চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ড: এইচএসসি পরীক্ষা ২০২১
১২ কোটি টাকার বিনিময়ে ১২০০ শিক্ষার্থীর ফল বদল!
- চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ড জিপিএ ৫ বিক্রির দোকানে পরিণত হয়েছিল: তৎকালীন ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান অধ্যাপক আবদুল আলীম
- একেকজন থেকে সর্বোচ্চ ৪ লাখ, সর্বনিম্ন ৫০ হাজার টাকা করে নিয়েছিলেন: তদন্ত কমিটির প্রধান

ফাইল ছবি
ছেলের ফল জালিয়াতির আগে ২০২১ সালের এইচএসসি পরীক্ষায়ও একই অভিযোগ উঠেছিল চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডের পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক ও পরবর্তীকালে সচিব নারায়ণ চন্দ্র নাথের বিরুদ্ধে। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের গঠিত তদন্ত কমিটি নারায়ণসহ দুজনের বিরুদ্ধে অভিযোগের ভয়াবহতার প্রমাণ পায়। শাস্তির সুপারিশ করে প্রতিবেদনও দিয়েছিল। কিন্তু মন্ত্রণালয় শাস্তির পরিবর্তে ঘটনাটিই ধামাচাপা দেয়। এতে আরও বেপরোয়া হয়ে ওঠেন শিক্ষা বোর্ডের এই কর্মকর্তা। পরের বছর জালিয়াতির মাধ্যমে নিজের ছেলের ফলই পাল্টে দিয়েছেন তিনি।
তদন্ত কমিটির প্রধান পটিয়া সরকারি কলেজের তৎকালীন অধ্যক্ষ মোহাম্মদ মোজাম্মেল হক আগামীর সময়কে বললেন, ‘২০২১ সালের এইচএসসি পরীক্ষার টোটাল রেজাল্ট নিয়ে অসংগতি পাওয়া যায়। এর মধ্যে ১ হাজার ২০০ পরীক্ষার্থীর ফল নিয়ে জালিয়াতির অভিযোগ উঠেছিল। আমরা সব উত্তরপত্র ম্যানুয়ালি স্ক্যানিং করেছিলাম। নম্বর পাল্টে নেওয়া কয়েকজন পরীক্ষার্থীর বক্তব্য গ্রহণ করি। তারা পরীক্ষা নিয়ন্ত্রককে একেকজন সর্বোচ্চ ৪ লাখ, সর্বনিম্ন ৫০ হাজার টাকা করে দিয়েছিল বলে আমাদের জানিয়েছে। কিন্তু পরবর্তীকালে ফলাফল নিয়ে জটিলতার আশঙ্কায় পরীক্ষার্থী কিংবা তাদের অভিভাবক কেউ প্রকাশ্য সাক্ষ্য দেননি। তবে আমরা প্রাপ্ত নম্বর পাল্টে ফেলার বিষয়টি প্রতিবেদনে উল্লেখ করেছিলাম।’
প্রতিজন থেকে যদি গড়ে এক লাখ করে নেওয়া হয়, তাহলে ১ হাজার ২০০ শিক্ষার্থীর কাছ থেকে অন্তত ১২ কোটি টাকা নিয়েছেন পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক। টাকার বিনিময়ে এত বিপুল শিক্ষার্থীর ফল বদলে দেওয়ার ঘটনা দেশের ইতিহাসে নজিরবিহীন। ক্ষমতার প্রভাব দেখানো ও সংবাদমাধ্যকে হাতে রাখতে কয়েকজন সিনিয়র সাংবাদিকের সন্তানদের ফলাফলেও ব্যাপক জালিয়াতির আশ্রয় নেওয়া হয় বলে অভিযোগ রয়েছে।
পাবলিক পরীক্ষা আইন অনুযায়ী, উত্তরপত্রের নম্বর পাল্টে দেওয়ার জন্য সর্বোচ্চ পাঁচ বছরের সাজার বিধান রয়েছে।
তদন্ত প্রতিবেদনের বিষয়ে নারায়ণ চন্দ্র নাথের সঙ্গে ফোন, এসএমএসে অসংখ্যবার যোগাযোগ করেও তার মতামত জানা সম্ভব হয়নি।
