লোডশেডিংয়ের ধাক্কা ছাপাখানায়, সময়মতো বই পাবে কি শিক্ষার্থীরা
- বিনামূল্যের বই ছাপার কাজ বাধাগ্রস্ত
- নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ চেয়ে বিদ্যুৎ বিতরণ কোম্পানিকে চিঠি এনসিটিবির
- বছরের প্রথম দিনে বই দেওয়া নিয়ে শঙ্কা

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
দিনে চার ঘণ্টা বিদ্যুৎ, বাকি সময় জেনারেটর— এভাবেই চলছে ২০২৭ শিক্ষাবর্ষের বিনামূল্যের পাঠ্যবই ছাপার কাজ। বছরের প্রথম দিনেই শিক্ষার্থীদের হাতে বই পৌঁছে দিতে ৩০ নভেম্বরের মধ্যে ৩০ কোটির বেশি বই ছাপার লক্ষ্য থাকলেও লোডশেডিংয়ে তা ব্যাহত হচ্ছে চরমভাবে। যদিও এটি সরকারের অগ্রাধিকার কাজ। বাধ্য হয়ে বড় প্রেসগুলো জেনারেটর চালিয়ে কোনোমতে কাজ চালালেও দিনে গড়ে ৯০ থেকে ১ লাখ টাকা পর্যন্ত খরচ হচ্ছে জ্বালানিতে। কখনো বিদ্যুৎ, কখনো জেনারেটর— এভাবে বারবার মেশিন বন্ধ ও চালু করায় নষ্ট হচ্ছে কাগজ। বাতিল হচ্ছে ছাপার ফর্মা।
এমন প্রেক্ষাপটে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ অথবা নির্দিষ্ট সময়ে লোডশেডিংয়ের অনুরোধ জানিয়ে বিদ্যুৎ বিতরণ কোম্পানিগুলোকে চিঠি দিয়েছে জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড (এনসিটিবি)। তবে চিঠি ও ফোনে অনুরোধের পরও পরিস্থিতির উন্নতি না হওয়ায় এবার শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে বিদ্যুৎ বিভাগের হস্তক্ষেপ চেয়েছে এনসিটিবি। সব মিলিয়ে বছরের প্রথম দিনে শিক্ষার্থীদের হাতে নতুন বই তুলে দেওয়া নিয়ে সৃষ্টি হয়েছে শঙ্কা।
জানা গেছে, ২০২৭ শিক্ষাবর্ষের প্রাক-প্রাথমিক থেকে নবম শ্রেণি পর্যন্ত বিনামূল্যের ৩০ কোটির বেশি বই ছাপানোর কাজ শুরু হয়েছে গত ১৬ আগস্ট থেকে। লক্ষ্য, ৩০ নভেম্বরের মধ্যে মুদ্রণকাজ শেষ করে উপজেলা পর্যায়ে পাঠানো। সরকারের অগ্রাধিকার এ কার্যক্রমের অগ্রগতি নিয়ে প্রধানমন্ত্রী নিজেই কয়েক দফা খোঁজ নিয়েছেন।
কিন্তু লোডশেডিংয়ের কারণে ছাপার কাজ ব্যাহত হচ্ছে। বিশেষ করে ঢাকার বাইরের প্রেসগুলো দিনে বিদ্যুৎ পাচ্ছে গড়ে ৪ ঘণ্টা। এ সময় বাদে বাকি সময় অলস বসে থাকতে হচ্ছে ছাপাখানার কর্মীদের।
এনসিটিবি জানিয়েছে, চলতি বছর বই ছাপার কাজ পেয়েছে ১৩৩টি মুদ্রণ প্রতিষ্ঠান, যার বেশিরভাগই ঢাকার বাইরে। যাত্রাবাড়ীর মাতুয়াইল ছাড়া মানিকগঞ্জ, নারায়ণগঞ্জ, গাজীপুর, নোয়াখালী, চট্টগ্রাম, নরসিংদী, লক্ষ্মীপুর ও কুমিল্লায় প্রেস রয়েছে। প্রেসগুলো রাজধানীর বাইরে হওয়ায় বিদ্যুৎ সরবরাহের ওপরই নির্ভর করতে হচ্ছে। এজন্য প্রেসে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহের অনুরোধ জানিয়ে বিতরণ কোম্পানিগুলোকে চিঠি দিয়েছেন এনসিটিবির সচিব শাহ মুহাম্মদ ফিরোজ আল ফেরদৌস। ওই চিঠিতে কোনো এলাকায় নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ সম্ভব না হলে অন্তত নির্দিষ্ট সময়ে লোডশেডিংয়ের অনুরোধ জানানো হয়। যাতে ওই সময়ের বাইরে প্রেসগুলো নিরবচ্ছিন্নভাবে মেশিন চালাতে পারে।
চিঠিতে বলা হয়, নতুন শিক্ষাবর্ষের শুরুতেই শিক্ষার্থীদের হাতে বিনামূল্যের পাঠ্যবই পৌঁছে দেওয়া সরকারের অগ্রাধিকার কার্যক্রম। প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা অনুযায়ী ৩০ নভেম্বরের মধ্যে সব বইয়ের মুদ্রণকাজ শেষ করার লক্ষ্যে দিনরাত প্রেসে কাজ চলছে। এ অবস্থায় মুদ্রণ প্রতিষ্ঠানগুলোতে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ বজায় রাখা জরুরি।
