গুদাম ভেঙে সার নিয়ে যাওয়া বিরাট সতর্কবার্তা

খাদ্য মন্ত্রণালয়ের সাম্প্রতিক প্রশাসনিক অস্থিতিশীলতা ও মাঠ পর্যায়ে সারের তীব্র সংকট— এ দুটি ঘটনাকে পৃথকভাবে দেখার কোনো সুযোগ নেই। বাহ্যিকভাবে এদের ভিন্ন ক্ষেত্র মনে হলেও উভয়সংকটের মূল শিকড় এক ও অভিন্ন। আমাদের রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক ব্যবস্থায় নীতিনির্ধারণী স্থায়িত্বের যে অভাব রয়েছে, তারই প্রতিফলন ঘটছে দেশের কৃষি ও খাদ্য খাতে।
সম্প্রতি কুড়িগ্রামের ভূরুঙ্গামারীতে কৃষকদের ধলডাঙ্গা বাজারের একটি সরকারি গুদামের দরজা ভেঙে সার নিয়ে যাওয়ার ঘটনাটি সারা দেশের জন্য এক বিরাট সতর্কবার্তা। আইনগত ও সামাজিকভাবে কাজটিকে সমর্থন করা যায় না। কিন্তু এই অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনাটির পেছনে যে মনস্তাত্ত্বিক ও সামাজিক কারণ যদি আমরা গভীরভাবে উপলব্ধি না করি, তবে সংকটের সঠিক সমাধান কখনোই সম্ভব হবে না। কৃষকরা দিনের পর দিন ডিলারদের দরজায় ঘুরেছেন, লাইনে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করেছেন, অথচ সারের দেখা পাননি। একই সময়ে খোলাবাজারে কিংবা কালোবাজারে বস্তাপ্রতি বাড়তি টাকা দিলেই প্রচুর সার পাওয়া যাচ্ছে। এই অরাজক পরিস্থিতি কৃষকদের মনে চরম হতাশা ও অনিশ্চয়তার জন্ম দিয়েছে। রোপা আমনের এই ভরা মৌসুমে সঠিক সময়ে জমিতে সার দিতে না পারলে চারা বাড়বে না, পুরো আবাদ নষ্ট হবে এবং পরিবার-পরিজন নিয়ে কৃষকদের না খেয়ে মরতে হবে। গভীর ফ্রাস্ট্রেশন ও অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার মরিয়া চেষ্টা থেকেই মূলত কৃষকরা আইন ভাঙার মতো এমন চরম পথ বেছে নিতে বাধ্য হয়েছেন। এটি আমাদের সরকারি বিতরণ ব্যবস্থার প্রতি কৃষকদের পুঞ্জীভূত অনাস্থা ও গভীর ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ।
এ পরিস্থিতির মধ্যে সরকার ও কৃষি মন্ত্রণালয় থেকে দাবি করা হচ্ছে, দেশে সারের কোনো ঘাটতি নেই; বরং চাহিদার প্রায় পুরোটাই গুদামে মজুদ রয়েছে এবং কোনো কোনো ক্ষেত্রে সার উদ্বৃত্তও আছে। প্রশ্ন হচ্ছে, যদি জাতীয় পর্যায়ে সারের সরবরাহ ও স্টক ঠিক থাকে, তবে মাঠ পর্যায়ে গ্রামের কৃষকরা সার পাচ্ছেন না কেন? উত্তর হলো, সংকটটি সারের অপ্রতুলতার কারণে নয়; বরং এটি আমাদের বিতরণ ব্যবস্থার চরম ব্যর্থতা ও তদারকির অভাবের কারণে সৃষ্ট।
