জলবায়ু পরিবর্তন বদলে দিচ্ছে ইউরোপের উষ্ণতম শহরটির জীবনযাত্রা

১৯ আগস্ট, ২০২৬ তারিখে ইতালির সিসিলির ফ্লোরিদিয়া শহরের একটি ফাঁকা খেলার মাঠ। ছবি : রয়টার্স
পাঁচ বছর আগে ইউরোপের সর্বোচ্চ তাপমাত্রার রেকর্ড গড়ে বিশ্বজুড়ে আলোচনায় আসে ইতালির সিসিলির ছোট শহর ফ্লোরিডিয়া। তবে এখন সেই রেকর্ডের চেয়েও বড় চিন্তার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে দীর্ঘস্থায়ী তাপপ্রবাহ।
অসহনীয় গরমে মানুষ দিনের অধিকাংশ সময় ঘরবন্দি থাকছেন, কমে যাচ্ছে সামাজিক যোগাযোগ এবং হুমকির মুখে পড়ছে স্থানীয় কৃষি ও জীবিকা।
২০২১ সালের ১১ আগস্ট ফ্লোরিডিয়ার কাছের মনাস্তেরি এলাকায় ৪৮ দশমিক ৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়। পরে ২০২৪ সালে বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থা (ডব্লিউএমও) এটিকে ইউরোপের ইতিহাসে সর্বোচ্চ তাপমাত্রা হিসেবে স্বীকৃতি দেয়।
অনেকেই ভেবেছিলেন এটি ছিল একটি ব্যতিক্রমী আবহাওয়াগত ঘটনা। কিন্তু সময়ের সঙ্গে স্থানীয়দের অভিজ্ঞতা বলছে, চরম গরম এখন আর বিচ্ছিন্ন নয়; বরং দীর্ঘ সময় ধরে স্থায়ী হওয়া উচ্চ তাপমাত্রাই এখন নতুন বাস্তবতা।
প্রায় ২০ হাজার মানুষের ফ্লোরিডিয়ায় সেই পরিবর্তন স্পষ্টভাবে চোখে পড়ে। একসময় প্রাণবন্ত রাস্তাঘাট ও জনসমাগমে মুখর পিয়াজ্জা দেল পোপোলো এখন দিনের বড় অংশজুড়ে প্রায় জনশূন্য থাকে।
ক্যাফে, দোকান ও খোলা চত্বরে মানুষের আনাগোনা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে। প্রচণ্ড গরমের কারণে শিশুরাও বিকেল গড়ানোর আগে বাইরে খেলাধুলা করতে পারছে না।
শহরের সংস্কৃতিবিষয়ক কাউন্সিলর সেরেনা স্পাদা বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে বলেছেন, অতিরিক্ত তাপমাত্রা মানুষের জীবনযাত্রাকে এমনভাবে সীমাবদ্ধ করে দিয়েছে যে অনেকের কাছে এটি নতুন ধরনের লকডাউনের অনুভূতি তৈরি করছে।
তার ভাষায়, ছোট শিশুদের পরিবারগুলো সবচেয়ে বেশি সমস্যায় পড়ছে, কারণ দিনের অধিকাংশ সময় বাইরে থাকা প্রায় অসম্ভব হয়ে উঠেছে।
তাপপ্রবাহ শুধু চলাফেরাই নয়, ফ্লোরিডিয়ার বহু পুরোনো সামাজিক ঐতিহ্যকেও বদলে দিচ্ছে। সিসিলিতে ‘পিগিয়ারি উ ফ্রেস্কু’ নামে একটি জনপ্রিয় প্রথা রয়েছে, যেখানে সন্ধ্যার পর পরিবারগুলো বাড়ির সামনে চেয়ার নিয়ে বসে ঠান্ডা বাতাস উপভোগ করতেন এবং প্রতিবেশীদের সঙ্গে গল্প করতেন। কিন্তু এখন রাত পর্যন্ত তাপমাত্রা বেশি থাকায় সেই সামাজিক সংস্কৃতিও ধীরে ধীরে হারিয়ে যাচ্ছে।
সিসিলির আগ্রোমেটিওরোলজিক্যাল ইনফরমেশন সার্ভিসের পরিচালক লুইজি পাসোত্তি বলেছেন, বিজ্ঞানীদের সবচেয়ে বড় চিন্তা কোনো একদিনের সর্বোচ্চ তাপমাত্রা নয়, বরং গড় তাপমাত্রার ধারাবাহিক বৃদ্ধি।
তার মতে, এখন আর এক বা দুই দিনের তাপমাত্রার সর্বোচ্চ হচ্ছে যে তা নয়; বরং কয়েক সপ্তাহ থেকে কয়েক মাস পর্যন্ত অস্বাভাবিক গরম স্থায়ী থাকছে। একই সঙ্গে বাড়ছে রাতের তাপমাত্রাও।
চলতি বছর সিসিলির বিভিন্ন এলাকায় অস্বাভাবিক সংখ্যক ‘ট্রপিক্যাল নাইট’ ও ‘সুপার-ট্রপিক্যাল নাইট’ রেকর্ড হয়েছে, ফলে মানুষ রাতেও স্বস্তি পাচ্ছেন না।
রয়টার্সের জলবায়ু পর্যবেক্ষণ তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের ১২ আগস্ট ফ্লোরিডিয়ায় তাপমাত্রা ছিল ৩৩ দশমিক ৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস, যা ১৯৬১ থেকে ১৯৯০ সালের ঐতিহাসিক গড়ের তুলনায় ৪ দশমিক ১ ডিগ্রি বেশি।
জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব সবচেয়ে বেশি অনুভূত হচ্ছে কৃষি ও মৌমাছি পালনের মতো খাতে। ২০২১ সালের ভয়াবহ গরমে ফ্লোরিডিয়া এলাকায় তিন হাজারের বেশি মৌচাক নষ্ট হয়েছিল এবং মধু উৎপাদন প্রায় ৮০ শতাংশ কমে যায়। এতে শুধু মৌচাষিরাই নয়, কৃষি উৎপাদন ও জীববৈচিত্র্যও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
স্থানীয় মৌমাছি পালনকারী ফ্রান্সেস্কো পাপ্পালার্দো বলেছেন, একসময় গ্রীষ্ম ছিল উৎপাদনের মৌসুম, আর এখন এটি টিকে থাকার লড়াইয়ের সময়। অতিরিক্ত তাপের কারণে পৃথক মৌকলোনি ধসে পড়তে পারে, এমনকি পুরো মৌচাষ কেন্দ্রও ধ্বংস হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে।
জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে সিসিলিতে খরা, দাবানল, অতিবৃষ্টি ও অন্যান্য চরম আবহাওয়ার ঘটনাও ক্রমেই বাড়ছে। তাই ফ্লোরিডিয়ার ৪৮ দশমিক ৮ ডিগ্রি সেলসিয়াসের রেকর্ড আজ শুধু একটি সংখ্যার ইতিহাস নয়; এটি ইউরোপের উষ্ণ হয়ে ওঠা ভবিষ্যৎ এবং জলবায়ু পরিবর্তনের গভীর প্রভাবের এক জীবন্ত সতর্কবার্তা।
সূত্র : রয়টার্স







