নেপালে বন্যার তাণ্ডব থেকে জীবন ফিরে পাওয়ার গল্প

চোখের সামনে ঘরবাড়ি, জনবসতি আর প্রিয়জনদের স্রোতে ভেসে যেতে দেখেও বেঁচে থাকা যেন তাদের কাছে স্বপ্নেরই মতো- সংগৃহীত ছবি
পাহাড় কাঁপিয়ে বুধবার হঠাৎ নেমে এসেছিল ভোতে কোসির ভয়ংকর ঢল। কেউ দৌড়ে, কেউ গাড়ি ছুটিয়ে, কেউ বিদ্যুতের তার আঁকড়ে ধরে মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরে এসেছেন; আবার কারও বেঁচে যাওয়া ছিল নিছক ভাগ্যের খেলা। চোখের সামনে ঘরবাড়ি, জনবসতি আর প্রিয়জনদের স্রোতে ভেসে যেতে দেখেও যারা বেঁচে আছেন, তাদের মুখে এখন শুধু একটাই কথা—‘মনে হচ্ছে, নতুন জীবন পেয়েছি।’
‘বিদ্যুতের তার আঁকড়ে ধরে বেঁচে গেছি’
কাদায় মাখামাখি শরীর। খালি পায়ে কর্দমাক্ত সড়ক ধরে হাঁটছেন এক তরুণ। প্রতিটি পা ফেলতেই যেন তাকে লড়াই করতে হচ্ছে।
রাউতহাটের রাজদেবী পৌরসভার ২ নম্বর ওয়ার্ডের হাজমিনিয়ার ৩৬ বছর বয়সী রামবচন সাহের এই ছবি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে। ত্রিশূলী বাজারের বন্যা থেকে প্রাণে বেঁচে যাওয়ার পর ছবিটি প্রকাশ্যে আসে।
সাহ গত ১৫ বছর ধরে সেতুর কাছে শ্যাম মিষ্টির দোকানে কাজ করতেন। বুধবার সকালে তিনি মিষ্টি তৈরি করছিলেন। হঠাৎ বন্যার পানি দোকানের ভেতরে ঢুকে পড়ে।
প্রবল স্রোত তাকে ভাসিয়ে নিয়ে যায়। একপর্যায়ে তার হাত একটি বিদ্যুতের তারে আটকে যায়।
তিনি বললেন, ‘তারটি আঁকড়ে ধরে বেঁচে গেছি। যেন নতুন জীবন পেয়েছি।’
প্রায় আধাঘণ্টা তিনি তারটি ধরে ঝুলে ছিলেন। নিচে তখন গর্জন করে ছুটছিল বন্যার পানি।
তার ভাষ্য, ‘নিজেকে বাঁচানোর আর কোনো উপায় না দেখে কাছে ঝুলে থাকা একটি বিদ্যুতের তার ধরে ফেলি। প্রায় আধাঘণ্টা জীবন-মৃত্যুর মাঝখানে ঝুলে থেকে বাঁচার জন্য লড়াই করেছি। আমার হাত যদি তার থেকে পিছলে যেত, তাহলে বেঁচে থাকার কোনো সুযোগই ছিল না।’
তারটি তাকে ধরে রেখেছিল। সাহ বেঁচে গেছেন। তবে দোকানের তিনজন—সংগীতা, তার ছেলে রাহুল এবং আরেক কর্মী বিনোদ ভগত—এখনো নিখোঁজ।
সাহ এখন এক বন্ধুর বাড়িতে আছেন।
তিনি বললেন, ‘আমার শরীরে হয়তো এখনো বন্যার কাদার দাগ লেগে আছে। কিন্তু সেদিন সকালের সেই ভয় এখনো আমার মনে একেবারে তাজা।’
তার বড় ভাই রবীন্দ্র জানান, সারা দিন পরিবার তার সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারেনি।
‘সন্ধ্যার অনেক পরে যখন শেষ পর্যন্ত তার খবর পেলাম, তখনই জানতে পারলাম সে নিরাপদে আছে,’ বললেন তিনি।
সাহর দুটি ছোট ছেলে রয়েছে। রাউতহাটের প্রধান জেলা কর্মকর্তা দীনেশ সাগর ভুসাল জানিয়েছেন, বন্যার পর জেলাটির ১২ জন নিখোঁজ রয়েছেন বলে জানা গেছে।
