সোনিয়ার স্মৃতিকথায় কি প্রকাশ্য হবে গান্ধী পরিবারের অন্দরের খবর

ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের সাবেক শীর্ষ নেত্রী সোনিয়া গান্ধী। ছবি : সংগৃহীত
ভারতের প্রধান বিরোধী দল কংগ্রেসের সভাপতি হওয়ার সময় সোনিয়া গান্ধী ছিলেন অনেকটাই অচেনা এক রাজনৈতিক চরিত্র। ১৯৯৮ সালে তিনি দলের দায়িত্ব নেন। এর আগে দীর্ঘদিন রাজনীতি থেকে দূরে ছিলেন।
ইতালিতে জন্ম নেওয়া সোনিয়া ছিলেন ভারতের সাবেক প্রধানমন্ত্রী রাজীব গান্ধীর স্ত্রী। গান্ধী পরিবার ভারতের রাজনীতির সবচেয়ে প্রভাবশালী পরিবারগুলোর একটি। কিন্তু রাজনীতিতে আসার ব্যাপারে সোনিয়ার আগ্রহ ছিল না।
কংগ্রেসের সভাপতি হওয়ার কয়েক মাস পর সংবাদমাধ্যম ইন্ডিয়া টুডে তাকে দলের নেতাদের কাছেও ‘বেশ রহস্যময়’ বলে বর্ণনা করেছিল। তবে নীরব ও সংযত সোনিয়ার মধ্যে তখনই একজন দক্ষ রাজনীতিকের বৈশিষ্ট্য দেখা যাচ্ছিল। তিনি সবার কথা শুনতেন, তথ্য নিতেন এবং এরপর নিজেই সিদ্ধান্ত নিতেন। শেষ পর্যন্ত তার সিদ্ধান্তই কার্যকর হতো।
প্রায় তিন দশক পর সেই রাজনৈতিক যাত্রায় নিজের গল্প বলেছেন সোনিয়া গান্ধী। ৭৯ বছর বয়সী এই নেত্রীর জীবনে ব্যক্তিগত ক্ষতিও কম হয়নি। ১৯৮৪ সালে শাশুড়ি ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীকে তার দেহরক্ষীরা গুলি করার পর তিনি তাকে হাসপাতালে নিয়ে যান। সাত বছর পর আত্মঘাতী হামলায় নিহত স্বামী রাজীব গান্ধীর মরদেহও তিনি নিজের হাতে বাড়িতে নিয়ে আসেন।
তার আত্মজীবনী ‘বিলংগিং: এ জার্নি অব লাভ’ আগামী নভেম্বরে যুক্তরাষ্ট্রে আলফ্রেড এ নফ এবং যুক্তরাজ্যে উইলিয়াম কলিন্স থেকে প্রকাশিত হওয়ার কথা। বইটি ভারতের রাজনীতিতে সবচেয়ে আলোচিত রাজনৈতিক বইগুলোর একটি হতে পারে।
বইটির প্রকাশক জানিয়েছে, এর শুরু ১৯৬৫ সালের ক্যামব্রিজ থেকে। তখন ১৯ বছর বয়সী ইতালীয় তরুণী সোনিয়া মাইনো ভারতের প্রথম প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরুর নাতি রাজীব গান্ধীর প্রেমে পড়েন ।
প্রকাশকদের ভাষায়, সোনিয়া এই বইয়ে প্রেম, দেশ ছাড়ার অভিজ্ঞতা, রাজনৈতিক ক্ষমতা ও গভীর ব্যক্তিগত শোকের কথা খোলামেলা ও আন্তরিকভাবে তুলে ধরেছেন। ইতালির ছোট শহরে শৈশব থেকে ভারতের রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে পৌঁছানোর গল্পও রয়েছে এতে।
তবে বইটি প্রকাশের আগেই ভারতে বিতর্ক তৈরি হয়েছে।
প্রথমে খবর আসে, পেঙ্গুইন র্যান্ডম হাউস ইন্ডিয়া বইটির কিছু অংশে পরিবর্তন চেয়েছিল। পরে কংগ্রেস নেতারা অভিযোগ করেন, সরকারের সমালোচনামূলক কিছু অংশ বদলানোর জন্য প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানটি রাজনৈতিক চাপের মুখে পড়েছিল।
পেঙ্গুইন অবশ্য এই অভিযোগ অস্বীকার করেছে। প্রতিষ্ঠানটি বলেছে, তারা বইটি প্রকাশ করতে আগ্রহী ছিল এবং সংশ্লিষ্ট আলোচনা চলছিল।
কেন রাজনীতিতে এলেন সোনিয়া
বইটি প্রকাশের পর পাঠকের আগ্রহ শুধু ভারতের সবচেয়ে ক্ষমতাধর রাজনৈতিক পরিবারে একজন বিদেশি তরুণীর বিয়ে নিয়ে থাকবে না। বরং আধুনিক ভারতীয় রাজনীতির কয়েকটি বড় প্রশ্নের উত্তরও খুঁজবেন তারা।
এর মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন—সোনিয়া কেন রাজনীতিতে এলেন?