২০২১ সালে অনুষ্ঠিত এইচএসসি পরীক্ষার ফল প্রকাশ হয়েছিল পরের বছরের ১৩ ফেব্রুয়ারি। সে সময় চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডের সচিব ও ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান হিসেবে অধ্যাপক আবদুল আলীম এবং পরীক্ষা নিয়ন্ত্রকের দায়িত্বে ছিলেন নারায়ণ চন্দ্র নাথ। ফল প্রকাশের আগে প্রত্যেক বোর্ডের চেয়ারম্যানের সশরীরে উপস্থিত হয়ে প্রধানমন্ত্রীর হাতে সেটা তুলে দেওয়ার রীতি প্রচলিত আছে।
চেয়ারম্যান আবদুল আলীম ঢাকায় প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে থাকা অবস্থায় ফলাফল নিয়ে বিভিন্ন অসংগতির তথ্য পেতে শুরু করেন। তিনি বিষয়টি তৎকালীন শিক্ষা উপমন্ত্রী মহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেলকে জানান। উপমন্ত্রীর নির্দেশে তিনি চট্টগ্রামে ফিরে পাঁচলাইশ থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেন এবং অধ্যাপক মোহাম্মদ মোজাম্মেল হককে প্রধান করে তিন সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি করেন।
২০২২ সালের ৩ মার্চ চেয়ারম্যানের কাছে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেয় কমিটি। কিন্তু প্রভাবশালীদের চাপে সেই প্রতিবেদন ধামাচাপা পড়ে যায়। সম্প্রতি চার পৃষ্ঠার এ তদন্ত প্রতিবেদন আগামীর সময়ের হাতে আসে।
ফলাফলে অসংগতির চিত্র তুলে ধরে প্রতিবেদনে বলা হয়, ফল প্রকাশের পর সকালে পরীক্ষার্থীরা একরকম নম্বর দেখতে পায়। বিকালে পুরো নম্বরের ফরম্যাট পরিবর্তন হয়ে যায়। এতে পরীক্ষার্থী ও অভিভাবকরা আতঙ্কিত হয়ে বোর্ডে যোগাযোগ শুরু করলে বিষয়টি সামনে আসে।
প্রতিবেদনে বলা হয়, তদন্ত কমিটি চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডের সিসিটিভি ফুটেজ পর্যবেক্ষণ করে। ২০২২ সালের ১ ফেব্রুয়ারি থেকে তদন্ত প্রতিবেদন লেখার আগপর্যন্ত চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডের প্রবেশপথের ক্যামেরার রেকর্ডিং বন্ধ ছিল। ১৩ ফেব্রুয়ারি ফল প্রকাশের পর দুপুর ২টা ১১ মিনিটে পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক ও আইটি টিমের সদস্যদের ফল প্রসেসিং কক্ষের কম্পিউটারে বসে কাজ করতে দেখা যায়। ওইদিন রাত ৭টা ৫৯ মিনিটে শুধু আইটি টিমের সদস্যদের একইভাবে কাজ করতে দেখা যায়। যার জন্য ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কোনো অনুমতি নেওয়া হয়নি।
যথাযথ প্রক্রিয়া অনুসরণ না করে পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক নারায়ণ চন্দ্র নাথ ও সিস্টেম অ্যানালিস্ট কিবরিয়া মাসুদ খান চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডের পুরো ফল প্রসেসিংকে প্রশ্নবিদ্ধ করে ফেলেন বলে প্রতিবেদনে বলা হয়। এ বিষয়ে তদন্ত কমিটিকে সিস্টেম অ্যানালিস্ট কিবরিয়া মাসুদ খান বলেছিলেন, ফল প্রকাশের পর পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক