ভারত কেন ক্ষেপণাস্ত্রের গোপনীয় তথ্য বেসরকারি কোম্পানিকে দিচ্ছে

ভারতের নয়াদিল্লিতে প্রজাতন্ত্র দিবসের কুচকাওয়াজে প্রদর্শিত ব্রহ্মোস ক্ষেপণাস্ত্র দেখছেন দর্শনার্থীরা। ফাইল ছবি / রয়টার্স
ভারত মিসাইল বা ক্ষেপণাস্ত্র তৈরির মতো স্পর্শকাতর ও জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ প্রতিরক্ষা খাত বেসরকারি কোম্পানির জন্য আরও উন্মুক্ত করার বড় সিদ্ধান্ত নিয়েছে। দেশটির প্রতিরক্ষামন্ত্রী রাজনাথ সিং রাষ্ট্রীয় প্রতিরক্ষা গবেষণা ও উন্নয়ন সংস্থার (ডিআরডিও) তৈরি সব প্রচলিত ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থার প্রযুক্তি ভারতীয় শিল্পপ্রতিষ্ঠানের কাছে হস্তান্তরের অনুমোদন দিয়েছেন।
এর ফলে এতদিন সরকারের নিয়ন্ত্রণে থাকা এই খাতে বেসরকারি কোম্পানিগুলোও ক্ষেপণাস্ত্র উৎপাদনের সুযোগ পাবে। তবে তাদের কারিগরি যোগ্যতা, সনদ ও অন্যান্য সরকারি শর্ত পূরণ করতে হবে।
বিজেপির নেতৃত্বাধীন সরকার জানিয়েছে, এর লক্ষ্য ক্ষেপণাস্ত্রের গবেষণার মাধ্যমে উন্নয়নের পর দ্রুত উৎপাদনে যাওয়া। একই সঙ্গে দেশে ক্ষেপণাস্ত্রের উৎপাদন বাড়ানো এবং বিদেশ থেকে অস্ত্র কেনার ওপর নির্ভরতা কমানো।
তবে এই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে কয়েকটি প্রশ্ন উঠেছে, ভারতের বেসরকারি কোম্পানিগুলো কি বড় পরিসরে জটিল এসব ক্ষেপণাস্ত্র তৈরি করতে পারবে? নাকি ভারত নিজস্ব সামরিক উৎপাদনের শিল্পভিত্তি গড়ে তুলতে চাইছে? আর এ স্পর্শকাতর প্রযুক্তি বেসরকারি খাতে দেওয়ায় নিরাপত্তা ঝুঁকি কতটা?
কী ঘোষণা দিয়েছে সরকার
ভারতের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, ডিআরডিও-এর তৈরি সব প্রচলিত ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থার প্রযুক্তি দেশীয় প্রতিরক্ষা কোম্পানিগুলোর কাছে উৎপাদনের জন্য হস্তান্তর করা হবে।
এর আওতায় আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা, আকাশ থেকে আকাশে নিক্ষেপযোগ্য ক্ষেপণাস্ত্র, রাডারবিরোধী ক্ষেপণাস্ত্র, ট্যাংকবিধ্বংসী ব্যবস্থা এবং স্থল লক্ষ্যবস্তুতে হামলার ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্রও থাকবে।
বেঙ্গালুরুর তাক্ষশীলা ইনস্টিটিউশনের গবেষক আদিত্য রামানাথন বলেছেন, এই সিদ্ধান্তে বেসরকারি কোম্পানিগুলো শুধু ক্ষেপণাস্ত্রের যন্ত্রাংশ তৈরি করবে না। তারা পুরো ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থা তৈরির দায়িত্বও পেতে পারে।
কেন এমন সিদ্ধান্ত
ভারত এতদিন ডিআরডিও-এর তৈরি অস্ত্র বড় পরিসরে উৎপাদনের জন্য মূলত রাষ্ট্রীয় কোম্পানির ওপর নির্ভর করেছে। ক্ষেপণাস্ত্র উৎপাদনে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান ভারত ডায়নামিকস দীর্ঘদিনের এ খাতে একচেটিয়া অবস্থানে ছিল।
নতুন সিদ্ধান্ত সেই ব্যবস্থায় বড় পরিবর্তন আনবে। বেসরকারি কোম্পানিগুলো এতদিন ক্ষেপণাস্ত্রের বিভিন্ন যন্ত্রাংশ তৈরি করলেও এখন তারা পুরো ব্যবস্থা তৈরির সুযোগ পাবে।
ভারত এখনো রাশিয়া ও ইসরায়েলসহ কয়েকটি দেশের কাছ থেকে ক্ষেপণাস্ত্র আমদানি করে। তবে দেশটির প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সরকার প্রতিরক্ষা খাতে আত্মনির্ভরতা বাড়াতে চাইছে। একই সঙ্গে বিদেশি অস্ত্র নির্মাতাদেরও ভারতে উৎপাদনে উৎসাহ দেওয়া হচ্ছে।
পাকিস্তানের সঙ্গে গত বছরের কয়েকটি খণ্ড যুদ্ধও এই সিদ্ধান্তে প্রভাব ফেলেছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। এছাড়া ইউক্রেন যুদ্ধ, হামাস-ইসরায়েল সংঘর্ষ, যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সংঘাত এ ক্ষেত্রে দিল্লিকে অস্ত্রের মজুত ও দ্রুত উৎপাদনের প্রয়োজনীয়তা বুঝিয়েছে বলে মনে করছেন তারা।
আদিত্য রামানাথনের মনে করেন, দীর্ঘ সময়ের যুদ্ধে ক্ষেপণাস্ত্রের মজুত দ্রুত শেষ হয়ে যেতে পারে। তাই বড় ধরনের মজুত গড়ে তুলতে বেসরকারি খাতের অংশগ্রহণ প্রয়োজন।
এদিক থেকে চীনের সঙ্গে নেতিবাচক সম্পর্কও ভারতের মাথাব্যাথার কারণ। বেইজিংকে ঠেকাতে ভারত এমন সক্ষমতা গড়ে তুলতে চাইছে, যাতে দীর্ঘ সময়ের যুদ্ধে বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতি হলেও দেশটি লড়াই চালিয়ে যেতে পারে।
ভারতের বেসরকারি খাত এখন প্রতিরক্ষা শিল্পের তৈরি করছে?
