স্কুল থেকে বিয়ে বাড়ি— ইরানে মার্কিন হামলা থেকে রেহাই পাচ্ছে না কিছুই

মিনাবে যুক্তরাষ্ট্রের হামলায় নিহত ইরানি শিশুদের জন্য খনন করা কবর। ফাইল ছবি/ রয়টার্স
ছয় মাস আগে ইরানে আকস্মিক হামলা চালিয়েছিল যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল। ধারণা করা হচ্ছিল, লক্ষ্যবস্তু সামরিক স্থাপনায় সীমাবদ্ধ থাকবে। কিন্তু মিনাবে স্কুলে হামলার মাধ্যমে সে ধারণা ভুল প্রমাণিত হয়।
এরপর হাসপাতাল, খেলার মাঠ থেকে শুরু করে ঐতিহাসিক স্থাপনা— লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছে সবকিছুই। সর্বশেষ হামলার ঘটনা ঘটেছে বিয়ে বাড়িতেও। অর্থাৎ, ইরানের সামরিক থেকে বেসামরিক কোনো স্থাপনাই মার্কিন হামলা থেকে রেহাই পাচ্ছে না।
ইরানের দক্ষিণাঞ্চলের সিরিকে একটি বাড়িতে বিয়ের অনুষ্ঠান চলাকালে আজ বুধবার ভোরে যুক্তরাষ্ট্রের হামলায় কমপক্ষে পাঁচজন নিহত হয়েছেন। গতকাল মঙ্গলবার মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড নতুন দফার এ হামলা শুরু করে।
এ হামলাকে ইরান ‘নৃশংস’ হিসেবে দেখছে। দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই বলেছেন, বুধবার ভোরে কুহেস্তাক শহরের ওই বাড়িতে ‘নৃশংস’ হামলা চালানো হয়। এতে আহত হয়েছেন ৬৩ জনের বেশি। নিহতদের মধ্যে একটি শিশুও রয়েছে।
ইরানের রেড ক্রিসেন্টের প্রকাশ করা ভিডিওতে দেখা গেছে, হামলায় একটি ভবনের দেয়াল ও জানালা উড়ে গেছে। মাটিতে ছড়িয়ে আছে ধ্বংসাবশেষ। পরে সংস্থাটি হাসপাতালে চিকিৎসা নেওয়া কয়েকটি শিশুর ছবিও প্রকাশ করে।
ইরানের আধা-সরকারি ফার্স নিউজ এজেন্সি হামলা থেকে বেঁচে যাওয়া এক শিশুর বক্তব্যও প্রচার করেছে। ওই শিশু জানিয়েছে, ঘটনাস্থলে যাওয়ার আগে সে যুদ্ধবিমান উড়তে দেখেছিল।
ভিডিওতে তাকে বলতে শোনা গেছে, ‘আমি সেখানে পৌঁছানোর পর একটি বিস্ফোরণ ঘটে। বিস্ফোরণটি ছিল খুবই তীব্র। ইট, পাথর ও সিমেন্টের টুকরা আমার মুখ ও মাথায় আঘাত করে। আরও অনেকে আহত হন। আমরা সবাই ছিলাম অনুষ্ঠানে আসা সাধারণ বেসামরিক মানুষ।’
বেসামরিক ইরানিদের হামলার লক্ষ্যবস্তু করা এবারই প্রথম নয়। ২৮ ফেব্রুয়ারি রাতে ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযানের শুরু থেকেই যুক্তরাষ্ট্র এ কাজ করে আসছে। ধারাবাহিকভাবে ইরানের স্কুল, খেলার মাঠ, হাসপাতাল, এমনকি পানি শোধানাগারের মতো সম্পূর্ণ বেসামরিক অবকাঠামোতে হামলা চালিয়েছে মার্কিন বাহিনী।
এসব হামলায় বহু মানুষ হতাহতের ঘটনায় মানবাধিকার সংগঠনগুলো নিন্দা জানিয়েছে।
মিনাবে স্কুলে ভয়াবহ হামলা
যুদ্ধের প্রথম দিনেই দক্ষিণ ইরানের হরমুজগান প্রদেশের মিনাব শহরে একটি স্কুলে ভয়াবহ হামলা হয়। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক হামলায় শাজারেহ তাইয়্যেবেহ প্রাথমিক বিদ্যালয়টি আক্রান্ত হয়। এটি মেয়েদের একটি প্রাথমিক বিদ্যালয় ছিল। হামলার সময় চলছিল ক্লাস।
