নেপাল-তিব্বতের বন্যার ছবি চীনে দেখানো হচ্ছে না কেন

তিব্বতের গিরং বন্দর দিয়ে ভয়াবহ বেগে ছুটে আসছে পানির স্রোত। ছবি : রয়টার্স
নেপাল ও তিব্বতে বুধবারের হিমবাহধস থেকে হওয়া বন্যায় এখন পর্যন্ত মারা গেছেন কমপক্ষে ৬৩৩ জন। নিখোঁজ আছেন অন্তত দুই হাজারের বেশি।
সিসিটিভি ক্যামেরায় ভূমিধস ও বন্যার অনেক দৃশ্যই ধরা পড়েছে। সেগুলো দ্রুত সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ছে। ভাইরাল এসব ভিডিও বিশ্বের বিভিন্ন দেশের মানুষও দেখছেন।
এর মধ্যে একটি তিব্বতের। যেখানে দেখা যাচ্ছে, গিরংবন্দর দিয়ে ভয়াবহ বেগে ছুটে আসছে পানির স্রোত। পথে যা পাচ্ছে, সব ভাসিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। প্রাণ বাঁচাতে দৌড়াচ্ছেন শত শত মানুষ। সীমান্তের নিরাপত্তাকর্মীরাও ছুটছেন নিরাপদ জায়গায়।
কিন্তু চীনে এটির মতো বেশিরভাগ ভিডিও প্রায় দেখাই যাচ্ছে না।
চীনের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম এখন পর্যন্ত শুধু একটি স্থিরচিত্র দেখিয়েছে। ভয়াবহ বন্যার ভিডিও খুঁজে পাওয়াও দেশটির কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রিত ইন্টারনেটে কঠিন।
এমনকি বন্যায় শত শত মানুষের মৃত্যু এবং নিখোঁজ হওয়ার খবর নিয়ে সাধারণ মানুষের পোস্টও খুব কম দেখা যাচ্ছে।
চীন অবশ্য বড় ধরনের উদ্ধার অভিযান চালাচ্ছে। শত শত উদ্ধারকর্মী সেখানে কাজ করছেন। প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং কর্মকর্তাদের সঙ্গে জরুরি বৈঠকও করেছেন।
তবে চীনের ইন্টারনেটে যা দেখা যাচ্ছে, বিশ্বের অন্য অংশে ছড়িয়ে পড়া ছবির সঙ্গে তার বড় পার্থক্য রয়েছে। তিব্বতের বন্যা যেন চীনের কঠোর ইন্টারনেট নিয়ন্ত্রণের বিষয়টিই আরও স্পষ্ট করে তুলেছে।
১৯৫০-এর দশকে চীন তিব্বতের নিয়ন্ত্রণ নেয়। এরপর অঞ্চলটিতে চীনা কমিউনিস্ট পার্টির শাসনের বিরুদ্ধে বিভিন্ন সময়ে বিক্ষোভ হয়েছে। এসব বিক্ষোভ কঠোরভাবে দমন করা হয়েছে। তিব্বতে মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগও রয়েছে চীনের বিরুদ্ধে।
এই ইতিহাসের কারণে ‘তিব্বত’ নামটিও চীনের সেন্সরশিপের আওতায় থাকে। এমন পরিস্থিতিতে বড় কোনো দুর্যোগ হলে বিষয়টি আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
চীনের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যমে অবশ্য প্রতিদিন নিহত ও নিখোঁজদের সংখ্যা এবং উদ্ধার তৎপরতার খবর দেওয়া হচ্ছে। বন্যায় তৈরি একটি জলাধার উপচে পড়ার ঝুঁকির কথাও জানানো হচ্ছে।
শনিবার রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যমে নতুন কিছু ভিডিও প্রকাশ করা হয়। সেখানে কাদা ও পাথরে ঢেকে যাওয়া এলাকায় উদ্ধারকর্মীদের আটকে পড়া মানুষদের খুঁজতে দেখা যায়।
কিন্তু এর বাইরে তথ্য খুবই কম। তিব্বতের বেঁচে যাওয়া মানুষের বক্তব্য নেই। ভয়াবহ বন্যার মুহূর্ত বা পরের পরিস্থিতির সাধারণ মানুষের ধারণ করা ভিডিও প্রায় নেই।
