বিনাবিচারে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে অনির্দিষ্টকাল আটকে রাখা বন্ধ করুন: এইচআরডব্লিউ

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
জুলাই গণঅভ্যুত্থানে পতন হওয়া কার্যক্রম স্থগিত আওয়ামী লীগ সরকারের সঙ্গে যুক্ত রাজনীতিবিদ ও অন্যদের দীর্ঘদিন বিনাবিচারে আটক রাখা বন্ধ করার আহ্বান জানিয়েছে হিউম্যান রাইটস ওয়াচ (এইচআরডব্লিউ)। এ বিষয়ে বাংলাদেশি কর্তৃপক্ষকে দ্রুত পদক্ষেপ নিতে অনুরোধ জানিয়েছে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাটি।
এইচআরডব্লিউ বলেছে, শেখ হাসিনা ২০২৪ সালের আগস্টে প্রধানমন্ত্রীর পদ ছাড়ার পর আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মী ও সমর্থকদের ব্যাপকভাবে আটক করা হয়। এখনো দলটির কয়েক শত মানুষ কারাগারে আছেন, যাদের বিরুদ্ধে কোনো অপরাধের অভিযোগ গঠন করা হয়নি।
সংস্থাটি বলেছে, আওয়ামী লীগ সরকারের গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের সঙ্গে কিছু কর্মকর্তা জড়িত থাকতে পারেন। তবে অনেককেই সরকারবিরোধী বিক্ষোভকারীদের হত্যার অভিযোগে কোনো স্পষ্ট প্রমাণ ছাড়াই গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
আটক ব্যক্তিদের পরিবার ও আইনজীবীরা বলেছেন, তাদের অনেকেই বয়স্ক। কারও কারও গুরুতর স্বাস্থ্য সমস্যা রয়েছে। কিন্তু তাদের জামিন ও প্রয়োজনীয় চিকিৎসার মতো মৌলিক অধিকারও দেওয়া হচ্ছে না।
সংস্থাটি জানিয়েছে, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান দায়িত্ব নেওয়ার পর ১০ জনেরও বেশি আওয়ামী লীগ নেতা-কর্মী কারাগারে মারা গেছেন। তাদের বেশির ভাগের বিরুদ্ধেই কোনো অপরাধের অভিযোগ গঠন করা হয়নি।
হিউম্যান রাইটস ওয়াচের এশিয়া অঞ্চলের পরিচালক ইলেইন পিয়ারসন বলেছেন, ‘এক সরকারের পর আরেক সরকার শত শত বিরোধী দলের সদস্যকে প্রমাণ ও যথাযথ আইনি প্রক্রিয়া ছাড়াই কারাগারে রেখেছে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সরকার সংস্কারের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। প্রথম পদক্ষেপ হিসেবে তার উচিত রাজনৈতিক বিরোধীদের দীর্ঘদিনের নির্বিচার আটক বন্ধ করা।’
এইচআরডব্লিউ বলেছে, সংস্কারের বদলে সরকার নতুন জাতীয় মানবাধিকার কমিশন বিল করেছে। বর্তমান রূপে বিলটি পাস হলে কমিশন নির্বিচার গ্রেপ্তারের অভিযোগ তদন্ত করতে পারবে না।
বিনা অভিযোগে আটক ব্যক্তিদের মধ্যে আওয়ামী লীগের সাবেক সংসদ সদস্য, হাসিনা সরকারের সমর্থক সাবেক আইনপ্রণেতা, কর্মী, কর্মকর্তা ও সাংবাদিকরা রয়েছেন। আবার নিরাপত্তা বাহিনীর কিছু সদস্যের বিরুদ্ধে বিচারবহির্ভূত হত্যা, নির্যাতন ও গুমের মতো গুরুতর আন্তর্জাতিক অপরাধের অভিযোগ রয়েছে। কারও বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগও রয়েছে।