হামলায় ১৫৬ জন নিহত হন বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। নিহতদের মধ্যে ১২০ জন স্কুলশিশু ছিল। সংঘাত শুরুর পর এটিকে বেসামরিক মানুষের জন্য সবচেয়ে প্রাণঘাতী একক ঘটনা হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
স্কুলটি পাশের আইআরজিসির একটি নৌঘাঁটি থেকে প্রায় ২০০ ফুট দূরে ছিল। ওই নৌঘাঁটিই হামলার আসল লক্ষ্য ছিল বলে দাবি করে ওয়াশিংটন।
স্বাধীন ফরেনসিক তদন্তে ঘটনাস্থল থেকে পাওয়া ধ্বংসাবশেষ পরীক্ষা করে বেলিংক্যাট ও ওপেন সোর্স মিউনিশনস পোর্টাল জানিয়েছে, সেখানে আরজিএম/ইউজিএম-১০৯ টমাহক ল্যান্ড অ্যাটাক ক্ষেপণাস্ত্রের অংশ পাওয়া গেছে। এই অস্ত্রব্যবস্থা ওই সংঘাতের ক্ষেত্রে শুধু যুক্তরাষ্ট্রই ব্যবহার করে।
হামলার কারণ হিসেবে মার্কিন সামরিক তদন্তকারী ও জাতীয় নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা ‘ভুল লক্ষ্য শনাক্তকরণের’ কথা বলেছেন। ধারণা করা হয়, পুরনো বা হালনাগাদ না করা লক্ষ্য-সংক্রান্ত তথ্য এর কারণ হতে পারে।
স্যাটেলাইটের পুরনো তথ্যেও দেখা যায়, কয়েক বছর আগে ওই স্কুল ভবনটি আইআরজিসির নৌঘাঁটির অংশ হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছিল।
আরও ১,৫০০ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ক্ষতিগ্রস্ত
যুক্তরাষ্ট্রের হামলায় এখন পর্যন্ত ইরানের হাজারের বেশি স্কুল ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
মে মাসের শেষ নাগাদ লন্ডনভিত্তিক সংবাদমাধ্যম ইরান ইন্টারন্যাশনালের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, দেশটিতে ১৫টি স্কুল পুরোপুরি ধ্বংস হয়েছে। পাশাপাশি ১ হাজার ৫০০টির বেশি স্কুল ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
ইরানের স্কুল সংস্কার সংস্থার হিসাবে ক্ষতিগ্রস্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সংখ্যা ১ হাজার ৫০৭টির বেশি। এর আগে ইরানের রেড ক্রিসেন্ট ও শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের হিসাবে ক্ষতিগ্রস্ত ভবনের সংখ্যা ৬০০ থেকে ১ হাজার তিনশর মধ্যে ছিল।
দেশটির কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, ক্ষতিগ্রস্ত কয়েকশ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান মেরামত করা হয়েছে বা পুনর্নির্মাণের জন্য নির্ধারিত হয়েছে। এ কাজে বিভিন্ন দাতব্য সংস্থা সহায়তা করছে। তুলনামূলকভাবে কম বা মাঝারি মাত্রায় ক্ষতিগ্রস্ত অনেক স্কুল ধীরে ধীরে আবার চালু হয়েছে।
হামলা শুরুর পর দেশ জুড়ে শত শত শিক্ষার্থী ও শিক্ষক নিহত বা আহত হয়েছেন বলেও বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
লামের্দে খেলার মাঠে হামলা
একই দিনে দক্ষিণ ইরানের লামের্দে একটি স্পোর্টস সেন্টারে মার্কিন হামলায় অন্তত ২১ জন নিহত হন। ওই সময় সেখানে একটি নারী ভলিবল দলের সদস্যরা অনুশীলন করছিলেন।
লক্ষ্যে নির্ভুলভাবে হামলায় সক্ষম মার্কিন ক্ষেপণাস্ত্র দিয়ে হামলাটি চালানো হয় বলে জানায় ইরানের সংবাদমাধ্যমগুলো।
রক্ষা পাচ্ছে না হাসপাতালও
ইরানের আহভাজে বাঘাই বিশেষায়িত হাসপাতালও ধারাবাহিক হামলায় পুরোপুরি অচল হয়ে পড়ে। হাসপাতালটি থেকে রোগীদের সরিয়ে নিতে হয়।
