‘শারজাহ মডেলে’ সাজতে পারে চট্টগ্রাম বিমানবন্দর
- এশিয়ার গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রগুলোর সঙ্গে ৪০ মিনিট থেকে ৩.৫ ঘণ্টার দূরত্ব
- সমুদ্রবন্দর, টানেল, ইপিজেড ও ইকোনমিক জোনের সঙ্গে যোগাযোগ ব্যবস্থা
- শাহ আমানত বিমানবন্দরকে লজিস্টিকস হাবে রূপান্তরে উন্মোচিত হবে অর্থনৈতিক নতুন দিগন্ত

দুবাই আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর যখন বিশ্বের যাত্রীবাহী এয়ারলাইনসের শীর্ষ ট্রানজিট পয়েন্ট, ঠিক তার পাশে সংযুক্ত আরব আমিরাতের আরেক সিটি শারজাহ সম্পূর্ণ ভিন্ন কৌশল নিয়ে হয়েছে সফল। দুবাইয়ের মেগা প্যাসেঞ্জার হাবের বিপরীতে শারজাহ বিমানবন্দর নিজেদের রূপান্তর করেছে মধ্যপ্রাচ্যের অন্যতম শীর্ষ ‘এয়ার কার্গো ও লজিস্টিকস হাব’ রূপে। দুবাই-শারজাহর দূরত্ব ২৯ কিলোমিটার। একই ধরনের সমীকরণ সম্ভাবনা দেখা যাচ্ছে বাংলাদেশের চট্টগ্রামেও।
চট্টগ্রাম থেকে ভারতের কলকাতা, সেভেন সিস্টারস খ্যাত সাতরাজ্য, নেপাল, ভুটান, থাইল্যান্ড, ভিয়েতনাম, মিয়ানমার, চীনের কুনমিং ও গোয়াংঝুর আকাশযাত্রা মাত্র ৪০ মিনিট থেকে সাড়ে ৩ ঘণ্টার। এই দূরত্বও চট্টগ্রামকে এনে দেবে একটি কার্যকর ‘আঞ্চলিক লজিস্টিক হাব’ বানানোর বড় ভৌগোলিক সুবিধা।
বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের জন্য বাংলাদেশের অর্থনীতি অনেকটাই নির্ভরশীল তৈরি পোশাক শিল্পের ওপর। অনেক দিন ধরেই সরকারের নীতিনির্ধারকরা এ শিল্পের বাইরে খুঁজছে নতুন সম্ভাবনাময় খাত। বিশেষ করে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার আকাশ বাণিজ্যের কেন্দ্রবিন্দু হওয়ার মতো সব সম্ভাবনা বিরাজমান। এ সম্ভাবনা কাজে লাগাতে পারলে ঢাকার ওপর কমবে কার্গো চাপ। তখন চট্টগ্রামের শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরকে ‘শারজাহ মডেল’-এ সাজিয়ে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হবে বাংলাদেশের। তবে সফল আন্তর্জাতিক হাব বানানোর বিষয়টি নির্ভর করবে সরকারের নীতিনির্ধারকদের ‘দূরদর্শী ভাবনা’র ওপর।
‘শারজাহ মডেল’ মানে কী: ১৯৯০ সালের দিকে দুবাই আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের দ্রুত বৃদ্ধি ও আধিপত্যের মুখে শারজাহ এয়ারপোর্ট প্রথাগত প্যাসেঞ্জার হাব হওয়ার প্রতিযোগিতা থেকে সম্পূর্ণ সরে আসে। দাঁড় করায় ভিন্ন কৌশলের বিজনেস মডেল, নাম দেয় ‘এয়ার কার্গো ও লজিস্টিকস-ফার্স্ট বিজনেস মডেল’। শারজাহ মূলত বড় ও ব্যয়বহুল যাত্রীবাহী এয়ারলাইনের পেছনে না ছুটে কম খরচের কার্গো হাব বানানোর দিকে নজর দিয়ে পায় সফলতা। মোটাদাগে চারটি বড় নীতিগত সিদ্ধান্ত নেয় সে দেশের সরকার।