ভারতের প্রতিরক্ষা শিল্প সংশ্লিষ্ট খাত গত কয়েক বছরে দ্রুত বড় হয়েছে। ড্রোন, গোলাবারুদ, মহাকাশ প্রযুক্তি ও সামরিক ইলেকট্রনিকস তৈরিতে বড় কোম্পানিগুলো বিনিয়োগ করছে।
জুনে ভারত দেশীয় কোম্পানির কাছ থেকে ২০০ কোটি ডলারের বেশি মূল্যের সামরিক ড্রোন কেনার পরিকল্পনা করে। এই খাতে আদানি, লারসেন অ্যান্ড টুব্রো, টাটা অ্যাডভান্সড সিস্টেমসসহ ৬০০টির বেশি কোম্পানি যুক্ত রয়েছে।
নৌবাহিনীকেও দ্রুত আধুনিক করার চেষ্টা করছে ভারত। গত ডিসেম্বরে অন্তত ৭৫টি যুদ্ধজাহাজ ও সাবমেরিন কেনার পরিকল্পনা ঘোষণা করা হয়। এর বেশিরভাগই দেশে তৈরি করার কথা।
একই সঙ্গে রাশিয়ার ওপর দীর্ঘদিনের অস্ত্রনির্ভরতা কমিয়ে যুক্তরাষ্ট্র, ফ্রান্স ও ইসরায়েলের সঙ্গে প্রতিরক্ষা সম্পর্ক বাড়াচ্ছে ভারত।
বেসরকারি কোম্পানিগুলো কি ক্ষেপণাস্ত্র তৈরি করতে পারবে
বেসরকারি কোম্পানিগুলো ইতিমধ্যে প্রতিরক্ষা উৎপাদনে বড় বিনিয়োগ করছে। ক্ষেপণাস্ত্র তৈরির জন্যও নতুন কারখানা গড়ে তোলা হচ্ছে।
শিল্পপতি গৌতম আদানির মালিকানাধীন আদানি ডিফেন্স অ্যান্ড অ্যারোস্পেস ২০২৪ সালে উত্তরপ্রদেশে গোলাবারুদ ও ক্ষেপণাস্ত্র তৈরির কারখানায় ৩০০ কোটি রুপির বেশি বিনিয়োগের পরিকল্পনার কথা জানিয়েছে।
তবে শুধু বিনিয়োগ করলেই ক্ষেপণাস্ত্র তৈরি করা যায় না। এই প্রযুক্তি অত্যন্ত জটিল এবং ব্যয়বহুল।
রামানাথনের মতে, সরকারের কাছ থেকে বড় অর্ডার পাওয়া সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। বড় অর্ডার না পেলে কোম্পানিগুলোর বিশাল বিনিয়োগের খরচ উঠে আসবে না। গবেষণা ও উন্নয়নে আবার বিনিয়োগ করাও কঠিন হবে।
ভারতের হাতে কী ধরনের ক্ষেপণাস্ত্র আছে
ভারতের হাতে বিভিন্ন ধরনের ক্রুজ ও ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র রয়েছে। কয়েকটি ক্ষেপণাস্ত্র পারমাণবিক অস্ত্র বহনেও সক্ষম।
এর মধ্যে অগ্নি-৫ ভারতের সবচেয়ে উন্নত পারমাণবিক অস্ত্র বহনে সক্ষম আন্তমহাদেশীয় ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রগুলোর একটি। এর পাল্লা প্রায় ৫ হাজার ৫০০ কিলোমিটার।
ভারতের অন্য ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রগুলোর মধ্যে পৃথ্বী-১-এর পাল্লা প্রায় ১৫০ কিলোমিটার। অগ্নি-৪-এর পাল্লা প্রায় ৪ হাজার কিলোমিটার।
এ ছাড়া রাশিয়ার সঙ্গে যৌথভাবে তৈরি ব্রহ্মোস ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্রের পাল্লা ৫০০ কিলোমিটার পর্যন্ত। গত বছরের ভারত-পাকিস্তান সংঘাতেও এটি ব্যবহার করা হয়।
ভারত কি ক্ষেপণাস্ত্র রপ্তানি করছে
ভারত সাম্প্রতিক বছরগুলোতে প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম রপ্তানি বাড়িয়েছে। ২০১৪-১৫ অর্থবছরে ভারতের প্রতিরক্ষা রপ্তানি ছিল মাত্র ৭ কোটি ২০ লাখ ডলার। ২০২৫-২৬ সালে তা বেড়ে প্রায় ৪০০ কোটি ডলারে পৌঁছেছে।
