পরিচালকদের ২ লাখ কোটি টাকা ঋণে ৪২ ব্যাংকের হাঁসফাঁস

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
তারা সবাই বেসরকারি ব্যাংকের পরিচালক। বেশ প্রভাবশালী। সংখ্যায় ৫০০। বিধিবিধানের তোয়াক্কা করেন না। প্রভাব খাটিয়ে ঋণ নিয়েছেন ২ লাখ ৮ হাজার কোটি টাকা। কেউ কেউ মাঝেমধ্যে কিস্তি দেন, আবার অনেকে দেনই না। আইনের নানা ফাঁকফোকরে সামান্য টাকা জমা দিয়ে খেলাপি থেকে নিজেকে মুক্ত রাখেন। এরপর আবার ঋণ নেন। বেড়ে যায় এর অঙ্ক। তাদের দাপট সব সরকারেই। কিছুটা কমেছিল অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে। এরপর আবার লাগামহীন। অসহায় ব্যাংক এমডিরা (ব্যবস্থাপনা পরিচালক)। এমনকি সবকিছু জানে কেন্দ্রীয় ব্যাংক ও অর্থ মন্ত্রণালয়ও। কিন্তু নেই কার্যকর ব্যবস্থা। শুধু তা-ই নয়, প্রকাশ হওয়া সরকারি প্রতিবেদনে এখন আর থাকে না এসব ঋণের তথ্য। বাংলাদেশ ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে এবং পরিচালকদের ঋণের নথি বিশ্লেষণ করে পাওয়া গেছে এমন চাঞ্চল্যকর তথ্য।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য বলছে, বিধান অনুযায়ী, একজন পরিচালক একটি ব্যাংকের শেয়ার কিনতে পারেন ২ থেকে ১০ শতাংশ পর্যন্ত। বর্তমান ব্যাংকগুলোর পরিশোধিত মূলধন সাধারণত ৫০০ কোটি টাকা। সেই হিসাবে সর্বোচ্চ ৫০ কোটি টাকা মূল্যের শেয়ার নিতে পারবেন। আর যেকোনো ব্যাংক থেকে পরিচালকের ঋণ নেওয়ার সীমা হচ্ছে নিজস্ব শেয়ারের সর্বোচ্চ ৫০ শতাংশ। অর্থাৎ ২৫ কোটি টাকার বেশি ঋণ নিতে পারবেন না। ৪২টি বেসরকারি ব্যাংকের ৫০০ পরিচালক যদি ঋণ নিয়ে থাকেন, এর অঙ্ক দাঁড়াবে সর্বোচ্চ ১২ হাজার ৫০০ কোটি টাকা। যদিও এ মুহূর্তে পরিচালকদের ঋণের অঙ্ক দাঁড়িয়েছে ২ লাখ ৮ হাজার কোটি টাকা, যা সম্পূর্ণ বেআইনি— এমন মন্তব্য বিশেষজ্ঞদের।
তাদের অভিমত, পরিচালকদের একটি বড় অংশ কৌশলে নিজের ব্যাংক ছাড়াও অন্য ব্যাংক থেকে মোটা অঙ্কের ঋণ নিয়েছেন। যার সর্বোচ্চ রেকর্ড সৃষ্টি হয়েছিল আওয়ামী লীগ আমলে। তখন (২০২৪ সালের জুন পর্যন্ত) ব্যাংক পরিচালকদের ঋণ ছিল ২ লাখ ৩৫ হাজার কোটি টাকা। আর অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে (২০২৫ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত) পরিচালকদের ঋণ কমে দাঁড়ায় ২ লাখ ৭ হাজার কোটি; কিন্তু ২০২৫ সালের জুন থেকে ফের ঊর্ধ্বমুখী হয় ঋণের ধারা, যা বর্তমান সরকার গঠনের পর গত জুনে মাত্র ৪২টি ব্যাংকের কাছে ঋণ দাঁড়িয়েছে ২ লাখ ৮ হাজার কোটি টাকা।
