নবীজি (সা.)-এর হাসিমুখের মুগ্ধতা

প্রতীকী ছবি
মানুষের হাসি শুধু মুখের অভিব্যক্তি নয়; কখনো কখনো তা হয়ে ওঠে হৃদয়ের ভাষা। একটি কোমল হাসি কমিয়ে দিতে পারে দূরত্ব, আপন করে নিতে পারে কোনো অপরিচিতকে, স্বস্তি এনে দিতে পারে কোনো দুঃখী মানুষের মনে। মহানবী (সা.)-এর হাসির মধ্যেও ছিল এমন এক অনন্য নান্দনিকতা; যেখানে মিশে থাকত সৌজন্য, সংযম, মমতা ও হৃদয়ের প্রশান্তি। তাঁর হাসিতে অট্টহাস্য ছিল না। তাঁর মোবারক চেহাড়ায় ফুটে উঠত মৃদু হাসি বা মুচকি হাসির কোমল আলো।
আয়েশা (রা.) মহানবী (সা.)-এর হাসির ধরন সম্পর্কে বলেছেন,
مَا رَأَيْتُ النَّبِيَّ صلى الله عليه وسلم مُسْتَجْمِعًا قَطُّ ضَاحِكًا حَتَّى أَرَى مِنْهُ لَهَوَاتِهِ، إِنَّمَا كَانَ يَتَبَسَّمُ.
‘আমি নবী (সা.)-কে এমনভাবে অট্টহাসি দিতে কখনো দেখিনি যে তাঁর মুখের ভেতরটা দেখা যায়; তিনি কেবল মুচকি হাসতেন।’ (বুখারি, হাদিস: ৬০৯২)। এই বর্ণনা তাঁর হাসির নান্দনিকতার একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক তুলে ধরে। তাঁর আনন্দ প্রকাশে স্বাভাবিকতা ছিল, কিন্তু কোনো অশোভন উচ্ছ্বাস ছিল না।
মহানবী (সা.)-এর হাসি ছিল মানুষের প্রতি তাঁর ভালোবাসারও প্রকাশ। সহিহ বুখারির বর্ণনায় এসেছে-
عَنْ جَرِيْرٍ قَالَ مَا حَجَبَنِي النَّبِيُّ صلى الله عليه وسلم مُنْذُ أَسْلَمْتُ وَلَا رَآنِيْ إِلَّا تَبَسَّمَ فِيْ وَجْهِي
জারির ইবন আবদুল্লাহ (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেছেন, ‘আমি ইসলাম গ্রহণ করার পর রাসুলুল্লাহ (সা.) কখনো আমাকে তাঁর সাক্ষাৎ থেকে বাধা দেননি এবং যখনই আমাকে দেখেছেন, আমার দিকে হেসে তাকিয়েছেন।’ (বুখারি, হাদিস: ৩০৩৫; মুসলিম, হাদিস: ২৪৭৫)। একজন মানুষের দিকে হাসিমুখে তাকানো যে কত বড় আন্তরিকতার ভাষা হতে পারে, এই ঘটনা তার চমৎকার উদাহরণ। কোনো দীর্ঘ বক্তৃতা নয়, একটি হাসিই কখনো মানুষের মনে আপনত্বের অনুভূতি সৃষ্টি করতে পারে।
তাঁর মুচকি হাসির আরেকটি সৌন্দর্য ছিল পরিস্থিতিবোধ। তিনি মানুষের সঙ্গে রসিকতা করতেন, কিন্তু তাঁর রসিকতাও কখনো সত্যের সীমা অতিক্রম করত না। সাহাবিরা তাঁর সঙ্গে হাসি-আনন্দের মুহূর্ত ভাগ করে নিতেন। েতিরমিজির বর্ণনায় এসেছে-
عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ، قَالَ قَالُوا يَا رَسُولَ اللَّهِ إِنَّكَ تُدَاعِبُنَا . قَالَ " إِنِّي لاَ أَقُولُ إِلاَّ حَقًّا "
আবু হুরাইরা (রা.) হতে বর্ণিত আছে, তিনি বলেছেন, সাহাবীগণ বললেন, হে আল্লাহর রাসুল (সা.)। আপনি তো আমাদের সাথে কৌতুকও করে থাকেন। তিনি বললেন, আমি শুধু সত্য কথাই বলে থাকি (এমনকি কৌতুকেও)। (তিরমিজি, হাদিস: ১৯৯০)। অর্থাৎ তাঁর হাস্যরসও ছিল চরিত্রের সৌন্দর্যের অধীন। আনন্দকে তিনি অশালীনতার দিকে যেতে দেননি, রসিকতাকে মিথ্যার আশ্রয় নিতে দেননি।
কখনো কোনো ঘটনা তাঁকে আনন্দিত করলে তাঁর মুখমণ্ডলে সেই আনন্দের কোমল ছাপ ফুটে উঠত। আবার কখনো কোনো বিস্ময়কর বা আনন্দদায়ক ঘটনায় তিনি মুচকি হাসতেন। আজকের পৃথিবীতে হাসি অনেক সময় কৃত্রিমতা, প্রদর্শন কিংবা সামাজিক অভিনয়ের অংশ হয়ে ওঠে। কিন্তু নবীজি (সা.)-এর হাসি ছিল অন্তরের সৌন্দর্যের স্বাভাবিক প্রকাশ। তাঁর মুচকি হাসি শেখায়, আনন্দ প্রকাশের জন্য উচ্চকণ্ঠ হতে হয় না; কাউকে আপন করে নিতে দীর্ঘ কথারও প্রয়োজন হয় না। একটি আন্তরিক হাসি, একটি কোমল দৃষ্টি, একটি প্রশান্ত মুখও মানুষের হৃদয়ে গভীর প্রভাব ফেলতে পারে।
এ কারণেই মহানবী (সা.)-এর নীরব হাসি শুধু তাঁর ব্যক্তিগত সৌজন্যের একটি বৈশিষ্ট্য নয়; এটি তাঁর মহৎ চরিত্রেরও নান্দনিক প্রকাশ। তাঁর হাসিতে ছিল বিনয়, তাঁর মুচকি হাসিতে ছিল মমতা, আর তাঁর সংযত আনন্দে ছিল পরিমিতির সৌন্দর্য। তাই তাঁর হাসির দিকে তাকালে আমরা শুধু একজন প্রফুল্ল মানুষের ছবি দেখি না; বরং দেখতে পাই এমন এক মহান মানবিক চরিত্র, যার আনন্দও অন্যের হৃদয়ে প্রশান্তি ছড়িয়ে দিত।
লেখক : আলেম ও সাংবাদিক






