ফের মুখোমুখি বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক-শিক্ষা ক্যাডার

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
ঢাকা সেন্ট্রাল ইউনিভার্সিটি প্রতিষ্ঠার আগে ও পরে বিভিন্ন ইস্যুতে দ্বন্দ্বে জড়িয়েছেন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক এবং শিক্ষা ক্যাডারের শিক্ষকরা। এবার আরেকটি দ্বন্দ্ব নতুন করে সামনে এসেছে সেন্ট্রালের উপাচার্য ড. মো. নূরুল ইসলামের বক্তব্যে।
সম্প্রতি তিনি বলেছেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ানোর জন্য শিক্ষকদের যে চিন্তা-চেতনা ও গবেষণার সক্ষমতা থাকা দরকার, তা বিসিএস শিক্ষা ক্যাডারের কর্মকর্তাদের নেই।’ একই সঙ্গে সাত কলেজের শিক্ষকদের বিশ্ববিদ্যালয়ে অন্তর্ভুক্তির কাঠামো নিয়েও প্রশ্ন তোলেন তিনি। তার এই বক্তব্য যেন ‘আগুনে ঘি’ ঢেলেছে।
উপাচার্যের এ বক্তব্যে ক্ষুব্ধ হয়ে তার পদত্যাগ দাবি করেছে বিসিএস সাধারণ শিক্ষা ক্যাডার অ্যাসোসিয়েশন। সংগঠনটির অভিযোগ, ভিসি হিসেবে নিয়োগ পেয়ে গত ৫ মাসে শিক্ষা ক্যাডারের কর্মকর্তাদের যোগ্যতা ও পদায়ন নিয়ে একাধিকবার নেতিবাচক মন্তব্য করেছেন ড. মো. নূরুল ইসলাম। শিক্ষা ক্যাডারের কর্মকর্তাদের বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সরিয়ে দেওয়ার উদ্যোগও নিয়েছেন তিনি।
উপাচার্যের বক্তব্যের একটি অংশে সাত কলেজকে ‘আত্তীকৃত শিক্ষকদের আতুরঘর’ উল্লেখ করে শিক্ষার্থীদের সামনে কারা পড়াবেন, সে বিষয়ে মানদণ্ড থাকার কথা বলা হয়। শিক্ষা ক্যাডারের শিক্ষকদের দাবি, ‘সরকারি কলেজের শিক্ষকরা পাঠদানের পাশাপাশি পরীক্ষা, প্রশ্ন প্রণয়ন, উত্তরপত্র মূল্যায়ন, ভর্তি ও প্রশাসনিক নানা দায়িত্ব পালন করেন। শিক্ষক সংকট ও অতিরিক্ত শিক্ষার্থীর কারণে অনেক কলেজে সীমিত জনবলেই একাধিক পর্যায়ের শিক্ষাকার্যক্রম পরিচালনা করতে হয়। তাই শুধু বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ের গবেষণার মানদণ্ডে তাদের মূল্যায়ন যৌক্তিক নয়।’
এ বিষয়ে ঢাকা কলেজের সাবেক অধ্যক্ষ ও অ্যাসোসিয়েশনের সাবেক সভাপতি অধ্যাপক আই কে সেলিম উল্লাহ খন্দকার বলছিলেন, ‘দেশের উচ্চশিক্ষায় অধ্যয়নরতদের বড় অংশকেই পড়ান শিক্ষা ক্যাডারের শিক্ষকরা। এই ক্যাডারে ১৭ হাজার কর্মরত শিক্ষক ও অবসরপ্রাপ্ত প্রায় ৫০ হাজার সদস্যের অধিকাংশই পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তন শিক্ষার্থী। তাদের নিয়ে মন্তব্য করার আগে উপাচার্যের আরও সতর্ক হওয়া উচিত ছিল।’
এদিকে উপাচার্যের বক্তব্যের জন্য দুঃখ প্রকাশ করেছে ঢাকা সেন্ট্রাল ইউনিভার্সিটি। এক বিজ্ঞপ্তিতে সেন্ট্রাল ইউনিভার্সিটি বলেছে, ‘বক্তব্যের খণ্ডিত অংশ প্রচারিত হওয়ায় বিভ্রান্তি তৈরি হয়েছে। উপাচার্যের মূল বক্তব্য ছিল সাত কলেজের শিক্ষকদের উচ্চশিক্ষা, প্রশিক্ষণ, গবেষণা ও পেশাগত সক্ষমতা বাড়ানোর বিষয়ে। এতে কোনো নির্দিষ্ট ক্যাডারের শিক্ষকদের মর্যাদাহানি উদ্দেশ্য ছিল না। তারপরও বক্তব্যে কেউ মনঃক্ষুণ্ন হয়ে থাকলে উপাচার্য আন্তরিকভাবে দুঃখ প্রকাশ করেছেন।’ তবে এ ব্যাখ্যায় সন্তুষ্ট নয় শিক্ষা ক্যাডার অ্যাসোসিয়েশন। সংগঠনটি বলেছে, শিক্ষার মান নিয়ে সমালোচনা হতে পারে, তবে তা তথ্য, যুক্তি, প্রমাণ ও একাডেমিক শিষ্টাচারের ভিত্তিতে হতে হবে।
দ্বন্দ্ব শুরু যেখান থেকে
২০১৭ সালে প্রথম সাত কলেজকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত করার পর থেকেই শিক্ষা ক্যাডারের সঙ্গে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের দ্বন্দ্ব প্রকট হয়। এরপর কলেজগুলোর শিক্ষার মান ও একাডেমিক কার্যক্রম, ফল প্রকাশ, সেশনজট, রেজিস্ট্রেশন ও প্রশাসনিক সমন্বয়হীনতা নিয়ে বাড়তে থাকে সেই দ্বন্দ্ব। এর প্রভাব পড়ে শিক্ষার্থীদের ওপর। ২০১৭ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত সাত কলেজ ইস্যুতে বারবার রাজপথে নামতে দেখা গেছে শিক্ষার্থীদের। এর পেছনে কখনো বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক, কখনো শিক্ষা ক্যাডারের শিক্ষকদের ইন্ধন ছিল বলে অভিযোগ।
এর সমাধান আসে ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর সাত কলেজকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পৃথক করে স্বতন্ত্র বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে। কিন্তু সেই বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার পর ক্যাডার শিক্ষকদের অবস্থান, পদায়ন, নিয়োগ ও দায়িত্ব বণ্টন ইস্যুতে চরম বেকায়দায় পড়ে সরকার। পরে বাধ্য হয় বিশ্ববিদ্যালয়ের কাঠামোগত পরিবর্তনে।
শিক্ষা ক্যাডারের শিক্ষকদের অভিযোগ, নূরুল ইসলাম ভিসি হওয়ার পর শিক্ষা ক্যাডার কর্মকর্তাদের বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ানোর অনুপযুক্ত বলে একাধিকবার ঢালাও মন্তব্য করেছেন। উপাচার্যের বক্তব্যের প্রতিবাদে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শিক্ষা ক্যাডার কর্মকর্তাদের অনেকেই নিজেদের পেশাগত যোগ্যতা ও বাস্তব কর্মপরিবেশের নানা দিক তুলে ধরেছেন। একই সঙ্গে, উপাচার্যের পদত্যাগ দাবিতে কর্মসূচি পালন করার কথা জানিয়েছেন তারা।
সার্বিক বিষয়ে জানতে চাইলে উপাচার্য ড. মো. নূরুল ইসলাম বলেছেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞপ্তিতেই বিষয়টি পরিষ্কার করা হয়েছে।’