বাণিজ্যিক ব্যাংকের অন্তত ১২ জন এমডি প্রায় একই ধরনের তথ্য দিয়ে আগামীর সময়কে বললেন, ব্যাংকের পরিচালকদের ঋণ বিতরণ ও তার ব্যবহারে জবাবদিহি নিশ্চিত করতে পারছে না ব্যাংকগুলো। এই পরিচালকরা ব্যবসায়ী, তারাই আবার ব্যাংকের উদ্যোক্তা। নির্বিঘ্নে ঋণ নেন ও খেলাপি হন, আবার কৌশলে ঋণও নেন। এ যেন একরকম ‘স্থায়ী সংস্কৃতি’ হয়ে দাঁড়িয়েছে, যা অবৈধ হওয়ার পরও চলছে বছরের পর বছর। এটা ব্যাংক ও অর্থনীতির জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর। কেন্দ্রীয় ব্যাংক পরিচালকদের ঋণ ও খেলাপির বিষয়ে নজর দিচ্ছে না। আইন থাকার পরও পরিচালকরা ঋণ পরিশোধ করছেন না। এরপরও বাধ্য হয়েই নির্বাহীরা অসহায়ভাবে পরিচালকদের ঋণ অনুমোদন করেন। এতে স্পষ্ট অনুমান করা যায়, দেশের আইনের চেয়ে শক্তিশালী ব্যাংক পরিচালকরা। তাদের হাতে বাড়তি ঋণ থাকায় অন্যরা ঋণ পাচ্ছেন না। এর সমাধান হতে পারে একমাত্র রাজনৈতিক সদিচ্ছায়।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের অর্থ উপদেষ্টা ও বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ আগামীর সময়কে বললেন, ‘ব্যাংক পরিচালক স্বাভাবিকভাবে প্রভাবশালী। তাদের কাছে অনেক ঋণ আটকা। এই বিপুল পরিমাণ ঋণ আদায়ে মূল দায়িত্ব পালন করতে হবে ব্যাংককে। পরিচালক হলে সব মাফ করতে হবে, তা নয়। আর ব্যাংকের প্রধান নির্বাহীর কাজ হবে অসহায়ত্ব না দেখিয়ে ব্যাংকের চেয়ারম্যানের সঙ্গে কথা বলা। সেখানে সমাধান না পাওয়া গেলে ঋণ আদায়ে উপায় চাইতে হবে বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে। বাংলাদেশ ব্যাংক চাইলে উপায় বের করতে পারে। তখন একটা ফলাফল আসবে। সেখানে তো সব ক্ষমতা দেখানো বা চর্চা করা যায় না।’
পরিচালকদের ঋণের খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ব্যাংক খাতে সংকটের শুরুটা ২০১৩ সালে। ওই সময় রাজনৈতিক বিবেচনায় অন্তত ৯টি ব্যাংক অনুমোদন পায়। এসব ব্যাংকের অধিকাংশ পরিচালক ২০১৪ সালে আওয়ামী লীগ সরকার গঠনের পর ব্যাংকে অবৈধ প্রভাব বিস্তার শুরু করেন। যদিও এস আলম, সালমান এফ রহমান, নজরুল ইসলাম মজুমদার, জয়নুল হক সিকদার চক্র আরও আগে থেকে ব্যাংক খাতে মাফিয়া হিসেবে পরিচিতি পায়। তবে ২০১৭ সালে এস আলমের ইসলামী ব্যাংক জবরদখলের মাধ্যমে ব্যাংক লুটপাটের শঙ্কা সৃষ্টি হয়। তখন থেকে ব্যাংক পরিচালকরাও বেপরোয়া হতে থাকেন। এক পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, ২০১৬ সালে পরিচালকদের ঋণ ছিল মাত্র ৯০ হাজার কোটি টাকা, যা ১০ বছর পর গত জুনে গিয়ে দাঁড়িয়েছে ২ লাখ ৮ হাজার কোটিতে।
তথ্য অনুযায়ী, নিজ ব্যাংকের পরিচালকদের ঋণ দেওয়া ব্যাংকগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো— পূবালী, ইউনাইটেড কমার্শিয়াল, ব্যাংক এশিয়া, শাহ্জালাল ইসলামী, ডাচ্-বাংলা, প্রাইম, ঢাকা ব্যাংক, ব্যাংক এশিয়া, সাউথইস্ট, ব্র্যাক, সিটি ব্যাংক, ইস্টার্ন ব্যাংক, এবি ব্যাংক, স্ট্যান্ডার্ড ব্যাংক, প্রিমিয়ার, সাউথ বাংলা অ্যাগ্রিকালচার অ্যান্ড কমার্স (এসবিএসি)।
এ ছাড়া অন্য ব্যাংকের পরিচালকদের ঋণ দিয়েছে এমন ব্যাংকের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো— পূবালী, ইউনাইটেড কমার্শিয়াল, শাহ্জালাল ইসলামী, ডাচ্-বাংলা, প্রাইম, ঢাকা ব্যাংক, ব্যাংক এশিয়া, সাউথইস্ট, ব্র্যাক, সিটি ব্যাংক, ইস্টার্ন ব্যাংক, সাউথ বাংলা অ্যাগ্রিকালচার অ্যান্ড কমার্স।