এনসিটিবির এমন অনুরোধের পরও লোডশেডিং কমেনি বলে জানালেন বই ছাপার সঙ্গে জড়িত প্রেস মালিকরা। তাদের ভাষ্য, বই ছাপতে হলে বাধ্য হয়ে জেনারেটরের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে। এতে বাড়ছে উৎপাদন ব্যয়, আবার ঘন ঘন মেশিন বন্ধ ও চালু করায় নষ্ট হচ্ছে বিপুল পরিমাণ কাগজ।
মালিকরা জানালেন, একটি বড় প্রেসে জেনারেটর চালিয়ে প্রতিদিন গড়ে ৯০ হাজার থেকে ১ লাখ টাকার ডিজেল বা তেল খরচ হচ্ছে। জেনারেটর টানা তিন থেকে চার ঘণ্টা চলার পর অতিরিক্ত গরম হয়ে গেলে তা ঠান্ডা করতে এক থেকে দেড় ঘণ্টা বন্ধ রাখতে হয়। ফলে নিরবচ্ছিন্নভাবে মেশিন চালানো সম্ভব হচ্ছে না। একবার মেশিন বন্ধ করে আবার চালু করলে গড়ে ১০-১২ কেজি কাগজ নষ্ট হয়। মেশিন চালুর পর প্রথম দিকে অনেক ফর্মায় ছাপার মানও খারাপ হয়। কখনো পুরো ফর্মা বাতিল করতে হয়। এ কারণে ছোট ও মাঝারি আকারের অনেক প্রেস বই ছাপার কাজ আপাতত বন্ধ রেখেছে।
প্রমা প্রেস অ্যান্ড পাবলিকেশনসের মালিক মো. মহসিন আগামীর সময়কে বললেন, ‘লোডশেডিংয়ের কারণে চরম বিপাকে পড়েছি আমরা। দিনে গড়ে চার ঘণ্টার বেশি বিদ্যুৎ থাকে না। জেনারেটর চালিয়ে ছাপার কাজ চালু রাখতে গিয়ে প্রতিদিন শুধু তেলের পেছনেই অতিরিক্ত ৯০ হাজার থেকে ১ লাখ টাকা পর্যন্ত খরচ হচ্ছে। জেনারেটর টানা তিন-চার ঘণ্টা চালানোর পর গরম হয়ে গেলে সেটি ঠান্ডা করার জন্য কাজ বন্ধ রাখতে হয়।’
‘বিদ্যুৎ ও জেনারেটর সংযোগে এভাবে মেশিন বন্ধ ও চালু করতে গিয়ে বিপুল পরিমাণ কাগজ নষ্ট হচ্ছে। অনেক ফর্মাও বাতিল হচ্ছে। একদিকে অতিরিক্ত জ্বালানি খরচ, অন্যদিকে কাগজ ও ফর্মা নষ্ট, দুদিক থেকেই লোকসান হচ্ছে’— যোগ করলেন মহসিন।
লোডশেডিং এখন বই ছাপানোর কাজে মাথাব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে বলে মত এনসিটিবির চেয়ারম্যান অধ্যাপক মোহাম্মদ ফখরুল মাওলার। তিনি বললেন, ‘প্রেসগুলো ঠিকমতো বই ছাপাতে পারছে না। আমরা বিদ্যুৎ সরবরাহ কোম্পানিগুলোকে চিঠি দিয়েছি। সর্বশেষ ফোনেও প্রেস এলাকায় লোডশেডিং কমানো অথবা নির্দিষ্ট সময়ে, যেমন দুপুরে দুই ঘণ্টা লোডশেডিং করার অনুরোধ করেছি; কিন্তু পরিস্থিতির উন্নতি হয়নি। বিষয়টি এখন মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে সুরাহার উদ্যোগ নিয়েছি।’
এনসিটিবির কর্মকর্তারা জানালেন, বিদ্যুৎ সংকটের বিষয়টি শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে বিদ্যুৎ বিভাগকে জানানো হবে। প্রয়োজন হলে এ বিষয়ে আরও উচ্চপর্যায়ে হস্তক্ষেপ চাওয়া হতে পারে। দ্রুত বিদ্যুৎ সমস্যার সমাধান না হলে নির্ধারিত সময়ে বই মুদ্রণ ও শিক্ষার্থীদের হাতে পৌঁছে দেওয়ার কর্মসূচি কঠিন হয়ে পড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছেন তারা।
সার্বিক বিষয়ে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের সচিব আবদুল খালেক বলছিলেন, ‘লোডশেডিংয়ের বিষয়টি আমরা শুনেছি। বিষয়টি এনসিটিবি থেকে প্রস্তাব আকারে এলে বিদ্যুৎ বিভাগের সঙ্গে আলোচনা করব। প্রয়োজনে অন্য কোনো পদক্ষেপ নেওয়ার দরকার হলে সেটিও করা হবে।’