ভারতীয় কোম্পানিগুলো এখন শুধু যন্ত্রাংশ নয়, সম্পূর্ণ ক্ষেপণাস্ত্রও রপ্তানি করছে। ২০২২ সালে ফিলিপাইন ব্রহ্মোস ক্ষেপণাস্ত্রের তিনটি ব্যবস্থা কেনে। পরে ভিয়েতনাম ও ইন্দোনেশিয়াও এই ক্ষেপণাস্ত্র কেনার চুক্তি করেছে।
ইসরায়েলি অস্ত্র নির্মাতা এলবিট সিস্টেমসের সঙ্গে যৌথভাবে ভারত বড় আকারের হার্মিস-৯০০ ড্রোনও তৈরি করছে।
ভারত কি সামরিক খাতে শিল্পভিত্তি গড়ে তুলতে চাইছে
এটাই আপাতত দিল্লির অন্যতম প্রধান লক্ষ্য বলে ধারণা করা হচ্ছে।
এর আগে ভারত বেসরকারি কোম্পানিগুলোকে পরবর্তী প্রজন্মের যুদ্ধবিমান তৈরির কাজেও বাছাই করেছে। টাটা অ্যাডভান্সড সিস্টেমস ও ভারত ফোর্জের মতো কোম্পানি এখন কামান, গোলাবারুদ ও মহাকাশ প্রযুক্তি তৈরিতে বড় ভূমিকা রাখছে।
তবে বিশেষজ্ঞ রামানাথনের মতে, ভারত প্রতিরক্ষা শিল্পের ভিত্তি বড় করতে চাইলেও যুক্তরাষ্ট্রের মতো পূর্ণাঙ্গ সামরিক-শিল্পভিত্তি গড়ে তুলতে এখনো অনেক দূরে রয়েছে। কারণ ভারতের প্রতিরক্ষা খাতে সরকারের নিয়ন্ত্রণ এখনো অনেক বেশি।
এরপরও ভারত কেন অস্ত্র আমদানি করে
দেশে প্রতিরক্ষা উৎপাদন ও রপ্তানি বাড়লেও ভারত এখনো বিশ্বের অন্যতম বড় অস্ত্র আমদানিকারক।
স্টকহোম ইন্টারন্যাশনাল পিস রিসার্চ ইনস্টিটিউটের হিসাবে, ২০২১ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত ভারত ছিল বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম অস্ত্র আমদানিকারক। এ সময়ে ভারতের আমদানি করা অস্ত্রের ৪০ শতাংশ এসেছে রাশিয়া থেকে।
বেসরকারি খাতে প্রযুক্তি দেওয়ার ঝুঁকি কী
সবচেয়ে বড় দুশ্চিন্তা হলো স্পর্শকাতর সামরিক প্রযুক্তি ফাঁস হওয়ার ঝুঁকি।
এ বছর যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানে হামলা চালানোর সময় ইরানি হ্যাকারদের একটি দল যুক্তরাষ্ট্রের বড় অস্ত্র নির্মাতা লকহিড মার্টিনের সার্ভারে ঢোকার দাবি করে। এতে এফ-৩৫ যুদ্ধবিমানের কিছু যন্ত্রাংশের নকশা চুরি হয়েছে বলেও দাবি করা হয়।
এ ধরনের ঘটনা দেখিয়েছে, বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের হাতে গুরুত্বপূর্ণ সামরিক তথ্য থাকলে সাইবার হামলা বা তথ্য ফাঁসের ঝুঁকি থাকে।
তবে রামানাথনের মতে, ভারতে যেসব কোম্পানি ক্ষেপণাস্ত্র তৈরির চুক্তি পেতে পারে, তারা প্রতিরক্ষা খাতে দীর্ঘদিন ধরে কাজ করছে। গোপনীয় তথ্য সুরক্ষার অভিজ্ঞতাও তাদের রয়েছে।
ভারত সরকারও চায় না ক্ষেপণাস্ত্রের প্রযুক্তি শত্রু দেশের হাতে চলে যাক। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক ক্ষেপণাস্ত্র প্রযুক্তি নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার নিয়মও মেনে চলতে হবে।
তাই বেসরকারি খাতে প্রযুক্তি হস্তান্তরের পাশাপাশি এর নিরাপত্তা নিশ্চিত করাও ভারতের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ।
সূত্র : আলজাজিরা







