বদলে যাওয়ার গল্প, বদলে দেওয়ার প্রত্যয়

মাদক নিয়ে সচেতনতা তৈরিতে সিলেটের কিন ব্রিজের পাশে কয়েকজনের সঙ্গে কথা বলছেন ইমতিয়াজ রহমান ইনু - আগামীর সময়
একসময় বাবার চিকিৎসার জন্য হাতে দেওয়া ওষুধের টাকা দিয়ে নেশা করেছিলেন ইমতিয়াজ রহমান ইনু। সে ঘটনা আজও তাকে কাঁদায়। হেরোইনের নেশায় পরিবার-স্বজনের আস্থা হারিয়ে একসময় সমাজ থেকেও বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছিলেন। অথচ সেই মানুষটিই এখন মাদকাসক্ত তরুণদের স্বাভাবিক জীবনে ফেরার পথ দেখান। সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের হাতে তুলে দেন বই-খাতা, শেখান অক্ষর।
সিলেট নগরীর কুশিঘাট এলাকার ৪২ বছর বয়সী ইনুর জীবনে মাদকের ছোবল আসে ২০০০ সালের দিকে। নানা প্রতিকূলতা ও মানসিক অস্থিরতার মধ্যে প্রথমে সিগারেট, পরে গাঁজা এবং একপর্যায়ে হেরোইনে আসক্ত হন। নেশার টাকা জোগাড় করতে গিয়ে জড়িয়ে পড়েন অপরাধে। হারাতে থাকেন পরিবারের বিশ্বাসও।
একদিন বিকালে সিলেট রেলস্টেশনে নেশাগ্রস্ত অবস্থায় পড়ে থাকা ইনুর সঙ্গে কয়েকজন এনজিওকর্মীর দেখা হয়। তাদের পরামর্শ ও সহযোগিতায় রাজশাহীর একটি মাদক নিরাময় কেন্দ্রে ভর্তি হন তিনি। চিকিৎসা শেষে ফিরে আসেন স্বাভাবিক জীবনে।
এরপর বদলে যায় তার জীবনদৃষ্টি। নিজের অন্ধকার অভিজ্ঞতাকে শক্তিতে পরিণত করে মাত্র ২৫ বছর বয়সে শুরু করেন মাদকবিরোধী সচেতনতামূলক কাজ। তার ভাষায়, ‘যে অন্ধকারে ছিলাম, সেখানে আর কাউকে যেতে দিতে চাই না।’ সিলেটের বিভিন্ন মাদকপ্রবণ এলাকায় গিয়ে মাদকাসক্ত তরুণদের সঙ্গে কথা বলেন ইনু। কিন ব্রিজের নিচে, রেলস্টেশন কিংবা হাসপাতালসংলগ্ন এলাকায় নেশাগ্রস্ত কাউকে দেখলেই শুরু করেন সচেতনতার পাঠ। নিজের জীবনের গল্প বলেন, মাদকের ভয়াবহতা বোঝান এবং নেশা ছেড়ে স্বাভাবিক জীবনে ফেরার উৎসাহ দেন।
ইনু মনে করেন, একজন মাদকাসক্ত ব্যক্তিকে শুধু ঘৃণা বা তিরস্কার করে পরিবর্তন করা যায় না। প্রয়োজন ভালোবাসা, কাউন্সেলিং, চিকিৎসা, পুনর্বাসন ও কর্মসংস্থানের সুযোগ।
মাদকবিরোধী কাজের পাশাপাশি শিক্ষাবঞ্চিত শিশুদের নিয়েও কাজ করছেন ইনু। নিজের বাড়ির আঙিনায় গড়ে তুলেছেন ‘ইনুর পাঠশালা’। বিকাল হলেই বই-খাতা হাতে ছোট শিশুরা ছুটে আসে সেখানে। কাঠের স্ট্যান্ডে রাখা ব্ল্যাকবোর্ডের সামনে দাঁড়িয়ে ইনু শেখান অক্ষরজ্ঞান, ছড়া, কবিতা ও প্রাথমিক বিভিন্ন বিষয়। পরে তার এই উদ্যোগের পাশে দাঁড়ায় সিলেট সিটি করপোরেশন।
তবে তার লক্ষ্য শুধু পড়ানো নয়; শিশুদের বিদ্যালয়ে ফিরিয়ে নেওয়াও। আর্থিক সংকটে সন্তানদের স্কুলে পাঠাতে না পারা অভিভাবকদের সঙ্গে কথা বলে শিক্ষার গুরুত্ব বোঝান ইনু। তার উদ্যোগে অনেক শিশু প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার সুযোগ পেয়েছে।
সামাজিক সচেতনতায় ইনুর আরও একটি ব্যতিক্রমী উদ্যোগ রয়েছে। কাগজ, আঠা ও রঙ দিয়ে আহসান মঞ্জিল, কিন ব্রিজসহ বিভিন্ন ঐতিহাসিক স্থাপনার ক্ষুদ্র প্রতিকৃতি তৈরি করেছেন তিনি। এসব শিল্পকর্মের সঙ্গে যুক্ত করেছেন মাদক, এইচআইভি, নারী নির্যাতন, পরিবার পরিকল্পনাসহ বিভিন্ন সচেতনতামূলক বার্তা। বিভিন্ন সময়ে তার তৈরি শিল্পকর্ম প্রদর্শিত হয়েছে রাজধানীতেও।
মাদকাসক্তদের সচেতন করা, মাদক থেকে তরুণদের ফিরিয়ে আনা এবং সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের পড়ানোর কাজ করে আসছেন ইনু। তিনি মাদকাসক্ত ও মাদকের ঝুঁকিতে থাকা তরুণদের সঙ্গে কথা বলছেন। নিজের জীবনের অন্ধকার অধ্যায় তুলে ধরে তাদের বোঝাচ্ছেন— নেশা থেকে বেরিয়ে আসা সম্ভব। এখন তার স্বপ্ন ‘ইনুর পাঠশালা’কে একটি স্থায়ী শিক্ষাকেন্দ্রে পরিণত করা এবং মাদকাসক্তদের বিনামূল্যে চিকিৎসা ও পুনর্বাসনের সুযোগ তৈরি করা।
নিজের অতীতের কথা স্মরণ করে ইনু বললেন, ‘আমার মতো আর কেউ যেন হারিয়ে না যায়।’
একসময় যে মানুষটি মাদকে মত্ত ছিলেন, আজ তিনিই অন্যের হাতে তুলে দিতে চান বই-খাতা। তাই অন্ধকার থেকে আলোয় ফিরে আসা ইনুর লড়াই শুধুই তার বদলে যাওয়ার গল্প নয়; অন্যের জীবন বদলে দেওয়ারও এক নীরব প্রত্যয়।