শারজাহ কোনো জটিল আমলাতান্ত্রিক শর্ত ছাড়া গ্রহণ করে ‘ওপেন স্কাই’ নীতি। এই সুবিধায় যেকোনো এয়ারলাইনস চাইলেই বিমানবন্দরে নামার সুযোগ পায়। অন্য প্রতিবেশী বিমানবন্দরগুলোর তুলনায় তারা টার্মিনাল হ্যান্ডলিং ফি, গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিং ও ল্যান্ডিং চার্জ প্রায় ৩০ শতাংশ পর্যন্ত কমিয়ে দেয়। ফলে এশিয়া, পূর্ব ইউরোপের দেশ এবং আফ্রিকার বিমান সংস্থাগুলো লজিস্টিক খরচ সাশ্রয়ে বেছে নেয় শারজাহকে।
শারজাহ ভৌগোলিক সুবিধার পূর্ণ ব্যবহার নিশ্চিত করতে বিমানবন্দরে চালু করে বিশেষ ‘সি-টু-এয়ার’ কার্গো করিডর। আরব সাগর ও পারস্য উপসাগরের বন্দরগুলো যেমন- মিনা খালিদ ও খোরফাক্কান থেকে আসা পণ্য কয়েক ঘণ্টার মধ্যে শুল্কায়ন শেষে বিমানবন্দরে এনে বিমানে তুলে পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে পাঠানোর এক ‘দ্রুততম লজিস্টিক’ ব্যবস্থা গড়ে তুলে।
বিমানবন্দরের সঙ্গে লাগোয়া ফাঁকা জমিতে লজিস্টিকস হাব গড়ে তুলতে তৈরি করে ‘ফ্রি ট্রেড সেফ জোন’। এর মাধ্যমে আন্তর্জাতিক বিমান সংস্থা, কার্গো এজেন্ট ও লজিস্টিকস ফার্মগুলোকে দেওয়া হয় শতভাগ বিদেশি মালিকানা, করছাড় এবং দ্রুত লাইসেন্স সুবিধা। অবকাঠামো খাতে শারজাহ কর্তৃপক্ষ নিজের তহবিল থেকে করেনি বড়সড় কোনো বিনিয়োগ। একই সঙ্গে বিমানবন্দরেও বড় বিনিয়োগ করতে হয়নি অবকাঠামো খাতে। এতে বিমানবন্দরটি শুধু উড্ডয়ন কেন্দ্র নয়, বরং পরিণত হয় পণ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ ও পুনঃরপ্তানির হাবে। এ ছাড়া শারজাহ এয়ারপোর্ট তাদের অপারেশনাল দক্ষতা এমনভাবে সাজায় যাতে উড়োজাহাজ অবতরণের পর সবচেয়ে কম সময়ে অর্থাৎ ২৫-৩০ মিনিটে আবার উড়াল দিতে পারে। এতে পরিচালন খরচ কমে যায় এয়ারলাইনগুলোর। বিদেশি কার্গো এয়ারলাইনগুলো লুফে নেয় এই ভিন্নধর্মী বিজনেস মডেল।
এই মডেল শুরুর মাত্র তিন বছরেই জার্মানির বিখ্যাত ‘লুফথানসা কার্গো’ শারজাহ বিমানবন্দরকে এশিয়ার প্রধান কার্গো ট্রানজিট হাব হিসেবে বেছে নেয়। এরপর সিঙ্গাপুর এয়ারলাইনস, ইউপিএস, ক্যাথে প্যাসিফিক ও ইভিএ এয়ারের মতো বৈশ্বিক কার্গো এয়ারলাইনস জায়ান্টগুলো হতে শুরু করে শারজাহমুখী। সাত বছরের মধ্যে পরিণত হয় মধ্যপ্রাচ্যের শীর্ষ কার্গো হাবে।
