বনজীবীদের মনে ভয়, কাঁধে ঋণ

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
তিন মাসের নিষেধাজ্ঞা শেষে ১ সেপ্টেম্বর খুলছে সুন্দরবন। তাই নৌকা মেরামত, জাল সেলাই আর নতুন করে বনে যাওয়ার প্রস্তুতিতে ব্যস্ত সাতক্ষীরার শ্যামনগর উপজেলার সুন্দরবননির্ভর জেলে-বাওয়ালিরা। দীর্ঘ সময় বেকার থাকায় সংসার চালাতে করতে হয়েছে ঋণ। সেই ঋণ শোধ করার স্বপ্ন বনজীবীদের চোখে। তবে সেই স্বপ্নের পাশে আছে বনদস্যুদের চাঁদাবাজির ভয়। বনে গিয়ে কষ্ট করে মাছ-কাঁকড়া ধরার পর সেই আয় শেষ পর্যন্ত ঋণ শোধে লাগবে, নাকি চাঁদা দিতেই চলে যাবে— এই অনিশ্চয়তা নিয়েই সুন্দরবন খোলার অপেক্ষায় রয়েছেন তারা।
চুনকুড়ি নদীর পাড়ে নৌকার গায়ে আলকাতরা লাগাচ্ছিলেন ইসরাফিল মোল্লা (৫৫)। ঘামে ভেজা শরীর। একটু দূরে নৌকার কাঠে হাতুড়ির টুংটাং শব্দ। কেউ পাটাতন মেরামত করছেন, কেউ পুরনো জাল সেলাই করছেন। তিন মাস ধরে পড়ে থাকা নৌকা আবার চলার প্রস্তুতি নিচ্ছে। টানা তিন মাস বন্ধ থাকার পর বনে যাওয়ার সুযোগ সামনে আসতেই শ্যামনগরের সুন্দরবন-সংলগ্ন বিভিন্ন নদী-খালপাড়ে বেড়েছে ব্যস্ততা।
মুন্সীগঞ্জের হরিনগর গ্রামের জেলে ইসরাফিল মোল্লার ভাষায়, ‘তিন মাস ঘরে বসে থাকতে হয়েছে। সংসার চালানোর জন্য ধার করতে হয়েছে। এখন আবার সেই টাকা দিয়ে নৌকা আর জাল ঠিক করছি। বনে যাব, মাছ-কাঁকড়া ধরব। ধারদেনা শোধ করব। ছেলেমেয়েদের কিছু শখ-আহ্লাদও পূরণ করব।’
ইসরাফিলের এ কথাতেই যেন সুন্দরবন-সংলগ্ন জেলে-বাওয়ালিদের বর্তমান জীবনের টানাপড়েন ফুটে ওঠে। একদিকে তিন মাসের আয়হীনতার পর জমে থাকা ঋণ, অন্যদিকে বনে গিয়ে নিরাপদে জীবিকা নির্বাহ করতে পারার অনিশ্চয়তা।
বুড়িগোয়ালিনীর দাঁতিনাখালী গ্রামের জেলে বাশার গাজীর অবস্থাও প্রায় একই রকম। তিন মাস সংসার চালাতে গিয়ে মহাজনের কাছ থেকে তার প্রায় ৫০ হাজার টাকা ঋণ হয়েছে। এখন সুন্দরবন খুললে মাছ-কাঁকড়া ধরে সেই ঋণ শোধ করার আশা করছেন তিনি। কিন্তু তার প্রশ্ন, ‘কামাই করে আগে ঋণ শোধ করব। কিন্তু বনদস্যুদের চাঁদা দিতে হলে ঋণ শোধ হবে কীভাবে?
প্রতি বছর মাছের প্রজনন মৌসুম ও সুন্দরবনের জীববৈচিত্র্য রক্ষায় জুন, জুলাই ও আগস্ট— এই তিন মাস সুন্দরবনে প্রবেশ এবং মাছ-কাঁকড়া আহরণ বন্ধ থাকে। এ সময় সুন্দরবননির্ভর হাজারো মানুষ কার্যত কর্মহীন হয়ে পড়েন। টানা তিন মাসের সেই অপেক্ষার পর আবার খুলছে বনের দুয়ার।
শুধু জেলে নন, সুন্দরবনকে কেন্দ্র করে যাদের অন্য ধরনের জীবিকা রয়েছে, তারাও তিন মাসের ধাক্কা সামলানোর চেষ্টা করছেন। মুন্সীগঞ্জ এলাকার পর্যটকবাহী ট্রলারের মালিক নূর ইসলাম বললেন, ‘তিন মাস ট্রলার বসে থাকায় লোনাপানিতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বিভিন্ন অংশ। মেরামতের জন্য নিতে হয়েছে ঋণ। বন খুললে যে টাকা আয় হবে, তা দিয়ে আগে সমিতির ঋণ শোধ করতে হবে। তারপর সংসার চালাতে হবে।’
বন বিভাগের তথ্য বলছে, ৬ হাজার ১৭ বর্গকিলোমিটার আয়তনের সুন্দরবনের বাংলাদেশ অংশে জলভাগের পরিমাণ ১ হাজার ৮৭৪ দশমিক ১ বর্গকিলোমিটার। সুন্দরবনের জলভাগে রয়েছে বিপুল মৎস্যসম্পদ। প্রজনন মৌসুমে এসব নদী-খালের বেশির ভাগ মাছ ডিম ছাড়ে। এ কারণেই গত ১ জুন থেকে তিন মাসের জন্য জেলে ও পর্যটকদের সুন্দরবনে প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়েছিল।
পশ্চিম সুন্দরবনের সাতক্ষীরা রেঞ্জের সহকারী বন সংরক্ষক মো. মশিউর রহমানের ভাষ্য, ‘সুন্দরবন শুধু জীববৈচিত্র্যের আধার নয়, এটি মৎস্যসম্পদেরও গুরুত্বপূর্ণ উৎস। ১ সেপ্টেম্বর থেকে জেলে ও পর্যটকদের সুন্দরবনে প্রবেশের অনুমতি দেওয়া হবে। এজন্য সংশ্লিষ্ট ফরেস্ট স্টেশনগুলোকে দেওয়া হয়েছে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা।’