আমাদের দেশে সার একটি ভর্তুকিযুক্ত পণ্য। সরকার কোটি কোটি টাকা ভর্তুকি দিয়ে কৃষকদের বাঁচিয়ে রাখার জন্য সারের দাম কম রাখে। সরকার নির্ধারিত ডিলাররা বস্তাপ্রতি নির্দিষ্ট একটা ক্ষুদ্র কমিশন পান। এই সামান্য লাভে সন্তুষ্ট না থেকে তারা বাজারে কৃত্রিম সংকট তৈরি করেন। তারা সরকারি গুদাম থেকে সার তুলে সময়মতো বিতরণ করেন না কিংবা নিজ এলাকার বরাদ্দকৃত সার গোপন পথে অন্য এলাকায় বা কালোবাজারে বিক্রি করে দেন। সেখানে তারা নির্ধারিত দামের চেয়ে বস্তাপ্রতি ৩০০ থেকে ৭০০ টাকা পর্যন্ত বেশি দামে বিক্রি করতে পারেন। এটি ঠেকানোর জন্য জাতীয় পর্যায় থেকে শুরু করে জেলা-উপজেলা পর্যায়ে সারের বিতরণ তদারকির একটা সুনির্দিষ্ট কমিটি ও তদারকি কাঠামো বিদ্যমান রয়েছে। কিন্তু দুর্ভাগ্যের বিষয় হলো, সেই তদারকি কমিটিগুলো মাঠ পর্যায়ে একেবারেই কার্যকর ভূমিকা পালন করতে পারছে না। জাতীয় লেভেলে কোথায় কতটুকু স্টক আছে, সেই ডেটা হয়তো কম্পিউটারে দেখা যাচ্ছে; কিন্তু একজন ডিলারের দোকানে কতটুকু সার এলো এবং তা কৃষকের হাতে পৌঁছাল কিনা, সেই তথ্য সাধারণ মানুষের কাছে উন্মুক্ত নয়। এই স্বচ্ছতার অভাবের সুযোগ নিয়ে অসাধু চক্র ফায়দা লুটছে।
আসল শঙ্কার জায়গাটি কিন্তু আরও সামনে অপেক্ষা করছে। বর্তমান আমন মৌসুমের সংকটটি যদি আমরা দ্রুত সামাল দিতে না পারি, তবে সামনে যে বোরো মৌসুম আসছে সেখানে পরিস্থিতি ভয়াবহ আকার ধারণ করতে পারে
কোনো কোনো কৃষি কর্মকর্তা দায় এড়ানোর জন্য দাবি করছেন, কৃষকরা প্রয়োজনের তুলনায় দুই-তিন গুণ বেশি সার ব্যবহার করছেন বলেই সংকট তৈরি হচ্ছে। সংকটকালে কৃষকদের ওপর দায় চাপানোর এই মানসিকতা মোটেও গ্রহণযোগ্য নয়। কোন জমিতে কী পরিমাণে, কী মিশ্রণে এবং কোন সময় সার দিতে হবে— সেই বৈজ্ঞানিক জ্ঞান কৃষকদের মধ্যে ছড়িয়ে দেওয়ার দায়িত্ব তো কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের। এত বড় একটা ডিপার্টমেন্ট থাকা সত্ত্বেও যদি তারা কৃষকদের সারের সুষম ব্যবহার সম্পর্কে সচেতন করতে না পেরে থাকে, তবে তা কৃষকদের অপরাধ নয়; বরং কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের নিজেদেরই প্রাতিষ্ঠানিক ব্যর্থতা।
আমন মৌসুমে আমাদের উত্তর-পশ্চিমের উঁচু অঞ্চল, যেমন— রংপুর, দিনাজপুর, রাজশাহী, বগুড়া বা বরেন্দ্র অঞ্চলে সারের ব্যাপক ডিমান্ড থাকে। ফলে কোন অঞ্চলে কখন কতটুকু সার লাগবে, সেই সূক্ষ্ম আঞ্চলিক পরিকল্পনা ও ডিস্ট্রিবিউশন ম্যাপ মন্ত্রণালয় বা অধিদপ্তরের তৈরি করা অত্যন্ত জরুরি। যদি আঞ্চলিক চাহিদাকে ঠিকমতো অ্যাসেস না করে ঢালাওভাবে সার বিতরণ করা হয়, তবে এক জায়গায় সারের ঘাটতি দেখা দেবেই; অন্যদিকে উদ্বৃত্ত পড়ে থাকবে।