নিজে আইটি কক্ষে গিয়ে ফলাফল সংশোধন প্রক্রিয়া সম্পন্ন করেন। ওইদিন সন্ধ্যা সাড়ে ৭টা থেকে থেকে ৮টার মধ্যে পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক তাদের জানান, একজন পরীক্ষার্থী পদার্থবিজ্ঞানে ২০০ নম্বরের পরীক্ষায় ২০৮ নম্বর পেয়েছে। পর্যবেক্ষণে দেখা যায়, তাকে ২০ নম্বরের পরীক্ষায় ২৮ নম্বর দেওয়া হয়েছে। এ ধরনের আরও কিছু ত্রুটিবিচ্যুতি সংশোধন করা হয়।
তদন্ত কমিটির কাছে দেওয়া বক্তব্যে নারায়ণ চন্দ্র নাথ জানিয়েছিলেন, তিনি অত্যন্ত ক্লান্ত ও পরিশ্রান্ত থাকায় ফল প্রকাশের পর পরীক্ষার্থীর নম্বর পরিবর্তন কিংবা ফলাফলের অসংগতি পরিবর্তনের জন্য কারও কোনো অনুমতি ও নির্দেশনা নেননি।
তদন্ত করতে গিয়ে বিভিন্ন অপপ্রচার, হুমকি-ধমকি ও রোষানলের শিকার হয়েছিলেন বলে জানালেন কমিটির প্রধান অধ্যাপক মোহাম্মদ মোজাম্মেল হক। তিনি বললেন, ‘তদন্ত বন্ধ করার জন্য নারায়ণ চন্দ্র নাথ হাইকোর্টে রিট করেছিলেন; কিন্তু কোর্ট সেটা খারিজ করে দেন। এরপর আমাকে জামায়াত ট্যাগ দেওয়া হয়। আমার ছেলেকে তুলে নিয়ে মেরে ফেলবে বলে ১৫-২০ দিন ধরে অনবরত হুমকি দেওয়া হয়। আমার জীবনটা তারা জাহান্নাম বানিয়ে ফেলেছিল। আমি বাধ্য হয়ে একটি গোয়েন্দা সংস্থার শরণাপন্ন হয়েছিলাম। মন্ত্রণালয় থেকে একজন যুগ্ম সচিব তদন্ত প্রতিবেদনের বিষয়ে আমাকে বললেন, আমি সরকারের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করেছি। তখন নারায়ণ চন্দ্র নাথের সঙ্গে শিক্ষা উপমন্ত্রীর ওঠাবসা। বড় বড় সাংবাদিকের সঙ্গে তার ওঠাবসা। এ অবস্থায় ১ হাজার ২০০ শিক্ষার্থীর উত্তরপত্র মূল্যায়ন করে ফল জালিয়াতির তথ্য উদঘাটন করা চাট্টিখানি কথা নয়। অনেক প্রতিকূল অবস্থার সম্মুখীন আমাকে হতে হয়েছে।’
চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডের তৎকালীন ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান অধ্যাপক আবদুল আলীম আগামীর সময়কে বললেন, ‘চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ড জিপিএ ৫ বিক্রির দোকানে পরিণত হয়েছিল। এতে বোর্ডের ভাবমূর্তি ব্যাপকভাবে ক্ষুণ্ন হয়। আমরা বিব্রত হয়েছিলাম। কিন্তু অদৃশ্য কারণে শিক্ষা মন্ত্রণালয় এর জন্য দায়ী পরীক্ষা নিয়ন্ত্রকের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ করেনি।’
তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেওয়ার পর ২০২২ সালের ২৫ জুলাই চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডের তৎকালীন সচিব অধ্যাপক মুস্তফা কামরুল আখতার শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সচিবকে চিঠি দিয়ে জানিয়েছিলেন, ফলাফলে অসংগতির বিষয়ে দায়িত্ব পালনে অবহেলার অভিযোগ তদন্তে প্রমাণ হওয়ায় সিস্টেম অ্যানালিস্ট কিবরিয়া মাসুদ খানের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।