সেই সাফল্যের ধারাবাহিকতায় শারজাহ কর্তৃপক্ষ কম বাজেটের যাত্রী পরিবহনে নজর দেয়। ২০০৩ সালে মধ্যপ্রাচ্যের প্রথম কম খরচের এয়ারলাইনস এয়ার অ্যারাবিয়াকে দায়িত্ব দেয় শারজাহ বিমানবন্দর পরিচালনার। এয়ার অ্যারাবিয়া সেই বিমানবন্দরকে গড়ে তোলে নিজেদের হাব হিসেবে। এখন শারজাহ থেকে এয়ার অ্যারাবিয়া ফ্লাইট চালাচ্ছে বিশ্বের ১১০ গন্তব্যে।
১৯৯০ সালের আগে শারজাহ এয়ারপোর্ট বছরে কার্গো ওঠানামা করতে পারত গড়ে ৫০ থেকে ৮০ হাজার টন। ছোট্ট একটি কার্গো টার্মিনালে ছিল না কোল্ড স্টোরেজ বা বড় এক্সপ্রেস কুরিয়ার সুবিধা পর্যন্ত। নতুন বিজনেস মডেল চালুর পর ১৯৯৯ সালে পণ্য ওঠানামা একলাফে পৌঁছে ৬ লাখ টনে। ২০২৫ সালে ২০ লাখ টনের বেশি পণ্য ওঠানামা হয়েছে বিমানবন্দরে।
১৯৯০ সালের আগে এই বিমানবন্দরে বছরে যাত্রী ওঠানামা ছিল ছয় লাখের বেশি। ১৯৯৯ সাল নাগাদ তা স্পর্শ করে বছরে ১০ লাখ যাত্রীর মাইলফলক। ২০০৩ সালে এয়ার অ্যারাবিয়া পরিচালনার দায়িত্ব নেওয়ার তিন বছর পর ২০০৬ সালে ২৫ লাখ। ২০১৫ সালে গড়ে ১ কোটির রেকর্ড। এর ১০ বছরের ব্যবধানে ২০২৫ সালে শারজাহ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর গড়ে প্রায় ২ কোটি যাত্রী ওঠানামার রেকর্ড।
শারজাহর মতো একই কৌশল কাজে লাগিয়ে নজির গড়েছে শ্রীলঙ্কার কলম্বোও। ভৌগোলিক অবস্থান ও শিল্প অবকাঠামোর দিক থেকে চট্টগ্রামেও রয়েছে একই সুবিধা। চট্টগ্রাম সমুদ্রবন্দর লাগোয়া শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর। কর্ণফুলী নদীর তলদেশের টানেল বিমানবন্দরকে সরাসরি যুক্ত করেছে আনোয়ারা শিল্পাঞ্চল, চায়না ইকোনমিক অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিয়াল জোন ও কোরিয়ান ইপিজেডের সঙ্গে। চট্টগ্রামে আছে দেশের সবচেয়ে বড় ইপিজেড। এর সঙ্গে উত্তরে মিরসরাই অর্থনৈতিক অঞ্চল এরই মধ্যে সড়কপথে যুক্ত হয়েছে বিমানবন্দরে। দক্ষিণে তৈরি হচ্ছে দেশের প্রথম গভীর সমুদ্রবন্দর মাতারবাড়ী। সেই বন্দরের সঙ্গে সাগরপথে সরাসরি যুক্ত হবে চট্টগ্রাম বন্দর। সব মিলিয়ে চট্টগ্রাম বিমানবন্দর ঘিরে একটি লজিস্টিক করিডর তৈরির দারুণ সম্ভাবনার কথা বলছেন সবাই।
সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা, সরকারের নীতিগত সহায়তা এবং দূরদর্শী চিন্তা কীভাবে সফলতার চূড়ান্তে পৌঁছানো যায়, এয়ার অ্যারাবিয়া তার বড় উদাহরণ— বলছেন তৈরি পোশাক শিল্পের ব্যবসায়ী এশিয়ান গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আবদুস সালাম। তার ভাষ্য, ‘সময় এসেছে চট্টগ্রাম বিমানবন্দরের ভৌগোলিক সুবিধা কাজে লাগিয়ে দেশকে এগিয়ে নেওয়ার।’
