সংকট মেটাতে ‘সার কার্ড’

সংগৃহীত ছবি
আমন মৌসুমের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সময়ে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে সারের জন্য কৃষকদের ছোটাছুটি। কোথাও ভোর থেকে ডিলার পয়েন্টে দীর্ঘ সারি, কোথাও নির্ধারিত দামের চেয়ে বস্তাপ্রতি কয়েকশ টাকা বেশি নেওয়ার অভিযোগ, আবার কোথাও বরাদ্দ থাকা সত্ত্বেও সময়মতো সার পাচ্ছেন না কৃষকরা। সরকারের দাবি, দেশে পর্যাপ্ত সার মজুদ রয়েছে; কিন্তু মাঠের চিত্র বলছে ভিন্ন কথা। সংকট ও বাড়তি দামের এই গ্যাঁড়াকলে পড়ে চাহিদামতো সার না পেলে আমনের উৎপাদনে বড় ধরনের নেতিবাচক প্রভাব পড়ার আশঙ্কা করছেন কৃষকরা।
সরকারি নথি অনুযায়ী, আগস্টে সারা দেশে ইউরিয়া সারের বরাদ্দ ছিল ২ লাখ ৭৯ হাজার ৪১২ টন। কিন্তু ২০ আগস্ট পর্যন্ত বিতরণ করা হয়েছে ১ লাখ ৪৯ হাজার ৬১২ টন। ময়মনসিংহ বিভাগের চার জেলায় বরাদ্দ ছিল ৩১ হাজার ৪২৫ টন; একই সময়ে ডিলাররা উত্তোলন করেছেন মাত্র ৯ হাজার ৯৯২ টন। সিলেট বিভাগের চার জেলায় ৯ হাজার ৫৪১ টন বরাদ্দের বিপরীতে উত্তোলন করা হয়েছে ২ হাজার ৬৭৯ টন। সরকারি বরাদ্দ ও মাঠপর্যায়ে সরবরাহের এই ব্যবধানই কৃষকদের উদ্বেগ বাড়িয়েছে। বিভিন্ন জেলায় খোঁজ নিয়ে দেখা গেছে, সমস্যা শুধু সার কম থাকার অভিযোগেই সীমাবদ্ধ নয়। কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি, অবৈধ মজুদ, বরাদ্দের সার সময়মতো না তোলা এবং নির্ধারিত দামের চেয়ে বেশি নেওয়ার অভিযোগও রয়েছে। বগুড়ার শেরপুরে টিএসপি ও ডিএপি সার বস্তাপ্রতি ৪০০-৪৫০ টাকা বেশি নেওয়ার অভিযোগ করেছেন কৃষকরা। তাদের দাবি, নির্ধারিত দামে সার পাওয়া যাচ্ছে না। যদিও স্থানীয় সংসদ সদস্য ও স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলমের দাবি, দেশে সারের কোনো ঘাটতি নেই; কিছু কৃষক আগাম সার কিনতে যাওয়ায় সাময়িক চাপ সৃষ্টি হয়েছে।
নীলফামারীতে ডিলারদের কাছে কৃষক সার না পেলেও বিভিন্ন গুদামে মজুদ থাকা এবং বরাদ্দের সার অন্যত্র সরিয়ে নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। রংপুরের মিঠাপুকুরে আমন মৌসুমে সার নিতে ভোর থেকেই ডিলার পয়েন্টে দীর্ঘ লাইনে দাঁড়াতে হচ্ছে কৃষকদের। তাদের অভিযোগ, কৃত্রিমভাবে সংকট সৃষ্টি করা হচ্ছে। তবে উপজেলা কৃষি বিভাগের দাবি, পর্যাপ্ত মজুদ রয়েছে এবং কৃষকরা চাহিদামতো সার পাবেন।
হবিগঞ্জেও পর্যাপ্ত মজুদ থাকার সরকারি দাবির বিপরীতে কৃষকদের অভিযোগ, নির্ধারিত দামে সার পাওয়া যাচ্ছে না। নাটোরের গুরুদাসপুরসহ জেলার বিভিন্ন উপজেলায় আমন মৌসুমে চাহিদা বাড়লেও প্রয়োজনমতো সার না পাওয়ার অভিযোগ রয়েছে। বৃহত্তর খুলনা অঞ্চলেও একই ধরনের অভিযোগ করেছেন কৃষকরা।
অন্যদিকে, অবৈধ মজুদের অভিযোগে দিনাজপুরে গত ২৭ আগস্ট সদর ও কাহারোল উপজেলায় অভিযান চালিয়ে ৬৬৯ বস্তা সার জব্দ করা হয়। এ ঘটনায় দুই ব্যবসায়ীকে ৩০ হাজার টাকা করে জরিমানা এবং এক মাসের বিনাশ্রম কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে।
এ পরিস্থিতিতে চুয়াডাঙ্গা জেলা কৃষি বিভাগ নিয়েছে ব্যতিক্রমী উদ্যোগ। কৃত্রিম সংকট ও ডিলারদের অনিয়ম ঠেকাতে চালু করা হয়েছে ‘সার কার্ড’। কৃষকের চাষযোগ্য জমির পরিমাণ নির্ধারণ করে ইউনিয়ন পর্যায়ে কৃষি কর্মকর্তাদের মাধ্যমে সার বরাদ্দ ও বিতরণ করা হচ্ছে। সংশ্লিষ্টদের আশা, এতে প্রকৃত কৃষকের হাতে নির্ধারিত পরিমাণ সার পৌঁছানো সহজ হবে।
কৃষি সচিব মো. সেলিম খানের দাবি, দেশে সারের কোনো সংকট নেই। কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি, অবৈধ মজুদ কিংবা অতিরিক্ত দামে সার বিক্রির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
তবে মাঠের কৃষক ও ব্যবসায়ীদের উদ্বেগ কাটছে না। রংপুরের এক ব্যবসায়ী নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেছেন, সরকার ১৫ সেপ্টেম্বরের মধ্যে অক্টোবর ও নভেম্বরের চাহিদা অনুযায়ী সার জেলায় পৌঁছে দেওয়ার কথা জানিয়েছে; কিন্তু বাস্তবে সেই সরবরাহ এখনো পৌঁছেনি।