‘আমি বেঁচে গেছি, কিন্তু মামার পুরো পরিবারকে হারিয়েছি’
ঝাপার বাসিন্দা সচিন খাতি বেঁচে গেছেন। বন্যা আঘাত হানার সময় তিনি জনবসতি থেকে দূরে ছিলেন বলেই প্রাণে রক্ষা পেয়েছেন।
ঝাপার বুদ্ধশান্তি-২-এর ৩৩ বছর বয়সী তার মামা রাজ কুমার দিয়ালি গত ১৫ বছর ধরে রসুয়ার স্যাব্রুবেসি-৫ এলাকায় গয়নার ব্যবসা করতেন। সেখানে তিনি স্ত্রী শ্রিতি ও চার বছরের ছেলে শ্রীরাজকে নিয়ে থাকতেন। সচিনও তাদের সঙ্গে থেকে ব্যবসায় সহযোগিতা করছিলেন।
রাজ কুমার বুধবার সকালে কাজের জন্য সচিনকে চিলিমে পাঠান। বন্যার খবর পেয়ে সচিন দ্রুত ফিরে আসেন। কিন্তু তিনি পৌঁছানোর আগেই তাদের বসতি পানির স্রোতে ভেসে যায়।
সচিন বললেন, ‘বুধবার ভোরে মামা আমাকে কাজের জন্য চিলিমে পাঠিয়েছিলেন। বন্যা এসেছে শুনেই আমি দ্রুত ফিরে আসি। কিন্তু ততক্ষণে আমরা যেখানে থাকতাম, সেই পুরো গ্রামই ভেসে গেছে।’
সচিন এখন ধুনচেতে নেপাল সেনাবাহিনীর নিরাপত্তায় আছেন। তার মামা রাজ কুমার, মামি শ্রিতি ও তাদের ছেলে শ্রীরাজের এখনো কোনো খোঁজ নেই। নিজের বেঁচে যাওয়ার আনন্দের চেয়েও মামার পরিবারের খবরের অপেক্ষাই এখন সচিনের কাছে বড় হয়ে উঠেছে।
রাজ কুমারের ভাগনি রাধা খাতি কান্নাজড়িত কণ্ঠে বললেন, ‘তারা জীবিত না থাকলেও অন্তত তাদের মরদেহগুলো যেন খুঁজে পাই। পুরো পরিবার তাদের জন্য অপেক্ষা করছে।’
ঝাপা জেলা পুলিশ কার্যালয় জানিয়েছে, কাজ, ব্যবসা বা চাকরির জন্য রসুয়ায় যাওয়া জেলার ১৩ জনের সঙ্গে বন্যার পর থেকে যোগাযোগ করা যাচ্ছে না।
‘আমি সামনে ছিলাম, আর ঠিক পেছনেই ছিল বন্যা’
মাকওয়ানপুরের থাহা পৌরসভার ২ নম্বর ওয়ার্ডের ফেদিগাঁওয়ের রাজ কুমার কার্কি বন্যার আগে গাড়ি চালিয়ে সামনে এগিয়ে গিয়ে প্রাণে বেঁচেছেন।
তিনি মঙ্গলবার নুওয়াকোটের বেত্রাবতীতে পৌঁছেছিলেন। পরদিন সকালে পণ্য বোঝাই করতে টিমুরের দিকে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। এমন সময় মাইকে সতর্কবার্তা শুনতে পান—‘বন্যা আসছে, বন্যা আসছে।’
কার্কি তার কনটেইনার ট্রাক ঘুরিয়ে গালছির দিকে চালাতে শুরু করেন। কিছুক্ষণ পর তিনি বন্যার পানির বিশাল ঢেউ ধেয়ে আসতে দেখেন এবং গাড়ির গতি বাড়িয়ে দেন।
তার সামনে থাকা গাড়ি ও চালকরা পানির স্রোতে ভেসে যান। তাদের মধ্যে কিরণ ভুজেলের চালানো আরেকটি কনটেইনার ট্রাকও ছিল।
কার্কি বললেন, ‘পেছনে বন্যা, আর আমি সামনে—উন্মত্ত ভোতে কোসি নদীর স্রোতের আগে ছুটে প্রাণে বেঁচেছি। পালানোর জন্য যত দ্রুত সম্ভব গাড়ি চালিয়েছি। আমার পেছনে থাকা প্রায় ৯টি কনটেইনার ট্রাক ও তাদের চালক এরই মধ্যে ভেসে গিয়েছিল।’