আসল শঙ্কার জায়গাটি কিন্তু আরও সামনে অপেক্ষা করছে। বর্তমান আমন মৌসুমের সংকটটি যদি আমরা দ্রুত সামাল দিতে না পারি, তবে সামনে যে বোরো মৌসুম আসছে, সেখানে পরিস্থিতি ভয়াবহ আকার ধারণ করতে পারে। কারণ, আমাদের দেশের মোট খাদ্য উৎপাদনের সিংহভাগই আসে বোরো ধান থেকে এবং সারা দেশে মোট ব্যবহৃত সারের প্রায় ৬০ শতাংশ একা বোরো মৌসুমেই দরকার হয়। নভেম্বর থেকেই বোরোর প্রস্তুতি শুরু হয়ে যায়। বর্তমানের আঞ্চলিক বা স্থানীয় সংকটগুলো যদি এখনই কঠোর প্রশাসনিক হস্তে দমন করা না হয়, তবে বোরো মৌসুমে পুরো দেশের কৃষি উৎপাদন মুখ থুবড়ে পড়বে।
অন্যদিকে, বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটও আমাদের জন্য ভীষণ বৈরী সংকেত দিচ্ছে। আন্তর্জাতিক বাজারে এরই মধ্যে সারের দাম বাড়তির দিকে। আমাদের দেশের প্রধান সারের উৎসগুলোর একটি ছিল চীন, বিশেষ করে ডিএপি সারের একটা বড় অংশ চীন থেকে আসত। কিন্তু অভ্যন্তরীণ চাহিদা মেটাতে চীন সার রপ্তানি বন্ধ করে দিয়েছে। এর পাশাপাশি ক্লাইমেট চেঞ্জ বা জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বিশ্বব্যাপী ‘এল নিনো’র প্রভাব স্পষ্ট হয়ে উঠছে, যা বৈশ্বিক কৃষি উৎপাদন কমিয়ে দেবে। বিশ্ববাজারে যদি খাদ্যের দাম ও সারের দাম একই সঙ্গে বেড়ে যায়, আর ঠিক সেই মুহূর্তে যদি আমাদের নিজেদের দেশের ভেতরের উৎপাদন ব্যাহত হয়, তবে পরিস্থিতি কতটা ভয়াবহ হতে পারে তা চিন্তা করলেও শিউরে উঠতে হয়। শ্রীলঙ্কায় ২০২২ সালে যে চরম অর্থনৈতিক ও খাদ্য সংকট আমরা দেখেছি, আমাদের যদি বোরো ও আমন উৎপাদন ভেঙে পড়ে, তবে সেই ধরনের সংকটের দিকে ধাবিত হতে বেশি সময় লাগবে না।
তাই এ মুহূর্তে সরকারের প্রধান ও একমাত্র অগ্রাধিকার হওয়া উচিত খাদ্য উৎপাদনে শতভাগ মনোযোগ দেওয়া। সংকটের আশু সমাধান হিসেবে অবিলম্বে জেলা-উপজেলা পর্যায়ের তদারকি কমিটিকে কঠোরভাবে সক্রিয় করতে হবে। ডিলারদের সারের স্টক ও বিক্রির তথ্য স্থানীয় পর্যায়ে টাঙিয়ে দিয়ে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে হবে। যেখানে সার অতিরিক্ত আছে, সেখান থেকে সারের ঘাটতি থাকা এলাকাগুলোতে অবিলম্বে রি-ডিস্ট্রিবিউশন বা পুনর্বণ্টন করতে হবে এবং অসাধু কালোবাজারিদের বিরুদ্ধে পদক্ষেপ নিয়ে সারের বাজার নিয়ন্ত্রণ করতে হবে।
দীর্ঘ মেয়াদে বোরো মৌসুমকে লক্ষ্য রেখে এখনই বিকল্প আন্তর্জাতিক বাজার থেকে সার আমদানির চুক্তি সম্পন্ন করতে হবে, যাতে বৈশ্বিক সরবরাহ বিঘ্নিত হলেও আমাদের দেশে তার প্রভাব না পড়ে। পাশাপাশি আমাদের বন্ধ সার কারখানাগুলো চালু করতে হবে। যেমন— আশুগঞ্জ সার কারখানায় অগ্রাধিকার ভিত্তিতে গ্যাস সরবরাহ নিশ্চিত করে উৎপাদন চালু করতে হবে। কৃষকের হাতে সার পৌঁছে দেওয়া নিশ্চিত করাই এখন রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তার সবচেয়ে বড় কাজ।
লেখক: অর্থনীতিবিদ এবং কৃষি ও খাদ্যনিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ







