নেপালে বন্যা
‘যে নদী কখনো আমাদের ছোঁয়নি, এবার কেড়ে নিল সব’

ছবি: রয়টার্স
কাঠমান্ডুতে কান্তিপুর পাবলিকেশন্সের কার্যালয়ের দিকে যাচ্ছিলাম বুধবার সকালে। তখনই স্ত্রী ফোন করল।
‘ত্রিশূলীতে বন্যা হয়েছে,’ সে বলল। ‘সোলে বাজার আর বেত্রাবতীতে কী যেন হয়েছে—মানুষ বলছে, কিছুই আর অবশিষ্ট নেই। সবাই রাস্তায় বেরিয়ে এসেছে। তারা আতঙ্কে ছুটোছুটি করছে, এমন ভিডিওও আছে।’
আমি বিশ্বাস করতে পারছিলাম না। সোলে আমার গ্রাম। এর গলিতে খেলেছি, মাঠে কাজ করেছি, বছরের পর বছর প্রতিদিন সকালে এই পথ ধরে স্কুলে হেঁটে গেছি। জায়গাটাকে আমার চেয়ে ভালো আর কে জানবে? তাই এমন কিছু ঘটতে পারে, তা হলে নিশ্চয়ই আমি আগে জানতে পারতাম। এমনকি বৃষ্টিও যে অস্বাভাবিক রকম বেশি হয়েছে, সেটাও শুনিনি। আর নদী তো এই জনবসতিতে পৌঁছায়ই না—বর্ষা যত ভয়াবহই হোক। তাই বিষয়টি আর মাথায় নিলাম না। সকাল ১১টায় সংবাদ সম্মেলন ছিল, দ্রুত এগিয়ে গেলাম।
বেত্রাবতী বাজারেই আমরা কেনাকাটা করি, বাসও সেখানে থামে। সেখান থেকে বাসে সরাসরি কাঠমান্ডু যাওয়া যায়। মা-বাবাও সেখানে আমার জন্য অপেক্ষা করতেন, জানতেন আমি বাড়ির পথে আছি। জায়গাটি ছিল পুরো এলাকার প্রাণকেন্দ্র। সেখানে আছে রাম মন্দির, কৃষ্ণ মন্দির। রামনবমী ও কৃষ্ণাষ্টমীতে সেখানে মানুষের ঢল নামত। পুরোনো নেয়ার বসতি হওয়ায় গাই যাত্রাও হতো। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে মাঘে সংক্রান্তিতে সেখানে ষাঁড়ের লড়াইও হতো, যা দেখতে কাঠমান্ডু থেকেও মানুষ আসত।
এসবই যে এর মধ্যে শেষ হয়ে গেছে, তা কিছুক্ষণের মধ্যেই জানতে পারব ভাবতেই পারিনি।
স্ত্রী যা বলেছিল, তা যাচাই করতে একটি সংবাদমাধ্যমের ওয়েবসাইট খুললাম। ভেবেছিলাম, হয়তো কিছুই পাওয়া যাবে না। শিরোনাম দেখলাম—‘ত্রিশূলীতে ভয়াবহ বন্যা’। বুকের ভেতরটা কেমন যেন চেপে এল।
আমি নিরঞ্জনকে ফোন করলাম। সে নিজেও সাংবাদিক। তার পরিবার সোলে বাজারে থাকে। বাজার বড় হয়ে ওঠার পর তারা গ্রাম থেকে নিচে নেমে এসেছিল। তার চাচা থাকেন নদীর আরও কাছে। ফোনের প্রথম রিংয়েই সে ধরল।
‘আমিও এইমাত্র শুনলাম, দাই,’ এক নিঃশ্বাসে বলল সে। ‘কারও সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারছি না। মা নেই, বাবা নেই, চাচা নেই, চাচি নেই—কারও ফোনই বাজছে না।’
কার্যালয়ে যাওয়ার বাকি পথটুকু আমরা একে অন্যকে বারবার ফোন করতে থাকলাম। বাড়ির সঙ্গে যোগাযোগের জন্য জানা প্রতিটি নম্বরে চেষ্টা করলাম। কোনো ফোনই গেল না।
শেষ পর্যন্ত একজনের সঙ্গে যোগাযোগ হলো—এক বড় ভাইয়ের বাড়িতে। ফোন ধরলেন তার স্ত্রী। শান্তভাবে বললেন, ‘গ্রামে আর কিছুই নেই। বেশির ভাগ মানুষই চলে গেছে।’
কথাটা আমি বিশ্বাস করতে পারছিলাম না। সোলে আর টুপচে নদীর তলদেশ থেকে প্রায় ১০০ মিটার ওপরে। মানুষের স্মৃতিতে—এমনকি যত দূর জানা যায়, শত শত বছরেও—কোনো বন্যা এত ওপরে ওঠেনি। আমার বয়স ৪৪ বছর। এই পুরো সময়ে একবারও দেখিনি নদী আমাদের দিকে এগিয়ে এসেছে। সেখানে আমার চাচাতো-মামাতো ভাইবোন, প্রতিবেশী, শৈশবের বন্ধুরা রয়েছে। নিজের বাড়ির বাইরের জীবনে যাদের ভালোবেসেছি, তাদের সবাই ওই গ্রামের মানুষ।