নিখোঁজদের স্বজনদের কাছ থেকেও তেমন কোনো খবর পাওয়া যাচ্ছে না। স্বাভাবিক সময়েও তিব্বতের মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ করা কঠিন।
বিদেশি সাংবাদিকদেরও সরকারি অনুমতি ছাড়া তিব্বতে যাওয়ার সুযোগ নেই। ফলে এমন বড় দুর্যোগের পর খুব অল্প সময়ের মধ্যে যতটা সম্ভব তথ্য সংগ্রহ করতে হয়। এরপর অনেক ভিডিও সরিয়ে ফেলা হয় এবং অনেকের বক্তব্যও আর দেখা যায় না।
ফলে তিব্বতের পরিস্থিতি জানতে মূলত চীনের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যমের ওপরই নির্ভর করতে হচ্ছে। সেখানে জোর দেওয়া হচ্ছে উদ্ধার অভিযানের নাটকীয় দৃশ্যের ওপর।
পাহাড় ও খাড়া পাথরের দেয়াল বেয়ে উঠছেন উদ্ধারকর্মীরা। উত্তাল নদী পেরিয়েও তারা দুর্গত এলাকায় পৌঁছানোর চেষ্টা করছেন। তবে এরপর কী হয়েছে বা কতজনকে উদ্ধার করা গেছে, সে বিষয়ে খুব কম তথ্যই পাওয়া যাচ্ছে।
এর অর্থ অবশ্য এই নয় যে বেইজিং বিষয়টি নিয়ে উদ্বিগ্ন নয়, বরং চীন পরিস্থিতি নিয়ে যথেষ্ট উদ্বিগ্ন।
চীনের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ নেতা প্রধানমন্ত্রী লি ছিয়াং দ্রুত দুর্গত এলাকায় গেছেন। সেখানে তাকে ধ্বংসাবশেষ সরানোর কাজ পরিদর্শন করতে দেখা গেছে।
বন্যার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই স্থানীয় কমিউনিস্ট পার্টির কার্যালয় থেকে সদস্যদের দুর্গত মানুষের পাশে দাঁড়ানোর নির্দেশ দেওয়া হয়। তাদের মানসিক সহায়তা দেওয়ার কথাও বলা হয়।
তবে নির্দেশনার মূল কথা ছিল, দুর্গত এলাকায় ‘সামাজিক শৃঙ্খলা বজায় রাখা এবং স্থিতিশীলতা ও মানুষের আস্থা নিশ্চিত করতে সর্বাত্মক চেষ্টা করা।’
যারা ভালোভাবে দায়িত্ব পালন করবেন, তাদের পুরস্কৃত করার কথা বলা হয়েছে। আর যারা দায়িত্বে ব্যর্থ হবেন, তাদের জবাবদিহির আওতায় আনার হুঁশিয়ারিও দেওয়া হয়েছে।
মানবাধিকারকর্মীদের দাবি, সরকারি বক্তব্যের সঙ্গে মেলে না—এমন কিছু অনলাইনে প্রকাশ করলে তিব্বতিদের আটক বা গ্রেপ্তার করা হতে পারে। ফলে তিব্বতের বাইরে থাকা স্বজনদের পক্ষেও সেখানে কী ঘটেছে, তা জানা কঠিন হয়ে পড়েছে।
ইন্টারন্যাশনাল ক্যাম্পেইন ফর তিবেট দুর্গত এলাকায় উদ্ধারকর্মীদের প্রশংসা করলেও অভিযোগ করেছে, চীনা কর্তৃপক্ষ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম থেকে ভিডিও এবং অনেক গুরুত্বপূর্ণ তথ্য সরিয়ে দিচ্ছে। সংগঠনটি হতাহত ও ক্ষয়ক্ষতির ‘সম্পূর্ণ ও যাচাইযোগ্য তথ্য’ প্রকাশের আহ্বান জানিয়েছে।
চীন অবশ্য তিব্বতিদের অধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ অস্বীকার করে। দেশটির দাবি, পর্যটন বাড়ানো এবং অঞ্চলটিকে দেশের সঙ্গে আরও যুক্ত করতে তিব্বতে বড় ধরনের বিনিয়োগ করা হয়েছে।
তবে তিব্বতে এখন যে ভয়াবহ বন্যা চলছে, চীনের ভেতরে থাকা সাধারণ মানুষ তার প্রকৃত চিত্র খুব বেশি জানতে পারবেন না—এমনটাই স্পষ্ট হয়ে উঠছে।
সূত্র : বিবিসি