আহভাজের বাঘাই বিশেষায়িত হাসপাতাল ভবনে সরাসরি কোনো ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত করেনি। তবে কাছাকাছি বিস্ফোরণের তীব্র ধাক্কায় ভবনটির কাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
এর ফলে ২১১ জন শিশু ক্যানসার রোগীকে দ্রুত হাসপাতাল থেকে সরিয়ে নিতে হয়। তাদের অনেকেই তখন কেমোথেরাপি নিচ্ছিল।
বিস্ফোরণের পর হাসপাতালে বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ হয়ে যায়। বিভিন্ন স্থাপনায়ও দেখা দেয় সমস্যা। পরিস্থিতির কারণে আঞ্চলিক স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষ হাসপাতালটি সাময়িকভাবে পুরোপুরি বন্ধ করে দেয়। রোগীদের আশপাশের বিভিন্ন চিকিৎসাকেন্দ্রে সরিয়ে নেওয়া হয়।
বিস্ফোরণের কারণে যদিও কারও মৃত্যুর খবর পাওয়া যায়নি। তবে চিকিৎসকরা শিশুদের গুরুতর মানসিক আঘাত এবং জীবন রক্ষাকারী চিকিৎসা ব্যাহত হওয়ার কথা জানিয়েছেন।
ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে ঘটনাটির নিন্দা করেছেন। তিনি এটিকে ‘বর্বর হামলা’ এবং ‘কাপুরুষোচিত যুদ্ধাপরাধ’ হিসেবে উল্লেখ করেছেন।
তেহরান বলেছে, চিকিৎসা অবকাঠামোর এত কাছাকাছি যুক্তরাষ্ট্রের হামলার ঘটনা গাজায় ইসরায়েলি সামরিক অভিযানে স্বাস্থ্যসেবা স্থাপনায় হামলার কথা মনে করিয়ে দেয়।
এদিকে মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) জানায়, ওই সন্ধ্যায় ইরানের অন্তত পাঁচটি শহরে ব্যাপক হামলা চালিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র।
সেন্টকমের কর্মকর্তারা বলেছেন, মার্কিন বাহিনী শুধু নির্দিষ্ট সামরিক স্থাপনাকে লক্ষ্য করে হামলা চালায়। এর মধ্যে আইআরজিসির কমান্ড কমপ্লেক্স রয়েছে। বেসামরিক মানুষ বা চিকিৎসা অবকাঠামোকে ইচ্ছাকৃতভাবে লক্ষ্য করে হামলা চালানো হয়নি বলেও তারা দাবি করেছেন।
এ ছাড়াও ইরানের ইরানশাহর ও সেমনান শহরের বেসামরিক বিমানবন্দরও যুক্তরাষ্ট্রের হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এসব স্থাপনায় ভবনের কাঠামোগত ক্ষতির পাশাপাশি বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন হওয়ার খবর পাওয়া যায়।
মানবাধিকার সংগঠনগুলো বেসামরিক মানুষের জন্য গুরুত্বপূর্ণ আরও কিছু স্থাপনায় হামলার বিষয়টি তুলে ধরেছে। এর মধ্যে রয়েছে দেহলোরানের একটি বোতলজাত পানি উৎপাদন কেন্দ্র, আঞ্চলিক লবণমুক্তকরণ কেন্দ্র এবং গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি অবকাঠামো।
বুশেহর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের মতো গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাও হামলার তালিকায় রয়েছে বলে তারা জানিয়েছে।
সব মিলিয়ে ইরানে যুক্তরাষ্ট্রের সাম্প্রতিক হামলা থেকে সামরিক স্থাপনার পাশাপাশি বেসামরিক মানুষের বসতি, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, হাসপাতাল, বিমানবন্দর, পানি সরবরাহ ও জ্বালানি অবকাঠামোও রেহাই পাচ্ছে না।