আর ২০০৪ সালে আট বছর পর কংগ্রেস যখন আবার ক্ষমতায় ফিরল, তখন পর্দার আড়ালে কী ঘটেছিল?
সবচেয়ে বড় রহস্য সম্ভবত অন্যটি। কংগ্রেস ও মিত্রদের পূর্ণ সমর্থন থাকার পরও সোনিয়া কেন প্রধানমন্ত্রী হলেন না? কেন তিনি অর্থনীতিবিদ ও সাবেক অর্থমন্ত্রী মনমোহন সিংকে প্রধানমন্ত্রী বেছে নিয়েছিলেন?
সাংবাদিক ও লেখক নীরজা চৌধুরির মতে, এটিই সম্ভবত সবচেয়ে বড় অমীমাংসিত প্রশ্ন। তার ভাষায়, সোনিয়া চাইলে সহজেই প্রধানমন্ত্রী হতে পারতেন। দল ও মিত্রদের সমর্থন ছিল। এমনকি রাষ্ট্রপতির দপ্তর থেকেও তাকে সরকার গঠনের আমন্ত্রণ জানানো প্রস্তুত ছিল।
সাবেক কংগ্রেস নেতা ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী নটবর সিং তার আত্মজীবনীতে লিখেছেন, সোনিয়ার ছেলে রাহুল গান্ধী মায়ের প্রধানমন্ত্রী হওয়ার তীব্র বিরোধিতা করেছিলেন। তার আশঙ্কা ছিল, দাদি ইন্দিরা গান্ধী ও বাবা রাজীব গান্ধীর মতো তার মায়েরও একই পরিণতি হতে পারে।
রাহুল নাকি মাকে ঠেকাতে ‘যেকোনো পদক্ষেপ’ নেওয়ার কথা বলেছিলেন। সোনিয়ার আত্মজীবনীতে কি সেই ঘটনার নতুন কোনো ব্যাখ্যা পাওয়া যাবে? নাকি তিনি পুরো ঘটনার ভিন্ন কোনো ছবি তুলে ধরবেন?
যাই হোক, প্রধানমন্ত্রী না হওয়ার সেই সিদ্ধান্ত ভারতের রাজনীতির গতিপথ বদলে দেয়।
রাজনীতিতে আসার আগে কী ভাবতেন সোনিয়া?
রাজীব গান্ধীর মৃত্যুর পর ১৯৯১ সালেও সোনিয়া রাজনীতির বাইরে ছিলেন। কিন্তু নব্বইয়ের দশকে কংগ্রেস দুর্বল হতে থাকলে ১৯৯৭ সালে তিনি দলে যোগ দেন। এক বছরেরও কম সময়ের মধ্যে দলের সভাপতি হন।
তখন বিরোধীরা তাকে গুরুত্ব দিতেন না। ১৯৯৮ সালে ইন্ডিয়া টুডে তাকে ‘গৃহবধূ’ এবং ‘ইতালীয় বিস্ময়’ বলে কটাক্ষ করে সংবাদ করেছিল।
কিন্তু কয়েক মাসের মধ্যেই পরিস্থিতি বদলে যায়। একজন কংগ্রেস নেতা স্বীকার করেন, তিনি কখনো ভাবেননি সোনিয়া এমন চমক দেখাতে পারবেন।
তবে, এরমধ্যেও বেশ কয়েকটি সংবাদমাধ্যম তখনই সোনিয়ার রাজনৈতিক দক্ষতা বুঝতে পেরেছিল। ওই সময় একটি পত্রিকা তাকে নিয়ে শিরোনাম করেছিল, ‘মখমলের দস্তানার ভেতরে লোহার মুঠি’। অর্থাৎ বাইরে শান্ত হলেও সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে তিনি ছিলেন কঠোর।
পরিবারের দুই বড় ট্র্যাজেডি
সোনিয়ার রাজনৈতিক জীবনের পেছনে রয়েছে দুটি ভয়াবহ ব্যক্তিগত ঘটনা।
১৯৮৪ সালে ইন্দিরা গান্ধীর হত্যার পর তার পরিবারই বদলে যায়। সাত বছর পর আত্মঘাতী হামলায় রাজীব গান্ধী নিহত হন।
এই দুই মৃত্যু শুধু ভারতীয় রাজনীতির গতিপথ বদলায়নি। সোনিয়ার জীবনও বদলে দেয়।
আত্মজীবনীতে তিনি এসব বছর নিয়ে কী লিখবেন, সেটি এখন বড় প্রশ্ন। স্বামী রাজীবের রাজনীতিতে আসার বিরোধিতা কেন করেছিলেন তিনি? সন্তানদের নিরাপত্তা নিয়ে তার ভয় কতটা ছিল? আর কখন তিনি বুঝেছিলেন, গান্ধী পরিবারের রাজনৈতিক উত্তরাধিকার আর ছেড়ে দেওয়া সম্ভব নয়?
