মানুষের সেবায় মহেববুলের ৫৪ বছর

মোহসিন হোমিও চেম্বারে মহেববুল ইসলাম
রংপুরের বদরগঞ্জ উপজেলা সদর থেকে ৯ কিলোমিটার উত্তর-পশ্চিমে মানসিংহপুর মণ্ডলপাড়া গ্রাম। রাধানগর ইউনিয়নের এই গ্রামে সকাল থেকেই মানুষের আনাগোনা বাড়তে থাকে। দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা এসব মানুষের গন্তব্য মহেববুল ইসলামের (৮০) বাড়ি। সেখানে আছে ‘মোহসিন হোমিও চেম্বার’। বাড়ি-লাগোয়া ৩০ শতক জায়গা জুড়ে এই চিকিৎসাকেন্দ্রের কারণে গ্রামটি পরিচিতি পেয়েছে ‘ডাক্তারপাড়া’ নামে। এখানে চিকিৎসা নিতে প্রতিদিন আসেন সহস্রাধিক মানুষ। শুধু চিকিৎসাসেবা নয়, বিভিন্নভাবে প্রায় ৫৪ বছর ধরে মানুষের পাশে দাঁড়াচ্ছেন মহেববুল ইসলাম।
মহেববুলের বাবা প্রয়াত মোহসেন আলী শিক্ষকতার পাশাপাশি এলাকার মানুষকে হোমিও চিকিৎসা দিতেন। সাধ্য অনুযায়ী অনেককে বিনামূল্যে ওষুধও দিয়েছেন।
মহেববুল ছাত্রজীবনে টিফিনের টাকা বাঁচিয়ে অসচ্ছল সহপাঠীদের খাতা-কলম কিনে দিতেন। গ্রামের অসুস্থ মানুষকে সহায়তা করতেন। ১৯৭২ সালে রংপুর সরকারি হোমিওপ্যাথিক মেডিকেল কলেজ থেকে ডিপ্লোমা ইন হোমিওপ্যাথিক মেডিসিন অ্যান্ড সার্জারি (ডিএইচএমএস) কোর্স সম্পন্ন করেন মহেববুল। ১৯৭৮ সালে বাবার মৃত্যুর পর গ্রামে বাড়ির পাশে তার নামে ‘মোহসেন হোমিও চেম্বার’ প্রতিষ্ঠা করে শুরু করেন বিনামূল্যে চিকিৎসাসেবা কার্যক্রম।
মানসিংহপুর মণ্ডলপাড়া গ্রামে গিয়ে দেখা যায়, মহেববুল ইসলামের বাড়ির পাশে চিকিৎসাকেন্দ্রের বাইরে মানুষের জটলা। ভেতরে কয়েকশ রোগী বসে আছেন।
চেম্বারের দায়িত্বপ্রাপ্তরা জানালেন, শুরুতে কয়েক বছর সম্পূর্ণ বিনামূল্যে চিকিৎসা ও ওষুধপত্র দেন মহেববুল। পরে খরচ সামলাতে না পেরে চেম্বারের বাইরে একটি বাক্স স্থাপন করেন। বিনা টাকায় চিকিৎসাসেবা ও ওষুধ নিয়ে চেম্বার ত্যাগ করার সময়ে সচ্ছল রোগীরা স্বেচ্ছায় বাক্সে টাকা ফেলতেন।
বর্তমানে ওষুধের দাম বৃদ্ধি এবং চেম্বারে কর্মচারীর সংখ্যা ও খরচ বেড়ে যাওয়ায় সচ্ছল রোগীদের কাছ থেকে ওষুধ বাবদ নেওয়া হচ্ছে সর্বোচ্চ ৩০ টাকা। এ টাকায় ওষুধ কেনাসহ চেম্বারের যাবতীয় ব্যয় বহন করা হচ্ছে। তবে তিনি কখনো রোগীদের কাছ থেকে ফি নেন না।
ঢাকা থেকে চিকিৎসা নিতে আসা লিটন ব্যাপারী ক্যানসারে আক্রান্ত। তিন মাস আগে তিনি প্রথম মহেববুলের কাছে চিকিৎসা নিয়ে অনেকটা সুস্থ বোধ করছেন। সম্পূর্ণ সুস্থ হওয়ার আশায় তিনি পুনরায় এসেছেন। কুড়িগ্রামের ভূরুঙ্গামারী থেকে আসা শহিদা বেগম বললেন, ‘কোমরের সমস্যার কারণে হাঁটতে পারতাম না। বছরখানেক ধরে এখানে চিকিৎসা নিয়ে এখন আমি ভালো হয়েছি, হাঁটতে পারি।’
এলাকার দরিদ্র মেধাবী শিক্ষার্থীদের স্কুল-কলেজে ভর্তিসহ বই, খাতা-কলম কিনে দিয়ে সবসময় সহযোগিতা করেন মহেববুল ইসলাম। আফতাবগঞ্জ দাখিল মাদ্রাসার শিক্ষক আব্দুল মাজেদ বললেন, ‘মহেববুল ইসলামের মতো পরোপকারী সাদা মনের মানুষ সমাজে বিরল। তিনি সর্বজন শ্রদ্ধেয় ব্যক্তি। সময় পেলে এলাকার বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে গিয়ে পড়াশোনার খোঁজ নেন। প্রয়োজনে আর্থিক সহায়তাও করেন।’
রাধানগর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আবু বক্কর সিদ্দিক বলেছেন, ‘মহেববুল ইসলাম এলাকার গর্ব। তাকে দেখে অনেক কিছু শেখার আছে।’
মহেববুল ইসলাম জানালেন, তার চেম্বারে প্রতিদিন গড়ে ১২০০ রোগী আসেন। এসব রোগী দেখার কাজে সহযোগিতা করেন ভাতিজা আদিবুল ইসলাম, ছেলে মোহতাদিউল ইসলাম এবং পুত্রবধূ সুমাইয়া জেসমিন। তিনজনই বাংলাদেশ সরকারি হোমিওপ্যাথিক কলেজ থেকে ডিএইচএমএস ডিগ্রিধারী। তিনি বললেন, ‘গ্রামের মানুষের জন্য কিছু করতে পেরে আনন্দ পাই। বাবার স্বপ্ন ও আমার পণ ছিল গ্রামে বসে মানবসেবামূলক কাজ করব। নিঃস্বার্থভাবে সেই কাজ করে জীবনের শেষ প্রান্তে এসে দাঁড়িয়েছি। কতটা করতে পেরেছি জানি না।’






