বাজারকে বাজারের মতো কাজ করতে দেওয়া হচ্ছে না : অর্থ উপদেষ্টা

সংগৃহীত ছবি
দেশের বাজারব্যবস্থায় স্বাভাবিকভাবে কাজ করতে দেওয়া হচ্ছে না বলে মন্তব্য করেছেন প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনা উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর। তিনি বলছেন, বাজারভিত্তিক নিয়ন্ত্রক প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে বিভিন্ন পক্ষের যোগসাজশের কারণে বাজারে প্রতিযোগিতা ও স্বাভাবিক মূল্য নির্ধারণের প্রক্রিয়া বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। একই সঙ্গে সংবিধিবদ্ধ তদারকি প্রতিষ্ঠানগুলোর জবাবদিহি নিশ্চিত করা জরুরি।
আজ রবিবার বিকালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) ব্যবসায় শিক্ষা অনুষদে আয়োজিত ‘ফরেনসিক অ্যাকাউন্টিং অ্যান্ড ফ্রড ইনভেস্টিগেশন’ শীর্ষক বইয়ের মোড়ক উন্মোচন অনুষ্ঠানে এসব কথা বলেন তিনি।
অধ্যাপক তিতুমীর বলেছেন, ‘আমাদের বাজার কোনো কাজ করে না। অর্থাৎ এখানে কেউ প্রাইস টেকার নয়, বরং মানুষ প্রাইস মেকার হিসেবে কাজ করছে এবং বাজারভিত্তিক নিয়ন্ত্রকদের দ্বারা পরীক্ষিত হচ্ছে।’
তিনি বলেন, বাজারভিত্তিক নিয়ন্ত্রকরা যদি যথাযথভাবে কাজ করতেন, তাহলে এ ধরনের পরিস্থিতি তৈরি হতো না। রেগুলেটর যদি কাজই করে থাকেন, তাহলে তো পালিয়ে যেতে হবে না। বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরকে পালিয়ে যেতে হয়েছে। এক বাক্যই বলে দেয়, পরিস্থিতি কী ছিল।
দেশের ব্যাংক খাতের অনিয়মের চিত্র তুলে ধরে তিনি বলেন, ২০২৪ সালে ব্যাংক খাতে খেলাপিঋণের পরিমাণ ১১ শতাংশ দেখানো হলেও পরবর্তী সময়ে ফরেনসিক অডিটে তা ৩৫ দশমিক ৭৩ শতাংশে উঠে এসেছে। ২০২৬ সালের মার্চ শেষে তা কমে ৩২ দশমিক ৬ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। তবে এ পরিসংখ্যানও চূড়ান্ত নয় বলে উল্লেখ করেন তিনি।
‘এতদিন ধরে যারা এগুলো দেখাশোনার দায়িত্বে ছিলেন, তারা বলতে পারেন না এই টাকা কোথায় গেছে। রেগুলেটরি ফরবিয়ারেন্সের কারণে প্রায় ২ লাখ ৬২ হাজার ৭৬৬ কোটি টাকার দায় তৈরি হয়েছে,’ উল্লেখ করেন অর্থ ও পরিকল্পনা উপদেষ্টা।
বর্তমান ব্যাংকিং খাতকে সংকট থেকে উদ্ধারে বিপুল অর্থের প্রয়োজন উল্লেখ করে অধ্যাপক তিতুমীর বলেছেন, ব্যাংকগুলোর মূলধন ঘাটতি পূরণ ও খাতটিকে পুনরুদ্ধার করতে প্রায় ৩ লাখ ৩১ হাজার ৭১৫ কোটি টাকা প্রয়োজন হবে। আর্থিক খাতের দুর্নীতির পেছনে একক কোনো পক্ষ নয়, বরং বিভিন্ন পর্যায়ের মানুষের মধ্যে যোগসাজশ বা ‘কলিউশন’ কাজ করছে। জমির মূল্যায়ন, সম্পদের মূল্যায়ন, অডিটসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে এ ধরনের যোগসাজশের অভিযোগ রয়েছে।
অধ্যাপক তিতুমীর বলছেন, ‘তদারককারী প্রতিষ্ঠান হিসেবে যারা সংবিধিবদ্ধ, তারা দুর্নীতিতে লিপ্ত হচ্ছেন। এজন্য দুদক এবং সুশীলসমাজকে এই দুর্নীতি নিয়ে কাজ করতে হবে। প্রথমে আমাদের নিশ্চিত করতে হবে মার্কেট যেন ফাংশন করে।’
পেশাজীবীদের নিয়ন্ত্রণ ও জবাবদিহির জন্য রাষ্ট্র যেসব সংবিধিবদ্ধ প্রতিষ্ঠান তৈরি করেছে, সেগুলোর কার্যকারিতা নিশ্চিত করা প্রয়োজন বলে উল্লেখ করেছেন অর্থ ও পরিকল্পনা উপদেষ্টা।
ফরেনসিক অ্যাকাউন্টিংয়ের গুরুত্ব তুলে ধরে তিনি বলেন, আর্থিক জালিয়াতি শনাক্ত ও তদন্তে ফরেনসিক অডিট গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে কোনো বিরোধ সালিশ বা আরবিট্রেশনে গেলে সঠিক প্রমাণনির্ভর আর্থিক তথ্য প্রয়োজন হয়। তবে প্রাথমিক পর্যায়েই যদি চুক্তি, হিসাব ও মূল্যায়ন প্রক্রিয়ায় কারসাজি থাকে, তাহলে পরবর্তী সময়ে আরবিট্রেশনের মাধ্যমেও কার্যকর প্রতিকার পাওয়া কঠিন হয়ে পড়ে।
অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথির বক্তব্যে দুদকের অনুসন্ধান কমিশনার ড. মো. সাজ্জাদ হোসেন ভূঁইয়া বলেন, বাংলাদেশে ফরেনসিক অ্যাকাউন্ট্যান্টের সংখ্যা খুবই হাতেগোনা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যাকাউন্টিং বিভাগের শিক্ষকদের রচিত বইটি দুদকের কাজে অত্যন্ত সহায়ক হবে বলে তিনি মনে করেন। বইটি দুদকের প্রশিক্ষণ গাইড হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করার উদ্যোগ নেওয়া হবে বলেও জানান তিনি।
অনুষ্ঠানে টিআইবি নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামানও ফরেনসিক অ্যাকাউন্ট্যান্টের ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
অ্যাকাউন্টিং বিভাগের অধ্যাপক ড. রিয়াজুর রহমান চৌধুরী এতে সভাপতিত্ব করেন। অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন বইয়ের লেখক অ্যাকাউন্টিং বিভাগের অধ্যাপক আল-আমিন।
আর্থিক জালিয়াতি, দুর্নীতি, অর্থপাচার, সাইবার প্রতারণা এবং আর্থিক বিবরণীতে কারসাজি শনাক্ত ও তদন্তের বিষয়ে ‘ফরেনসিক অ্যাকাউন্টিং ও ফ্রড ইনভেস্টিগেশন’ বইটি রচিত হয়েছে। বইটির লেখক ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যাকাউন্টিং বিভাগের অধ্যাপক ড. দেওয়ান মাহবুব হোসেন, অধ্যাপক ড. মো. সাইফুল আলম, অধ্যাপক আল-আমিন এবং সহকারী অধ্যাপক রায়হান সোবহান।
পাঞ্জেরী পাবলিকেশন্স থেকে প্রকাশিত হয়েছে বইটি।