একজন একজন করে তাদের ফোন করতে শুরু করলাম। সোলে এমন এক জায়গা, যেখানে কোনো না কোনোভাবে সবাই সবার আত্মীয়। রক্তের সম্পর্ক না থাকলেও বয়সের সম্পর্ক আছে। তাই অপরিচিত কাউকেও দাই বা দিদি বলে ডাকা হয়—এটাই সেখানকার রীতি। সবাই আমার আপন, আমিও সবার আপন।
এরপর ধীরে ধীরে আমার ফোনে ভিডিও আর ছবি আসতে শুরু করল। সেগুলোতে যা দেখলাম, তার জন্য কোনোভাবেই প্রস্তুত ছিলাম না।
আমার বড় চাচি ভেসে গেছেন। তার ছেলে, আমার দাই মধুও ভেসে গেছে। তার স্ত্রীও। আরেক চাচিও নেই—আমাকে জানানো হলো। তার নাতি সিজান ও তার স্ত্রীও একই পানিতে ভেসে গেছে। সিজানের নিজের ছেলে ও পুত্রবধূরও কোনো খোঁজ নেই। আমার মামা সেদিন সকালে গরুর জন্য ঘাস কাটতে বেরিয়েছিলেন। আর ফেরেননি।
আমি ওয়ার্ড চেয়ারম্যান রবীন্দ্র নেপালকে ফোন করলাম।
‘ভাই, আজ সকালে খুব ভোরে পৌরসভা কার্যালয়ে এসেছিলাম। এখন এখানেই আটকে আছি,’ তিনি বললেন। ‘গ্রামে আর কিছুই নেই। বাকিটা আপনি নিজেই বুঝতে পারছেন।’
প্রতিটি ফোনের পর পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ মনে হচ্ছিল। তিনি বললেন, কেউ কেউ খাড়া পাহাড়ের ঢালে উঠে কোনোভাবে বেঁচে গেছেন—কেউ উঠে, কেউ ভাগ্যের জোরে।
কাছের স্থানীয় একটি স্কুলের এক শিক্ষকের সঙ্গে যোগাযোগ করলাম।
‘ভাই, আমি নিজের পরিবারেরই কাউকে খুঁজে পাচ্ছি না,’ তিনি বললেন। ‘বেত্রাবতীর ৯০ শতাংশ বাড়ি নেই। স্কুলের ভ্যানটাও ভেসে গেছে। আমার পাশে একটি ছেলে আছে, তার পা ভেঙে গেছে। পাশে আরেকজনের পা ভেঙেছে, চোখও গুরুতরভাবে আহত। আপনি যদি এখানে একটি হেলিকপ্টার আনতে পারেন, দয়া করে পাঠান।’
এরপর নিরঞ্জনের চাচা ফোন করলেন। নিরঞ্জনের বাবা, মা, চাচা, চাচি এবং ছোট বোন হিমানী—সবাই পানিতে ভেসে গেছে।
‘আমরা শেষ, অর্জুন,’ তিনি বললেন। ‘এখন ফোন রাখছি।’
তিনি ফোন কেটে দিলেন।
বেত্রাবতী শুধু একটি বাজার ছিল না। একসময় নেপাল ও তিব্বতের যুদ্ধের পর এখানেই দুই পক্ষ শান্তিচুক্তি সই করেছিল। এখানেই রয়েছে উত্তর গঙ্গা ধাম—এতটাই পবিত্র একটি স্থান যে প্রতিবছর পুষ্য অমাবস্যায় হাজারো মানুষ সেখানে মৃত স্বজনদের স্মরণ করতে যান।
সবকিছুই এখন ধ্বংসস্তূপ—মন্দির, শান্তিচুক্তির সেই স্থান, তীর্থস্থান।
সড়ক নেই, বিদ্যুৎ নেই, মুঠোফোনের সংকেত নেই, ইন্টারনেট নেই। ভাটির দিকে বন্যার স্রোত প্রথমে ত্রিশূলী জলবিদ্যুৎকেন্দ্রের পানি প্রবেশের মুখটি ভাসিয়ে নিয়ে গেছে। এরপর বিদ্যুৎকেন্দ্রটিও।
২০১০-১১ সালের সেই সময়ের কথা মনে পড়ে, যখন সারা দেশে নিয়মিত লোডশেডিং হতো। তখনও আমাদের গ্রামে একবারও বিদ্যুৎ যেত না। এখন পুরো জেলাই অন্ধকারে।
বুধবার সন্ধ্যায় বন্ধুদের সঙ্গে জেলা সদর অভিমুখে যাওয়ার সময় নিজের চোখেই দেখেছি। শুধু আমার গ্রাম নয়, পুরো জেলাই অন্ধকারে ডুবে গেছে।
সকালে যারা গ্রাম থেকে জেলা সদরে এসেছিলেন, তারা এখন সেখানেই আটকা। কোথাও যাওয়ার উপায় নেই। চিকিৎসার জন্য যারা হাসপাতালে এসেছিলেন, তারাও বাড়ি ফিরতে পারছেন না।
