ভাড়া নয়, ভালোবাসায় তুষ্ট কমলেশ

কমলেশের নৌকায় পার হচ্ছে শিক্ষার্থীরা
ইঞ্জিনচালিত নৌকার খটখট শব্দ, নৌকাটি দক্ষিণ গফরগাঁও উপজেলার নিগুয়ারি ইউনিয়নের সুতারচাপর ঘাট থেকে নিগুয়ারি বাজার ঘাটের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। নৌকায় অর্ধশতাধিক শিক্ষার্থী, সঙ্গে কয়েকজন গ্রামবাসীও। নিগুয়ারি বাজার ঘাটের পাড়েই নিগুয়ারি সাইদুর রহমান উচ্চবিদ্যালয়, শতবর্ষী নিগুয়ারি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় আর ক্যাপ্টেন (অব.) গিয়াস উদ্দিন আহম্মেদ কলেজ।
নৌকা ঘাটে ভেড়ার সঙ্গে সঙ্গে হুড়মুড়িয়ে নেমে স্কুল -কলেজের দিকে ছুটল শিক্ষার্থী আরিফ, শুভ, ইসরাত ও নওশীন। কয়েকজন গ্রামবাসী ৫ টাকা করে নৌকাভাড়া পরিশোধ করলেন। কিন্তু ছাত্রছাত্রীদের কাছ থেকে খেয়া পারাপারের কোনো ভাড়া নিলেন না নৌকার মাঝি কমলেশ (৫২)।
প্রায় ৪২ বছর ধরে সুতারচাপর ঘাটের কমলেশ এমন করে বিনা ভাড়ায় ছাত্রছাত্রীদের নদী পার করে দিচ্ছেন।
এখানে কালী বানার, সুতিয়া আর ধামকা নদীর মোহনা। মোহনার তীরেই গাজীপুরের শ্রীপুর উপজেলার নান্দিয়া সাংগুন গ্রামে কমলেশের বাড়ি। তিনি জানালেন, তার বাবা দীনেশ চন্দ্র, পিতামহ উমেশ চন্দ্র, পিতার পিতামহ বিহারি শতাধিক বছর ধরে ত্রিমোহনী এলাকায় খেয়া পারাপার করেছেন।
‘আমার বয়স যখন ১০ বছর, তখন বাবা ডেকে নিয়ে হাতে নৌকার বৈঠা ধরিয়ে দিয়েছিলেন। বাবা আমাকে এ-ও জানিয়েছিলেন, নিগুয়ারি বাজারের স্কুলগুলো প্রতিষ্ঠার পর থেকে ছাত্রছাত্রীদের প্রথমে তার বাবা, তার পরে তিনি বিনা ভাড়ায় খেয়া পারাপার করেছেন। আমিও যেন তাই করি। সেই থেকে শুরু’— বলছিলেন কমলেশ।
কমলেশের চার ছেলে ও দুই মেয়ের মধ্যে বড় দুই ছেলে শ্রমিকের কাজ করেন। দুই মেয়েকে বিয়ে দিয়েছেন। সংসার চালাতে এবং মেয়েদের বিয়ে দিতে গিয়ে সহায়-সম্বল, বাড়ি-ভিটা সবই বিক্রি করে দিয়েছেন। বর্তমানে অন্যের জমিতে ঘর তুলে পরিবার নিয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছেন।
কমলেশ জানালেন, খরচ বাদে রোজ তিনশ থেকে চারশ টাকা আয় হয়, তা দিয়ে পরিবারের খরচ মেটানো সম্ভব হয় না। তারপরও আমি ছাত্রছাত্রীদের কাছ থেকে ভাড়া নিই না। আমার বাপ-দাদারা ১০০ বছর ধরে এই ঘাটে স্কুলের ছাত্রছাত্রীদের পার করেছেন। তারাও কোনো ভাড়া নেননি।
নিগুয়ারি সাইদুর রহমান উচ্চবিদ্যালয়ের দশম শ্রেণির শিক্ষার্থী ইসরাত জাহান পুষ্প, মোস্তাক আহম্মেদ পরশের ভাষ্য, প্রতিদিন নিগুয়ারি বাজারের তিনটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পাঁচশতাধিক শিক্ষার্থী বিনা ভাড়ায় কমলেশ কাকার নৌকা দিয়ে নদী পারাপার হয়।
সাইদুর রহমান উচ্চবিদ্যালয়ের শিক্ষিকা জান্নাতুল ফেরদৌস জানালেন, নিগুয়ারি ইউনিয়নের অললি, তললি, পাতলাশি, সুতারচাপর, ভুসভুসিয়া, সাধুয়া গ্রামের হাজারখানেক শিক্ষার্থী নদীর অন্য পাড়ে নিগুয়ারি বাজারের তিনটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে লেখাপড়া করে। কমলেশ তাদের বিনা ভাড়ায় নদী পারাপার করে আসছেন ৪০-৪২ বছর ধরে।
নিগুয়ারি গ্রামের বাসিন্দা, শ্রীপুরের বরমী কলেজের শিক্ষক অধ্যাপক সোহেল মাজহার বললেন, শতবছর ধরে ছাত্রছাত্রীদের জন্য কমলেশ মাঝির পরিবারের এই সেবা নিঃসন্দেহে অনন্য উদাহরণ।
নিগুয়ারি গ্রামের ব্যবসায়ী কাজল খানের (৫৭) মতে, অভাবের মধ্যে থেকেও হতদরিদ্র ভূমিহীন কমলেশের অন্যের উপকার করার যে মানসিকতা, তা সত্যি প্রশংসনীয়।
নিগুয়ারি সাইদুর রহমান উচ্চবিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক এস এম শওকত আলী জানালেন, কমলেশ মাঝির দেখাদেখি এই ঘাটের অন্য মাঝিরাও ছাত্রছাত্রীদের বিনা ভাড়ায় নদী পারাপার করেন।
অল্পতেই সন্তুষ্টি কমলেশের। বললেন, যারা ত্রিমোহনী এলাকার তিনটি ঘাট দিয়ে নদী পার হন সবাই আমাকে চেনেন, জীবনে হাজার হাজার ছাত্রছাত্রীকে বিনা পয়সায় নৌকা দিয়ে নদী পার করে দিয়েছি; তারা সবাই আমাকে সম্মান করেন, ভালোবাসেন। আমার আর কী লাগে!