এইচআরডব্লিউ বলেছে, যেসব মামলায় কোনো প্রমাণ উপস্থাপন করা হয়নি, সেসব মামলাতেও রাষ্ট্রপক্ষ বারবার জামিনের বিরোধিতা করছে। নিম্ন আদালত ও জেলা আদালত নিয়মিত জামিন নাকচ করছে। উচ্চ আদালত জামিন দিলেও নতুন মামলা দিয়ে অনেক সময় আটক ব্যক্তিদের মুক্তি ঠেকানো হচ্ছে।
এর উদাহরণ হিসেবে সাবেক প্রধান বিচারপতি এ বি এম খায়রুল হকের কথা উল্লেখ করেছে সংস্থাটি। ৮২ বছর বয়সী খায়রুল হককে ২০২৫ সালের ২৪ জুলাই এক বিক্ষোভকারীকে হত্যার অভিযোগে গ্রেপ্তার করা হয়।
পরের তিন মাসে তাকে আরও চারটি মামলায় গ্রেপ্তার দেখানো হয়। এর মধ্যে একটি ছিল দুর্নীতির মামলা। প্রতিটি মামলাতেই নিম্ন আদালত তার জামিন নাকচ করে। তার পরিবার হিউম্যান রাইটস ওয়াচকে জানিয়েছে, তিনি অসুস্থ ছিলেন এবং কারাগারে থাকাকালে হৃদ্রোগে আক্রান্ত হন।
উচ্চ আদালত তার জামিন মঞ্জুর করলেও নতুন মামলায় তাকে গ্রেপ্তারের আবেদন করে পুলিশ। ফলে তিনি মুক্তি পাননি। পরে আরও কয়েকটি মামলায় একই ঘটনা ঘটে।
খায়রুল হকের বিরুদ্ধে এক মামলায় অভিযোগ করা হয়, তিনি হত্যার সময় ঘটনাস্থলে ছিলেন। অথচ একই সময়ে তাকে অন্য একটি হত্যার মামলায় ১০ কিলোমিটারের বেশি দূরের অন্য একটি স্থানে থাকার অভিযোগ করা হয়েছিল।
পরে উচ্চ আদালত আবার তার জামিন মঞ্জুর করে। পুলিশও আবার নতুন মামলা করে। শেষ পর্যন্ত আপিল বিভাগের হস্তক্ষেপের পর ১৯ আগস্ট তিনি মুক্তি পান। এই পুরো সময়ে তার বিরুদ্ধে কোনো অপরাধের অভিযোগ গঠন করা হয়নি।
অন্য আটক ব্যক্তিদের আইনজীবীরা হিউম্যান রাইটস ওয়াচকে বলেছেন, তারা এখন অনেক সময় মক্কেলদের জামিন চাইতেও নিরুৎসাহিত করেন। কারণ জামিন হলে পুলিশ নতুন মামলা দিয়ে আবার তাদের আটক করে।
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে অভিযোগ গঠন ছাড়াই এক বছরের বেশি সময় কাউকে আটক রাখা যায়। তবে তা কেবল ‘ব্যতিক্রমী পরিস্থিতিতে’ করা যাবে এবং সেই কারণ লিখিতভাবে উল্লেখ করতে হবে।
এইচআরডব্লিউ বলেছে, ট্রাইব্যুনাল এখন পর্যন্ত আটক ১৬০ জনের বেশি কাউকেই জামিন দেয়নি। জামিন নাকচের বিরুদ্ধে তাদের আপিলের সুযোগও নেই।
সাবেক প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা ড. তৌফিক-ই-এলাহী চৌধুরীর বয়স ৮১ বছর। ২০২৪ সালের অক্টোবরে তাকে ট্রাইব্যুনাল প্রথম আটক করে। এখন পর্যন্ত তিনি ২২ মাস ধরে কোনো অভিযোগ ছাড়াই কারাগারে আছেন।
২০২৬ সালের এপ্রিলে তিনি জামিন চাইলেও ট্রাইব্যুনাল তা দেয়নি। একই সঙ্গে তাকে আটক রাখার কোনো ‘ব্যতিক্রমী পরিস্থিতির’ কথাও জানানো হয়নি। বরং মামলার শুনানি দুই দফা পিছিয়েছে। সর্বশেষ তা আগস্টের শেষ পর্যন্ত স্থগিত করা হয়েছে।