চট্টগ্রাম বিমানবন্দরে প্রথম বিদেশি এয়ারলাইনস ছিল ‘সিল্ক এয়ার’। সে সময়ে প্রতিষ্ঠানের চট্টগ্রাম প্রধান ছিলেন সোহেল মজিদ। এখন দেশি এয়ারলাইনস নভোএয়ারের পরিচালক (মার্কেটিং)। তার মত, ‘সমুদ্রবন্দরকে কাজে লাগিয়ে চট্টগ্রাম বিমানবন্দরকে লজিস্টিক হাব করার এখনই সবচেয়ে ভালো সময়। কিছু নীতি কৌশল ঘোষণা করলেই চীন, হংকংসহ মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশ প্রথমেই সাড়া দেবে। দেশে অনন্য উদাহরণ তৈরি হবে।’
আহমেদ ইউসুফ ওয়ালিদ গ্যালাক্সি বাংলাদেশ গ্রুপের প্রধান নির্বাহী। তিনি কাতার এয়ারওয়েজ, সৌদিয়া এয়ারলাইনস, ওমান এয়ার, থাই এয়ারওয়েজ, জাজিরা এয়ারওয়েজ, এপিপিসহ বেশ কয়েকটি আন্তর্জাতিক এয়ারলাইনসের জিএসএ (জেনারেল সেলস এজেন্ট)। তার পরামর্শ, ‘চট্টগ্রাম বিমানবন্দরের ল্যান্ডিং-পার্কিং চার্জের সঙ্গে যদি গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিং মাশুলও কমে, তাহলে অবশ্যই বিদেশি কার্গো এয়ারলাইনস আসবে। আর অনেক বিদেশি যাত্রীবাহী এয়ারলাইনস চট্টগ্রামে সার্ভিস গুটিয়ে নেওয়ার পর আমার পর্যবেক্ষণ হচ্ছে, এসব যাত্রীবাহী ফ্লাইটকে যদি ইনসেনটিভ দেওয়া হয়, তাহলে সব এয়ারলাইনস চট্টগ্রামে ফিরবে। ঢাকার পাশাপাশি চট্টগ্রাম থেকেও ফ্লাইট চালাবে। সরকার এভাবে দারুণভাবে শুরু করতে পারে। তখন স্বাভাবিকভাবে হাব হয়ে উঠবে চট্টগ্রাম।’
চট্টগ্রাম বিমানবন্দরে বিদেশি এয়ারলাইনস আনতে অ্যারোনটিক্যাল চার্জ ৪০ শতাংশ ছাড়, ২৪ ঘণ্টা বিমানবন্দর সেবা চালু, সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্বে কার্গো ভিলেজ নির্মাণসহ পাঁচ দফা প্রস্তাব অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীকে দিয়েছে চট্টগ্রাম চেম্বার। চেম্বারের সভাপতি মোহাম্মদ আমিরুল হক বললেন, ‘আগে নীতি সহায়তা ঘোষণা দেন। বিভিন্ন মেয়াদি পরিকল্পনা জানান। কার্গো ভিলেজ করতে দেশি-বিদেশি উদ্যোক্তাদের প্রস্তাব চান। দেখবেন অনেকেই এগিয়ে আসছে। দিনে দিনে শারজাহ কিন্তু লজিস্টিক হাব হয়ে ওঠেনি। আর দেরি নয়, আমাদের শুরু করতেই হবে।’
চায়না সাউদার্ন এয়ারলাইনসের জিএসএ অ্যামনেস্টার সলিউশনস লিমিটেডের চেয়ারম্যান হাবিব উল্লাহ ডন চট্টগ্রাম থেকে যাত্রী ও কার্গো— দুই ধরনের ফ্লাইট শুরুতে একমত। বললেন, ‘আমরা চট্টগ্রাম থেকে বিভিন্ন রুটে ফ্লাইট শুরুর মার্কেট সম্ভাব্যতা যাচাই করছি। রিপোর্ট পেলে আমাদের এয়ারলাইনস সপ্তাহে দুই-তিনটি ফ্লাইট চীনের বিভিন্ন গন্তব্যে চালাতে পারব।’