বোফর্স কেলেঙ্কারি নিয়ে কী বলবেন
আত্মজীবনীতে আরও কিছু অস্বস্তিকর প্রশ্নের মুখোমুখি হতে পারেন সোনিয়া।
এর মধ্যে অন্যতম বোফর্স কেলেঙ্কারি। এই ঘটনায় রাজীব গান্ধীর সরকার বড় ধরনের রাজনৈতিক ক্ষতির মুখে পড়ে।
ইতালীয় ব্যবসায়ী অত্তাভিও কোয়াত্রোক্কির সঙ্গে গান্ধী পরিবারের সম্পর্ক নিয়েও দীর্ঘদিন বিতর্ক হয়েছে।
সোনিয়া কি সেই ঘটনা নিয়ে বিস্তারিত লিখবেন? তিনি কী জানতেন, সেটিও কি পরিষ্কার করবেন?
বিদেশি পরিচয় নিয়ে বিতর্ক
সোনিয়ার ইতালীয় পরিচয় নিয়েও দীর্ঘদিন বিতর্ক ছিল। বিরোধীরা বলতেন, বিদেশে জন্ম নেওয়া একজন ব্যক্তি ভারতের নেতৃত্ব দিতে পারেন না।
২০০৪ সালে বিজেপি নেত্রী সুষমা স্বরাজ বলেছিলেন, বিদেশি বংশোদ্ভূত কেউ প্রধানমন্ত্রী হলে তা হবে দেশের জন্য অপমান। সোনিয়া প্রধানমন্ত্রী হলে মাথা ন্যাড়া করে সাদা পোশাক পরে সন্ন্যাসীর জীবনযাপনের কথাও বলেছিলেন তিনি।
সাংবাদিক ও লেখক রশীদ কিদওয়াইয়ের মতে, ১৯৯৯ সালেই কংগ্রেসের কিছু নেতা সোনিয়ার বিদেশি পরিচয় নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিলেন। সোনিয়া কখনো ভারত ছেড়ে যাওয়ার কথা ভেবেছিলেন কি না, সেটিও তিনি জানতে চান।
২০০৪ থেকে ২০১৪: সোনিয়ার আসল ক্ষমতা কতটা ছিল
২০০৪ থেকে ২০১৪ সাল পর্যন্ত কংগ্রেস নেতৃত্বাধীন সরকারও আত্মজীবনীতে গুরুত্বপূর্ণ জায়গা পেতে পারে।
সোনিয়ার নেতৃত্বে কংগ্রেস টানা দুটি জাতীয় নির্বাচনে জয় পায়। তার সময় তথ্যের অধিকার আইন ও গ্রামীণ কর্মসংস্থান নিশ্চয়তা কর্মসূচির মতো গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ নেওয়া হয়।
তবে দ্বিতীয় মেয়াদে সরকার দুর্নীতির অভিযোগ, নীতিগত অচলাবস্থা এবং নেতৃত্ব নিয়ে সমালোচনায় পড়ে।
সমালোচকেরা সোনিয়াকে সরকারের ‘রিমোট কন্ট্রোল’ বলতেন। তাদের প্রশ্ন ছিল, প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিংয়ের ওপর তার আসল ক্ষমতা কতটা ছিল।
অন্যদিকে তার সমর্থকেরা মনে করতেন, কঠিন জোট সরকারকে ধরে রাখার মূল রাজনৈতিক শক্তি ছিলেন সোনিয়াই।
রাহুলকে কেন বেছে নিলেন
২০১৭ সালে সোনিয়া কংগ্রেসের নেতৃত্ব ছেলে রাহুলের হাতে তুলে দেন। কিন্তু রাহুল দলকে আগের অবস্থানে ফিরিয়ে আনতে পারেননি। অনেকের মতে, গান্ধী পরিবারের রাজনৈতিক পতনের গল্পের গুরুত্বপূর্ণ অংশ এটি।
সোনিয়া ১৯৯৪ সালের রাজীব বইয়ে লিখেছিলেন, রাজীবকে রাজনীতিতে আসা থেকে আটকাতে তিনি ‘বাঘের মতো লড়েছিলেন’। অথচ শেষ পর্যন্ত তিনিই সেই রাজনৈতিক উত্তরাধিকার রাহুলের হাতে তুলে দেন।
রাহুলের রাজনৈতিক পথ অবশ্য সহজ ছিল না। একসময় তাকে রাজনীতিতে অনিচ্ছুক নেতা হিসেবে দেখা হতো। বিরোধীরাও তাকে প্রায়ই অনুপস্থিত নেতা বলে কটাক্ষ করতেন।
এখন প্রশ্ন, রাহুলের রাজনৈতিক ধরন ও চিন্তাভাবনাকে সোনিয়া কীভাবে দেখেন? তিনি ছেলের রাজনীতিকে কতটা সমর্থন করেন?