সাবেক সংসদ সদস্য কামাল আহমেদ মজুমদারও ২২ মাস ধরে ট্রাইব্যুনালের হেফাজতে আছেন। তার পরিবার হিউম্যান রাইটস ওয়াচকে জানিয়েছে, কারাগারে থাকাকালে তার পায়ে পচন ধরেছিল। তিনটি আঙুল কেটে ফেলতে হয়েছে। পড়ে গিয়ে তার কোমরেও আঘাত লাগে। জুলাইয়ে ট্রাইব্যুনাল তার জামিন নাকচ করেছে।
আটক ব্যক্তিদের অনেকেই প্রয়োজনীয় চিকিৎসা পাচ্ছেন না বলেও অভিযোগ করেছে তাদের পরিবার।
৭৫ বছর বয়সী শাহরিয়ার কবির দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন রোগে ভুগছেন এবং হুইলচেয়ারের প্রয়োজন হয়। তাকে মুক্তির দাবি জানিয়েছেন অধিকারকর্মীরা।
৭১ বছর বয়সী সাবেক মন্ত্রী রাম ওবায়দুল মুক্তাদির চৌধুরীও ২২ মাস ধরে কোনো অভিযোগ ছাড়াই আটক আছেন। তার গুরুতর হৃদ্রোগ রয়েছে।
সাবেক আওয়ামী লীগ সংসদ সদস্য রমেশ চন্দ্র সেনের বয়স ছিল ৮৫ বছর। ২০২৪ সালের আগস্টে তিনটি হত্যা ও একটি বিস্ফোরক মামলায় তাকে গ্রেপ্তার করা হয়। ২০২৬ সালের ৭ ফেব্রুয়ারি কারাগারেই তার মৃত্যু হয়।
তার পরিবার জানিয়েছে, তিনি প্রয়োজনীয় ওষুধ পাননি এবং তার জামিনও দেওয়া হয়নি।
একই ধরনের অভিযোগ রয়েছে জামালপুর জেলা আওয়ামী লীগের নেতা এস এম জিয়াউল হক জিয়ার মৃত্যুর ক্ষেত্রেও। ৬৫ বছর বয়সী জিয়াউল হক আগে থেকেই অসুস্থ ছিলেন। ৬ জানুয়ারি তাকে আটক করা হয়। পরে জামিন না পেয়ে ১৪ এপ্রিল কারাগারে তার মৃত্যু হয়।
হিউম্যান রাইটস ওয়াচ বলেছে, আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইনে বিচার শুরুর আগে কাউকে আটক রাখা বা শর্তসাপেক্ষে মুক্তি দেওয়ার সুযোগ রয়েছে। তবে এটি নিয়ম নয়, ব্যতিক্রম হওয়া উচিত।
প্রতিটি আটক ব্যক্তির ক্ষেত্রে একজন বিচারককে তার আটকের বৈধতা ও প্রয়োজনীয়তা পর্যালোচনা করতে হবে। আটক ব্যক্তির দ্রুত বিচার পাওয়ার অধিকার রয়েছে। অন্যথায় তাকে মুক্তি দিতে হবে।
সংস্থাটি আরও বলেছে, বিচার শুরুর আগে আরোপ করা যেকোনো বিধিনিষেধ ব্যক্তিস্বাধীনতা, নির্দোষ হিসেবে বিবেচিত হওয়ার অধিকার এবং সমতার অধিকারের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হতে হবে।
ইলেইন পিয়ারসন বলেছেন, ‘যে বিচারব্যবস্থায় বয়স্ক মানুষ অভিযোগ গঠনের আগেই কারাগারে মারা যান, সেখানে বিচার শুরুর আগে আটক রাখাকে যে ব্যতিক্রমী ব্যবস্থা হিসেবে দেখা উচিত, তা মানা হচ্ছে না।’
তিনি আরও বলেছেন, ‘বাংলাদেশ সরকারের উচিত তাদের আমলে কারাগারে ঘটে যাওয়া সব মৃত্যুর বিষয়ে স্বাধীন তদন্তের নির্দেশ দেওয়া। একই সঙ্গে অভিযোগ ছাড়াই দীর্ঘ সময় মানুষকে নির্বিচারে আটক রাখা বন্ধ করা উচিত।’