পাশের আয়নায় নিজের দিকে ধেয়ে আসা বন্যার স্রোত দেখেও কার্কি গাড়ি চালিয়ে যেতে থাকেন। ত্রিশূলীর ধুঙ্গে বাজারে পৌঁছানোর আগে তিনি ট্রাকটি পাহাড়ের দিকে তুলে দেন।
‘এতেই ট্রাক আর আমি—দুজনেই বেঁচে যাই। কোনোমতে প্রাণ নিয়ে বের হতে পেরেছি।’
রাতটি তিনি পাহাড়ের ঢালে কাটান। সেখান থেকে বেত্রাবতী ও আশপাশের জনবসতিগুলো ধ্বংস হতে দেখেন। শহরের বড় একটি অংশ নদীর তলদেশে পরিণত হয়। তার চোখের সামনে বন্ধুরা ত্রিশূলী নদীতে হারিয়ে যান।
নিরাপত্তাকর্মীদের সহায়তায় বৃহস্পতিবার নিরাপদে কাঠমান্ডু পৌঁছান কার্কি। শুক্রবার বিকালে ফিরে যান থাহা পৌরসভার ২ নম্বর ওয়ার্ডের বাড়িতে।
৩৬ বছর বয়সী কার্কি ২০ বছর ধরে পেশাদার গাড়িচালক। নিজের কনটেইনার ট্রাক রয়েছে তার। গত পাঁচ বছর ধরে রসুয়া থেকে দেশের বিভিন্ন এলাকায় পণ্য পরিবহন করছেন।
ট্রাকটি এখন তার বাড়িতে নিরাপদে রাখা আছে। তবে সেদিনের দেখা দৃশ্যগুলো এখনো তার মন থেকে মুছে যায়নি।
‘এখনো মনে হয়, সবটাই যেন স্বপ্ন’
রসুয়ার মাইলুংয়ে বুধবার সকালে ২১৬ মেগাওয়াট ক্ষমতার আপার ত্রিশূলী-১ জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের কাছে কাজ করছিলেন সলিয়ানের গোথে কামি। হঠাৎ পাহাড় থেকে পাথর গড়িয়ে পড়ার মতো একটি শব্দ শুনতে পান তিনি।
এরপরই দেখেন, ভোতে কোসি নদী তাদের দিকে ধেয়ে আসছে।
কুমাখ গ্রামীণ পৌরসভার ১ নম্বর ওয়ার্ডের ৪০ বছর বয়সী কামি সবাইকে দৌড়াতে বলেন। নিজেও সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ৫০০ মিটার উঁচু জঙ্গলে ঢাকা পাহাড়ের ঢাল বেয়ে ছুটতে থাকেন। তার হৃদস্পন্দন বেড়ে যায়। একপর্যায়ে তিনি কিছুক্ষণের জন্য জ্ঞানও হারান।
জ্ঞান ফেরার পর দেখেন, নিচের জনবসতি চাপা পড়ে গেছে। পালাতে থাকা মানুষের চিৎকার শুনতে পাচ্ছিলেন তিনি।
তিনি বললেন, ‘তখনই বুঝতে পারলাম, আমি বেঁচে গেছি। এখনো মনে হয়, সবটাই যেন স্বপ্ন। পুরো ঘটনাটা এখনো চোখের সামনে দেখতে পাই।’
কামি জানান, ছোটবেলায় গরু-ছাগল চরানোর সময় খাড়া পাহাড়ের ঢাল বেয়ে দৌড়ানোর অভিজ্ঞতাই তাকে পালাতে সাহায্য করেছে।
‘বন্যায় ধ্বংসযজ্ঞ দেখে মনে হয়েছিল, আমি মারা যাব। সৌভাগ্যক্রমে বেঁচে গেছি। মনে হচ্ছে, নতুন জীবন পেয়েছি।’
‘জঙ্গলের দিকে দৌড়ে যাওয়াই আমাকে বাঁচিয়েছে’
রামেছাপের মানথালি পৌরসভার ১৩ নম্বর ওয়ার্ডের শুল্ক প্রতিনিধি রাজু বুধাথোকি টিমুরেতে নিজের ঘরে বিশ্রাম নিচ্ছিলেন। সকাল সাড়ে ৮টার দিকে হঠাৎ পাহাড়ের ঢাল কাঁপতে শুরু করে।