সম্প্রতি বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর মো. মোস্তাকুর রহমানের সঙ্গে ব্যাংক মালিকদের সংগঠন বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকস (বিএবি) নেতারা সাক্ষাৎ করেন। তখন খেলাপি আদায়ে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার তাগিদ দেন গভর্নর। পাশাপাশি পরিচালকদের ঋণ নেওয়ার বিষয়টি নজরে আনেন। এক্ষেত্রে ব্যাংক পরিচালনায় নীতিমালা যথাযথভাবে মেনে চলার নির্দেশ দিয়েছেন তিনি।
এ প্রসঙ্গে বিএবির প্রধান ও ঢাকা ব্যাংকের চেয়ারম্যান আব্দুল হাই সরকার আগামীর সময়কে বলেছেন, ‘এখন ব্যাংক ব্যবস্থাপনায় পরিবর্তন এসেছে। পরিচালকরা ব্যাংক খাতের উন্নয়নে সাধ্যমতো চেষ্টা করে যাচ্ছেন। ঋণ ব্যবস্থাপনা নিয়ম অনুযায়ী চলছে। যথাযথ নিয়ম মেনে যাচাই-বাছাই করেই ঋণ বিতরণ করা হয়। সেক্ষেত্রে পরিচালকদের ঋণ পেতে কোনো সমস্যা হওয়ার কথা নয়। ঋণ পাওয়া তো দোষের কিছু নয়। ব্যাংক কোম্পানি আইনে সেটি সুনির্দিষ্টভাবে বলা আছে।’
বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. মোস্তফা কে মুজেরী বলেছেন, ‘ব্যাংক পরিচালকরা প্রয়োজনে ঋণ নিতে পারেন। তারাও সাধারণ গ্রাহকের মতো শর্ত ও বন্ধকি সম্পদ রেখে ঋণ নেবেন। ব্যাংকের উচিত ঋণের মানদণ্ড মেনে চলা। কোনো বাড়তি সুযোগ-সুবিধা দেওয়া উচিত নয়। আর বিশেষ যোগসাজশ বা আঁতাতের মাধ্যমে শর্ত মেনে ঋণ বিতরণ না করলে আগের মতো সংকট দেখা দেবে, যা এখনো রয়ে গেছে। মানুষের আস্থা কমে গেছে ব্যাংকের ওপর। এখন সময় এসে গেছে এরকম অপসংস্কৃতি থেকে বের হওয়ার। কেননা, চিহ্নিত কিছু গোষ্ঠী ব্যাংক থেকে টাকা হাতিয়ে নিয়েছে। তারাই আবার ব্যাংকের মালিক। আর ব্যাংক পরিদর্শনে যা আসবে, সে অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া নিয়ন্ত্রক সংস্থার দায়িত্ব।’
বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র ও নির্বাহী পরিচালক আরিফ হোসেন খান বলেছেন, ‘ব্যাংক পরিচালকরা প্রয়োজনে ঋণ নিতে পারেন। কিন্তু সীমা অতিক্রম করার সুযোগ নেই। এত টাকার ঋণ মালিকদের কাছে গেল কীভাবে? নিয়ম অনুযায়ী তাদের কাছে এত টাকা থাকার সুযোগ আছে কি না, তা খতিয়ে দেখা উচিত। আর খেলাপিরা তো পরিচালক থাকতে পারেন না। ব্যাংকগুলো কেন ব্যবস্থা নেয় না। এভাবে কতদিন চলবে। এর একটা সুরাহা দরকার।’
অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের (এফআইডি) সচিব নাজমা মোবারেক বলেছেন, ‘বাংলাদেশ ব্যাংক মূলত সব ব্যাংকের নিয়ন্ত্রক সংস্থা। অর্থাৎ ব্যাংক পরিচালনা, নজরদারি, পরিচালক ঋণ— সবই দেখভাল করবে বাংলাদেশ ব্যাংক। আমরা বেসরকারি ব্যাংকের পরিচালকদের ঋণ দেখি না। তাদের ঋণের তথ্য আমাদের কাছে আসে না। তবে বাংলাদেশ ব্যাংক যদি চায়, আমরা আইন মেনে ব্যবস্থা নিতে নির্দেশ দেব।’






