আগস্টেই আক্রান্ত ৫০ হাজার, প্রাণ গেল ১৮২ জনের
- হাম ও ডেঙ্গুর জোড়া থাবা

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
একদিকে শিশুর গায়ে জ্বরের উত্তাপ, লাল লাল র্যাশ। অন্যদিকে এডিস মশার কামড়ে কর্মক্ষম মানুষের হঠাৎই ঢলে পড়া। হাসপাতালে খালি নেই শয্যা। হাম ও ডেঙ্গুর জোড়া থাবায় দীর্ঘ হচ্ছে মৃত্যুর তালিকা। সরকারি হিসাবে শুধু গত আগস্টেই এ দুই রোগে আক্রান্ত ৫৩ হাজার ৮২৯ জনের বেশি। মারা গেছেন ১৮২ জন।
গত মার্চ থেকে হাম সংক্রমণে মানুষ দিশাহারা। সবচেয়ে বেশি কাবু শিশুরা। প্রাদুর্ভাবের পাঁচ মাস পার হলেও হাম নিয়ন্ত্রণ হয়নি, বরং আগস্টে আগের মাসের তুলনায় আক্রান্ত ও মৃত্যু বেড়েছে। এরই মধ্যে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত ও মৃত্যুর ঊর্ধ্বমুখী পরিসংখ্যানে অনেক পরিবারই আতঙ্কিত।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের রোগ নিয়ন্ত্রণ বিভাগের সাবেকক পরিচালক এবং জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ বে-নজীর আহমেদের ভাষ্য, সরকার হামে একদম তালগোল পাকিয়ে ফেলেছে। টিকা এবং প্রচার-প্রচারণার ঘাটতিতে হাম ঠেকানো যাচ্ছে না। তার মতে, হাম সর্বসময় সঞ্চারণশীল রোগে পরিণত হতে যাচ্ছে।
এই জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ আরও বলছেন, ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণের চলমান কার্যক্রম কার্যকরী না হওয়ায় ভয়াবহতা বাড়ছে। এডিস মশার নিয়ন্ত্রণ কঠোরভাবে না করা গেলে, মৌসুমি এ রোগ সামনে আরও বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হেলথ ইমার্জেন্সি অপারেশন সেন্টার অ্যান্ড কন্ট্রোল রুমের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, প্রতিরোধযোগ্য হামে জুলাইয়ে প্রতিদিন গড়ে আক্রান্ত হয়েছে ১০১১ জন। আগস্টে সেটি বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১০৭৪ জনে। আগস্টে হামে আক্রান্ত হয়ে মারা গেছে ১৩৯ শিশু, আগের মাসে মৃত্যুর সংখ্যা ছিল ১১৯ জন। মৃতদের বেশিরভাগই শিশু।
সরকারের তথ্য আরও বলছে, চলতি বছরের মার্চ থেকে আগস্ট পর্যন্ত হামে আক্রান্ত হয়ে ৯৭৯ জনের মৃত্যু হয়েছে। আক্রান্তের সংখ্যা ১ লাখ ৭৮ হাজার ৫৩৪ জন। এর মধ্যে তথ্য নথিভুক্ত হওয়া সবশেষ ২৪ ঘণ্টায় আক্রান্ত হয়েছে ১ হাজার ২৩১ জন। মারা গেছে ছয়জন। হামে আক্রান্ত ছয় বছরের রবিউল হোসেনকে ভর্তি করা হয়েছে রাজধানী শ্যামলীর বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউটে। এক সপ্তাহ ধরে অসুস্থ ঢাকার গাজীপুরের এই শিশু। প্রচণ্ড জ্বর নিয়ে স্থানীয় হাসপাতালে পাঁচ দিন চিকিৎসার পর অবস্থার অবনতি হলে নিয়ে আসা হয় ঢাকায়। রিকশাচালক বাবা হাসপাতালের খরচ জোগাতে এরই মধ্যে রিকশা বিক্রি করেছেন। এখন ধার করে চলছে। সরোয়ার হোসেন বললেন, ‘বড় আদরের পোলা। তিন মাইয়ার পরে হইছে। ট্যাকা গেলেও যেনো বাঁইচ্যা থাহে।’
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হিসাব বলছে, আগস্ট মাসে মশাবাহিত ডেঙ্গু রোগে আক্রান্ত হয়েছে ২০ হাজার ৫৩৬ জন, যা আগের মাসের দ্বিগুণের চেয়েও বেশি। জুলাইয়ে আক্রান্তের সংখ্যা ছিল ৯ হাজার ২০৬ জন। আবার ডেঙ্গুতে ভুগে জুলাইয়ে মারা গেছে ৩৬ জন, যা আগস্টে এসে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৪৩ জনে। চলতি বছরে মশাবাহিত এ রোগে আক্রান্ত হয়েছে ৩৭ হাজার ১৭০ ব্যক্তি। মারা গেছে ১০২ জন।
অধিদপ্তরের তথ্য আরও বলছে, ২৪ ঘণ্টায় ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়েছে ১ হাজার ৩২৪ জন। এ সময় মারা গেছে ৫ জন।
শিশু ও বয়স্কদের তুলনায় ডেঙ্গুতে কর্মক্ষমরা বেশি মারা যাচ্ছেন। এতে অনেক পরিবারকে স্বজন হারানোর পাশাপাশি সংসার চালাতেও ভুগতে হচ্ছে। দুই সপ্তাহ আগে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে মারা যান বরিশালের বাদল রহমান (৩৮)। ছয়জনের সংসারে তিনিই ছিলেন একমাত্র উপার্জনক্ষম। তার স্ত্রী রেশমা আক্তার (২৭) বলছিলেন, ‘স্বামীর মৃত্যুর পর আত্মীয়-স্বজনরা কিছু টাকা দিয়েছেন। সেটি দিয়েই এখন চলছি। সংসার কীভাবে চলবে, সেটি এখনো বুঝতে পারছি না। এক সন্তানের বয়স পাঁচ, আরেকজনের তিন বছর।’
বাংলাদেশের রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের (আইইডিসিআর) সাবেক প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা এবং জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ মুশতাক হোসেন বললেন, সরকারকে এডিস মশা নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রম সারা বছর ধরে একই গুরুত্ব দিয়ে চালাতে হবে। পাশাপাশি ডেঙ্গুতে মৃত্যুরোধে জ্বর হলেই পরীক্ষা করাতে হবে। এতে দ্রুত রোগ শনাক্ত হলে রোগীর শারীরিক জটিলতা কম হবে।
হাম নিয়ন্ত্রণে এক মাসের মধ্যে টিকার কাভারেজ লক্ষ্যমাত্রার শতভাগ পূরণ হয়েছে বলে জানালেন প্রধানমন্ত্রীর স্বাস্থ্যবিষয়ক বিশেষ সহকারী (প্রতিমন্ত্রীর মর্যাদা) ও জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ জিয়াউদ্দিন হায়দার। আগামীর সময়কে বলেছেন, ‘তারপরও হামে অনেক শিশু মারা গেছে, যেখানে প্রতিরোধযোগ্য রোগে একটা শিশুর মৃত্যুও কাম্য নয়। এই শিশুরা হামে নাকি অন্য কোনো কারণে মারা যাচ্ছে, তা দেখতে গবেষণা চলছে। মা ও শিশুর অপুষ্টির পাশাপাশি দেরি করে চিকিৎসাকেন্দ্রে আসার প্রবণতায়ও মৃত্যু বাড়ছে।’







