পশুপাখি, পথিক সবার জন্য গাছের ফল

গাছ থেকে ফল পেড়ে খাচ্ছেন শ্রমিকরা
ময়মনসিংহের ফুলবাড়িয়া উপজেলার সন্তোষপুর কান্দুর বাজার থেকে মধুপুর বাগানবাড়ি চৌরাস্তা পর্যন্ত সাত কিলোমিটার সড়কের দুই পাশে সংরক্ষিত বন ও রাবারবাগান। প্রায় এক যুগ আগে সড়কের দুই পাশে চার কিলোমিটার জুড়ে পাঁচ হাজার ফলদগাছের চারা লাগিয়েছিলেন আইয়ুব আলী। বর্তমানে প্রতিটি গাছে মৌসুমি ফল ধরে। পথিক, গ্রামের মানুষ, দর্শনার্থী ও পশুপাখি ইচ্ছামতো এসব গাছের ফল খায়। এতে কোনো বাধা নেই। অনেকে আবার গাছ থেকে ফল পেড়ে বাড়িতেও নিয়ে যান।
ফুলবাড়িয়া উপজেলা সদর থেকে প্রায় ১৮ কিলোমিটার দূরে নাওগাঁও ইউনিয়নের সন্তোষপুর গ্রাম। এই গ্রামের কৃষক আইয়ুব আলী (৫২)। অভাবের সংসারে হাল ধরার কারণে ১৯৯২ সালে এসএসসি পাসের পর আর পড়াশোনা হয়নি; মন দেন কৃষিকাজে। ২০০৯ সালে বাড়ির আঙিনায় ৪০ শতাংশ জমিতে দেশি-বিদেশি ফলগাছের বাগান করেন। কলম করে শুরু করেন চারা বিক্রি। ২০১৩ সালে বাড়ির পাশে দেড় একর জমি ভাড়া নিয়ে গড়ে তোলেন নার্সারি। পাশাপাশি চার একর জমিতে মাল্টা, লিচু, ড্রাগন ও আনারসের বাগান করেন। বাগানের ফল বিক্রি করলেও বাড়ির আঙিনায় গাছের ফল প্রতিবেশীদের দেন।
আইয়ুব আলী জানিয়েছেন, নিজ উদ্যোগ ও অর্থায়নে ২০১৪ সালে সন্তোষপুর কান্দুর বাজার থেকে সন্তোষপুর পশ্চিমপাড়া পর্যন্ত চার কিলোমিটার সড়কের দুই পাশে গাছের চারা লাগানো শুরু করেন। দুই বছরে আম, জাম, কাঁঠাল, বরই, আমড়া, পেয়ারা, জাম্বুরা, চালতা, বেল, করমচা, অড়বরই, বকুল, চাম্বল, মাল্টা, কাঠবাদামসহ বিভিন্ন ফলের পাঁচ হাজার গাছ লাগিয়েছেন। এরপর তিনি নিজে ও শ্রমিক দিয়ে গাছগুলো পরিচর্যা করেন। এখন প্রায় প্রতিটি গাছে ফল ধরে।
সম্প্রতি এক বিকালে সরেজমিনে দেখা যায়, সন্তোষপুর বাজারের পশ্চিম পাশ থেকে সড়কের দুই পাশে পেয়ারা, আমড়া, জাম্বুরা, চালতা, কাঠবাদাম, আম, জাম, কাঁঠাল, বরইসহ বিভিন্ন ফলের গাছ। কাঠবাদাম, পেয়ারা ও আমড়া গাছগুলো ফলে ভরপুর। পথিক ও দর্শনার্থীরা নিজ হাতে গাছ থেকে ফল পেড়ে খাচ্ছেন। পাশের বনের ভেতর থেকে বানরের দল এসে ইচ্ছামতো গাছের ফল খেয়ে আবার বনে চলে যাচ্ছে। টিয়া, বুলবুলিসহ বিভিন্ন পাখিও সমানতালে খাচ্ছে গাছের ফল। এতে কারও কোনো বাধা নেই।
আনারস বাগানে কাজ শেষে পরিশ্রান্ত শ্রমিকরা সড়কের পাশে গাছের ছায়ায় বসে জিরিয়ে নিচ্ছেন। একজন শ্রমিক গাছে উঠে পেয়ারা পেড়ে দিচ্ছেন সবাইকে। পেয়ারা খেয়ে কিছুটা ক্ষুধা নিবারণ করছেন তারা। রাবারবাগান সংলগ্ন সড়কে এক শিশুসহ দুজন নারী গাছের নিচে দাঁড়িয়ে আছেন। তাদের সঙ্গে আসা একজন পুরুষ গাছে উঠে পেয়ারা পেড়ে তাদের দিচ্ছেন, আবার নারীরাও গাছ থেকে ফল পেড়ে খাচ্ছেন।
মুক্তাগাছা উপজেলা থেকে আসা আবু রায়হান নামের এক দর্শনার্থীর ভাষ্য, সড়কের দুই পাশে গাছে গাছে অনেক পেয়ারা ও আমড়া ধরেছে। পাখি ও বানর দলবেঁধে তা খাচ্ছে। পথচারীরাও যে যার মতো ফল পেড়ে খাচ্ছেন, কেউ কেউ নিয়েও যাচ্ছেন। এতে কেউ বাধা দিচ্ছেন না। নিজ হাতে গাছ থেকে ফল পেড়ে খাওয়ার আনন্দ এবং স্বাদ একেবারেই আলাদা। গাছগুলো যিনি লাগিয়েছেন তিনি খুবই ভালো একটি কাজ করেছেন।
নাওগাঁও ইউনিয়নের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান মো. ইউসুব আলী জানিয়েছেন, আইয়ুব আলী সড়কে দুই পাশে ফলের গাছ লাগিয়ে ভালো একটি কাজ করেছেন। এখন গাছের ফল গ্রামের মানুষ, দর্শনার্থী ও বনের পশুপাখি খেতে পারছে।
রাস্তার পাশে ফলগাছ লাগানোর উদ্দেশ্যের কথা বলছিলেন আইয়ুব আলী, ‘পথিক এবং গ্রামের যেসব হতদরিদ্র মানুষ বাজার থেকে ফল কিনে খেতে পারেন না, তারা এসব গাছের ফল খাবেন, পশুপাখি খাবে। চার থেকে পাঁচ বছর ধরে গাছগুলোয় ফল ধরছে। পশুপাখি ও মানুষ রাস্তার পাশের গাছের ফল খাচ্ছে, যা দেখে আমি আনন্দ পাই।’







