দুর্গম চরে প্রসূতির ভরসা রিমা

পটুয়াখালীর গলাচিপার চরকাজল ও চরবিশ্বাস। এই দ্বীপ ইউনিয়ন দুটিতে হাজারো পরিবারের বসতি। খেয়েপরে কোনোরকম বেঁচে থাকলেও স্বাস্থ্যসেবা তাদের কাছে দুষ্প্রাপ্য। উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স থেকে ইউনিয়ন দুটির দূরত্ব প্রায় ২৫ কিলোমিটার। এর মধ্যে প্রায় আট কিলোমিটার পথ পাড়ি দিতে হয় উত্তাল নদী। এই যাত্রা আরও কঠিন প্রসূতিদের। রাতবিরাতে প্রসববেদনা উঠলে নিরুপায় সন্তানসম্ভবা নারীরা। তাদের এখন একমাত্র ভরসা ফাতিমা আক্তার রিমা। খবর পেলেই খাল-চর মাড়িয়ে ছুটে যান এই ডিপ্লোমা চিকিৎসক। দেড় বছরে প্রায় ৩০০ নরমাল ডেলিভারি বা স্বাভাবিক সন্তান প্রসব করিয়ে তিনি এখন অন্ধের যষ্টি।
স্থানীয়দের ভাষ্য, প্রসূতিদের সন্তান প্রসবে রিমা এই দুই ইউনিয়নের জন্য আশীর্বাদ। তার হাতে দেড় বছরে প্রায় ৩০০ নরমাল ডেলিভারি হলেও ঘটেনি কোনো দুর্ঘটনা। শুধু তাই নয়, তাদের মধ্যে অন্তত পাঁচ নারীর প্রথম সন্তান সিজারে হয়েছিল। এরপরও অসামান্য দক্ষতায় তাদের সন্তানদের অস্ত্রোপচার ছাড়াই পৃথিবীর আলো দেখিয়েছেন রিমা।
পরিবার সূত্রে জানা গেল, রিমার বাবার বাড়ি বরগুনা সদর উপজেলায়। ২০২০ সালে চরবিশ্বাসের বাদশা হাওলাদারের ছেলে আরিফুর রহমানের সঙ্গে বিয়ে হয় তার। তখন তিনি ফরিদপুর সরকারি ম্যাটসের শিক্ষার্থী। পড়াশোনা শেষে পটুয়াখালী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ইন্টার্নশিপ এবং পরে পটুয়াখালী ও গলাচিপার বিভিন্ন স্থানে করেন চাকরি। দুই বছর আগে আসেন শ্বশুরবাড়ি।
চরকাজল ও চরবিশ্বাস ইউনিয়নের কয়েক নারী জানালেন, আগে প্রসবকালীন জটিলতা দেখা দিলে পরিবারের সদস্যদের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ত আতঙ্ক। বিশেষ করে রাতে, দ্রুত হাসপাতালে নেওয়ার সুযোগ না থাকায় অনেক পরিবার অসহায় হয়ে পড়ত। এমনকি স্বাস্থ্যসেবা না েপয়ে কয়েক প্রসূতি ও নবজাতকের মৃত্যুও হয়েছে। এখন পরিস্থিতি অনেকটা বদলেছে। প্রসব ব্যথা উঠলেই সবাই ডাকে রিমা আপাকে। তিনিও সেবা দিয়ে যাচ্ছেন পরম যত্নে।
রিমা বললেন, ‘২০২৪ সালের শেষ দিকে প্রথমবার শ্বশুরবাড়ি আসি। হঠাৎ এক রাতে বাড়ির পাশে এক নারীর প্রসবব্যথা ওঠে। তারা স্থানীয় এক দাই বা ধাত্রীকে ডাকেন। কিন্তু তিনি অবস্থা পর্যবেক্ষণ করেই জানিয়ে দেন যে, হাসপাতালে নেওয়ার বিকল্প নেই। তবে ওই সময় হাসপাতালে নেওয়া বা আর্থিক সামর্থ্যও ছিল না তাদের। খবর পেয়ে আমি গিয়ে রাত আড়াইটার দিকে নরমাল ডেলিভারিতে সহায়তা করি। আল্লাহর রহমতে নবজাতক ও তার মা উভয়ই ছিলেন সুস্থ। এতেই ছড়িয়ে পড়ল নাম, ডাক পড়া শুরু হলো দূরদূরান্ত থেকে। চরের নারীদের মায়ায় আর ছাড়তে পারলাম না গ্রাম।’
‘ধীরে ধীরে ব্যস্ততা এতই বেড়ে গেল যে, প্রথম ছয় মাসেই প্রায় ৯০টি নরমাল ডেলিভারিতে সহায়তা করলাম। এরপর দ্রুতই দুই ইউনিয়নের মানুষের মধ্যে তৈরি হলো আস্থা। এখন চরকাজল ও চরবিশ্বাসে কোনো প্রসূতির নরমাল ডেলিভারির প্রয়োজন হলে অনেক পরিবারই প্রথমে তার সঙ্গে যোগাযোগ করেন। সাড়া দিতে হয় দিন-রাত ২৪ ঘণ্টাই। অনেক সময় রাতের অন্ধকারে দুর্গম কাঁচা রাস্তা মাড়িয়ে, কখনো নৌকায় নদী পেরিয়ে, আবার কখনো ঝড়-বৃষ্টির মধ্যেও পৌঁছাতে হয় প্রসূতির বাড়িতে। নামমাত্র সম্মানী পেয়েও সচ্ছলতা আসছে আমার সংসারে। তবে নরমাল ডেলিভারি আমার পেশা নয়, এটি যেন মানবিক দায়িত্ব’— উল্লেখ করলেন এই ধাত্রী।