তিনি বললেন, ‘আমি ঘুমাচ্ছিলাম। হঠাৎ মনে হলো ভূমিকম্প হয়েছে—পুরো পাহাড় কাঁপতে শুরু করল। ত্রিশূলীতে চিকিৎসা নেওয়ার সময় তিনি এ কথা বলেন। ‘ভাবার সময় ছিল না। জীবন বাঁচাতে বাইরে দৌড়ে বেরিয়ে যাই।’
তিনি একটি পুলিশ পোস্টের দিকে ছুটছিলেন। কিন্তু দেখেন, পুলিশ সদস্যরাও সেখান থেকে পালাচ্ছেন। পেছনে তাকিয়ে দেখেন, টিমুরের বাড়িঘর বন্যার স্রোতে ভেঙে পড়ছে। কিছু বাড়ি কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই ত্রিশূলী নদীতে হারিয়ে যায়।
তার ভাষ্য, ‘জনবসতি থেকে প্রায় ৫০০ মিটার উঁচু জঙ্গলে পৌঁছাই। সেখানেই শেষ পর্যন্ত প্রাণে বাঁচি। টিমুরের দিকে তাকিয়ে কখনো ভাবিনি, জীবনে দ্বিতীয়বার সুযোগ পাব। পুরো ঘটনাটাই এখন ভয়াবহ স্বপ্নের মতো মনে হচ্ছে।’
‘নতুন জীবন নিয়ে ফিরে এসেছি’
কাঠমান্ডুর গোকর্নেশ্বরের বাসিন্দা প্রকাশ গৌতমও টিমুরেতে ছিলেন। হঠাৎ প্রচণ্ড শব্দে পুরো জনবসতি কেঁপে ওঠে।
গৌতম বললেন, ‘কয়েক মুহূর্তের মধ্যেই পুরো জনবসতি অন্ধকার হয়ে গেল। কালো মেঘে আকাশ ঢেকে গেল। কোথায় যাব, কিছুই জানতাম না। শুধু জীবন বাঁচাতে বাইরে ছুটলাম।’
পালানোর সময় তার বাম পায়ের কনিষ্ঠ আঙুলে আঘাত লাগে। জঙ্গল থেকে তিনি বন্যার পানিতে মরদেহ ভাসতে দেখেন। আর টিমুরে তখন ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে।
‘বাড়িঘর ও পুরো জনবসতি ভেসে গেছে। এখন সেখানে শুধু বিশাল বালুর স্তূপ’, বলছিলেন তিনি।
গৌতম ও অন্যরা বুধবার রাতটি জঙ্গলে কাটান। নেপাল সেনাবাহিনীর হেলিকপ্টার থেকে ফেলে দেওয়া ইনস্ট্যান্ট নুডলস খেয়ে তারা রাত কাটান।
সেনাবাহিনীর একটি হেলিকপ্টারে করে বৃহস্পতিবার সকাল ১০টার দিকে তাদের বিদুরে নেওয়া হয়।
তিনি বললেন, ‘হেলিকপ্টারে ওঠার পরই প্রথম মনে হলো, এবার বোধ হয় বেঁচে যাব। নতুন জীবন নিয়ে ফিরে এসেছি।’
‘ওই ঢেউ না থাকলে আজ আমি বেঁচে থাকতাম না’
রসুয়ার একটি জনবসতির ওপর দিয়ে কালো কাদা ও পানির স্রোত বয়ে যাওয়ার সময় প্রবল বন্যার ঢেউ তাকে পাহাড়ের ঢালের দিকে ছুড়ে দেয়। এভাবেই প্রাণে বেঁচে যান দোলখার তুলসি বাহাদুর ভান্ডারি।
হাসপাতালের শয্যায় শুয়ে ভান্ডারি বললেন, ‘হঠাৎ ভবনগুলো ভেঙে পড়তে শুরু করল। কালো কাদা আর পানির এই স্রোত কোথা থেকে এলো, আমরা কিছুই বুঝতে পারিনি।’
তিনি দৌড়াতে শুরু করেন। কিন্তু বন্যার স্রোত তাকে ধরে ফেলে।
তিনি বললেন, ‘ঢেউটি আমাকে প্রচণ্ড জোরে আঘাত করে ছিটকে দূরে ফেলে দেয়।’
ভান্ডারি বলছিলেন, ‘ওই ঢেউ যদি আমাকে পাহাড়ের ঢালের দিকে ছুড়ে না দিত, তাহলে আজ আমি বেঁচে থাকতাম না। আমাকে পাশের দিকে ঠেলে দেওয়ায় অলৌকিকভাবে আমি স্রোতে ভেসে যাওয়া থেকে বেঁচে যাই।’
কাঠমান্ডু পোস্ট থেকে অনূদিত