তদন্ত প্রতিবেদনে অসংগতির পুরো দায় পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক নারায়ণ চন্দ্র নাথকে দেওয়া হয়েছে। শিক্ষা মন্ত্রণালয় ৩১ মার্চ এ বিষয়ে তাকে শোকজ করে। ক্যাডার কর্মকর্তা হওয়ার তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার বিষয়টি মন্ত্রণালয়ের এখতিয়ারভুক্ত বলে এক চিঠিতে উল্লেখ করা হয়। কিন্তু পরে সেই জালিয়াতি ধামাচাপা দিয়ে ছয় মাসের মধ্যে নারায়ণ চন্দ্র নাথকে সহযোগী অধ্যাপক থেকে অধ্যাপক পদে পদোন্নতি দেওয়া হয়। তিনি ২০২৩ সালে চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডের সচিব হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন। ওই বছর তার ছেলে নক্ষত্র দেবনাথ এইচএসসি পরীক্ষার্থী ছিল।
আগেরবার পার পেয়ে ছেলের ফল নিয়ে আরও মারাত্মক জালিয়াতি করে বসেন নারায়ণ। ছেলে নক্ষত্র টেনেটুনে পাস করেছিল। কিন্তু রচনামূলক ও নৈর্ব্যক্তিক মিলিয়ে ১৪টি উত্তরপত্রে সর্বনিম্ন ২ থেকে সর্বোচ্চ ২৪ নম্বর পর্যন্ত বাড়িয়ে দিয়ে তাকে ‘এ প্লাস’ পাইয়ে দেন।
শিক্ষা বোর্ডের তৎকালীন কয়েকজন কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, শিক্ষামন্ত্রী মহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেলের আশীর্বাদে ছেলেকে নিয়ে জালিয়াতির ঘটনাও নারায়ণ চন্দ্র ধামাচাপা দিয়ে ফেলতে সক্ষম হয়েছিলেন। কিন্তু নক্ষত্রের ফলাফল নিয়ে কে বা কারা পুনর্নিরীক্ষণের জন্য শিক্ষা বোর্ডে আবেদন করলে ঘটনা উল্টে যায়। এর মধ্যে নারায়ণের স্ত্রী বনশ্রী দেবনাথ নগরীর পাঁচলাইশ থানায় পুনর্নিরীক্ষণ আবেদনের বিরুদ্ধে সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেন। এতে সন্দেহ আরও জোরালো হলে নারায়ণকে শিক্ষা বোর্ড থেকে সরিয়ে দিতে বাধ্য হয় মন্ত্রণালয়। তবে তাকে মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা (মাউশি) বিভাগের চট্টগ্রামের পরিচালক পদে বসানো হয়।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট গণআন্দোলনে আওয়ামী লীগ সরকারের পতন হলে চিত্র পাল্টে যায়। ২৩ সেপ্টেম্বর নারায়ণ চন্দ্রকে জালিয়াতির অভিযোগে ওএসডি করা হয়। নক্ষত্রের ফল বাতিল করা হয়। ২০২৫ সালের ২১ জানুয়ারি চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডের তৎকালীন সচিব অধ্যাপক ড. এ কে এম সামছু উদ্দিন আজাদ নগরীর পাঁচলাইশ থানায় চারজনের বিরুদ্ধে মামলা করেন। ১৭ জুন আদালতে আত্মসমর্পণের পর নারায়ণ চন্দ্রকে কারাগারে পাঠানো হয়। বর্তমানে তিনি জামিনে আছেন।
চলতি বছর ১৮ আগস্ট নারায়ণ চন্দ্র ও নক্ষত্রসহ চারজনকে আসামি করে পুলিশ আদালতে অভিযোগপত্র দেয়। বাকি আসামিরা হলেন সাবেক সিস্টেম অ্যানালিস্ট কিবরিয়া মাসুদ খান ও সাবেক চেয়ারম্যান মুস্তফা কামরুল আখতার।