আমার এক প্রতিবেশী বাত্তারে সেনাবাহিনীর প্রশিক্ষণকেন্দরের দিকে যাওয়া একটি উদ্ধারকারী হেলিকপ্টারের কাছে দাঁড়িয়ে সেটিতে ওঠার জন্য অনুরোধ করছিলেন।
‘আমার চাচা-চাচি ভেসে গেছেন,’ তিনি বারবার বলছিলেন। ‘তাদের ফোন বন্ধ। নিজের বাড়িতে কী হচ্ছে, সেটাও জানি না।’
আমার বড় চাচির বড় ছেলে কাঠমান্ডুতে। এত দূর থেকে কিছুই করতে পারছেন না। ছোট ছেলে সবে বিদেশে কাজ করে ফিরেছিলেন। কিন্তু পানির স্রোত আসার আগে তিনি গ্রামে পৌঁছাতেই পারেননি।
ফোনে মানুষ আমাকে বলছিল, দৌড়ে প্রাণে বেঁচে যাওয়া শিশুদেরও বের করে আনা যাচ্ছে না। মা, ভাই ও ভাবিকে হারানোর শোক করার আগেই গ্রামে আটকে থাকা জীবিত মানুষগুলোকে উদ্ধার করতে হবে।
বন্যা শুধু গ্রামটাকেই কেড়ে নেয়নি। জেলা সদর যাওয়ার সড়কটিও নিয়ে গেছে। আর সেই সঙ্গে দেশের বাকি অংশের সঙ্গে যোগাযোগের পথও।
যে বাজার আমাদের প্রয়োজনীয় সবকিছু দিত, সেটি নেই। অর্থাৎ কেনাকাটারও আর কোনো জায়গা নেই। যে মাঠে আমরা ফসল ফলাতাম, সেটিও নেই। এমনকি পরিবারের ঘরে মজুত থাকা শস্যও এখন কাজে লাগানো যাচ্ছে না। কারণ সেই শস্য ভেঙে চাল বা আটা বানানোর কলগুলোও ভেসে গেছে।
২০২৪ বিক্রম সংবতে তৈরি ত্রিশূলীর ওপর পুরোনো সেতুটি—যে সেতু ধুঙ্গে ও ত্রিশূলী বাজারকে যুক্ত করত—নেই।
কয়েক বছর আগে তৈরি করা নতুন সেতুটিও নেই। ভেইন্সে সেতু নেই। নদীর ওপর থাকা প্রতিটি ঝুলন্ত সেতুই নেই। এর সঙ্গে জেলা সদরে পৌঁছানোর সব পথও যেন শেষ হয়ে গেছে।
বাগটার জেলা হাসপাতালটি খুব কাছে, অথচ এখন সেখানে পৌঁছানোই অসম্ভব। আরও দূরের ভৈরামকোট, সামারি, তোকসার, দেউরালি, কিসপাং, কাউলে, ভালছে, সালমে এবং ধাদিংয়ের সীমান্তের ওপারের থারপু—সব গ্রামই পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন।
পুরো রসুয়া জেলা সড়ক যোগাযোগব্যবস্থা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। যা কিছু অবশিষ্ট আছে, তা দেখে মনে হয় না, শিগগির এসব আবার গড়ে তোলা সম্ভব হবে।
এক গ্রামবাসী শোকভারাক্রান্ত কণ্ঠে আমাকে বললেন, ‘এখন কেউ অসুস্থ হলে মনে হয় বাড়িতেই মরতে হবে। তাকে হাসপাতালে নেবেন কীভাবে? সড়ক নেই। সেতু নেই। কোনো যানবাহন চলতে পারবে না।’
মানুষ এখন লবণও কিনতে পারছে না। এত মানুষ বাস্তুচ্যুত। এত মানুষ এখনো নিখোঁজ, পানির স্রোতে তাদের কোনো খোঁজ নেই।
যারা বেঁচে গেছেন, তাদের কী হবে, আমি জানি না।
প্রায় দেড় দিন আগে আমি গ্রামে পৌঁছানোর উদ্দেশ্যে রওনা হয়েছিলাম। এখন বিদুরের জেলা সদরে আটকে আছি। আর এগোতে পারছি না।
আমি বারবার নিজেকে প্রশ্ন করছি—আমার গ্রামকে আবার আমার গ্রামের মতো দেখতে কত দিন লাগবে?
কারও কাছে এর উত্তর নেই।
আমাদের কেউ কখনো এমন বন্যা দেখেনি। এত সবুজ একটি গ্রামকে কয়েক মিনিটের মধ্যে ধ্বংসস্তূপে পরিণত হতে দেখেনি কেউ।
বয়স্ক মানুষগুলো বারবার একই কথা বলছেন। যেন কথাটি বারবার বললে উত্তরটা বদলে যাবে—এই জায়গাটা কি আর কখনো আগের মতো হবে?
লেখক: কাঠমান্ডু পোস্টের সাংবাদিক।
কাঠমান্ডু পোস্ট থেকে অনূদিত।