আরেকটি প্রশ্নও রয়েছে। রাহুলের চেয়ে স্বভাবতই বেশি আকর্ষণীয় বলে বিবেচিত প্রিয়াঙ্কাকে কেন পরিবারের রাজনৈতিক উত্তরাধিকারী হিসেবে বেছে নেওয়া হলো না? প্রিয়াঙ্কা কেন এত বছর পর ২০১৯ সালে আনুষ্ঠানিকভাবে নির্বাচনী রাজনীতিতে এলেন?
গান্ধী পরিবারের ভবিষ্যৎ কী
এর চেয়েও বড় প্রশ্ন—সোনিয়া যে ভারতকে গড়ে তুলতে ভূমিকা রেখেছেন, সেই ভারতকে তিনি এখন কীভাবে দেখেন?
তার রাজনৈতিক সময়কালে ভারত জোট সরকার ও অর্থনৈতিক উদারীকরণের যুগ থেকে নরেন্দ্র মোদির বিজেপি এবং হিন্দুত্ববাদী রাজনীতির আধিপত্যের দিকে এগিয়েছে।
তবে আত্মজীবনীতে কী বলা হবে, তার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে—কী বলা হবে না।
নীরজা চৌধুরি মনে করেন, এর উত্তর হয়তো বইটির নামেই রয়েছে—‘বিলংগিং’ বা ‘নিজস্ব অধিকার’।
তার মতে, সোনিয়া সবসময় নিজেকে নেহরু-গান্ধী পরিবারের উত্তরাধিকারী হিসেবে দেখেছেন। সেই উত্তরাধিকার ধরে রাখার দায়িত্বও তিনি নিজের ওপর নিয়েছেন।
এই উত্তরাধিকার এখন বড় চ্যালেঞ্জের মুখে।
ক্ষমতাসীন বিজেপি দীর্ঘদিন ধরে ‘কংগ্রেসমুক্ত ভারত’-এর কথা বলছে। অন্যদিকে সমালোচকেরা কংগ্রেসের বিরুদ্ধে পরিবারতন্ত্রের রাজনীতির অভিযোগ তুলছেন।
কংগ্রেসের একের পর এক নির্বাচনী পরাজয় এবং অনেক নেতার দলত্যাগের পর এখন প্রশ্ন শুধু দলটি ঘুরে দাঁড়াতে পারবে কি না, তা নয়। গান্ধী পরিবার দলটিকে একসঙ্গে ধরে রাখতে পারবে কি না, সেটিও বড় প্রশ্ন।
সোনিয়ার আত্মজীবনী সম্ভবত সেই প্রশ্নেরই কিছু উত্তর খুঁজবে।
সোনিয়ার ভাষায়, তার পরিবার নিয়ে অনেক কিছু লেখা হয়েছে। কিন্তু তাদের কাজ, সিদ্ধান্ত ও ব্যক্তিগত দুর্বলতার আসল কারণ খুব কম লেখাতেই উঠে এসেছে। তার আত্মজীবনী সেই মানবিক দিকটিই সামনে আনার চেষ্টা।
তাই বইটি হয়তো শুধু রাজনৈতিক আত্মজীবনী হবে না। বরং নেহরু-গান্ধী পরিবারের উত্তরাধিকার তার কাছে কী অর্থ বহন করে, কেন তিনি সেই উত্তরাধিকার ধরে রেখেছেন এবং আজও কেন সেটিকে গুরুত্বপূর্ণ মনে করেন—তারই ব্যাখ্যা হয়ে উঠতে পারে।
সূত্র : বিবিসি











