্রগতি জানার সুযোগ এবং নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে সিদ্ধান্ত দেওয়ার বাধ্যবাধকতা থাকা প্রয়োজন। কোনো আবেদন প্রত্যাখ্যান করা হলে তার কারণ লিখিতভাবে জানাতে হবে।
সার্বিকভাবে, নতুন পে স্কেলকে প্রয়োজনীয় আয় সমন্বয় হিসেবে দেখা যায়। তবে এর পূর্ণ যৌক্তিকতা প্রতিষ্ঠিত হবে তখনই, যখন সুষ্ঠু অর্থায়ন ও মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি সরকারি সেবায় পরিমাপযোগ্য উন্নতি আসবে। বেতন বৃদ্ধি কর্মচারীদের আর্থিক নিরাপত্তা বাড়াবে; আর প্রশাসনিক সংস্কার নিশ্চিত করবে, যেন এর সুফল নাগরিকের কাছেও পৌঁছায়। সরকার, কর্মচারী, বেসরকারি খাত এবং সাধারণ মানুষের স্বার্থের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করেই এ সিদ্ধান্তের অর্থনৈতিক ও সামাজিক সুফল নিশ্চিত করতে হবে।
লেখক: সম্মাননীয় ফেলো, সিপিডি






