সৈকতের বুকে সড়ক!

ছবি: আগামীর সময়
কক্সবাজার সমুদ্রসৈকতের বালিয়াড়ি শুধু বালুর স্তূপ নয়। ঢেউ ও জলোচ্ছ্বাসের আঘাত ঠেকানো, উপকূলীয় ক্ষয় কমানো এবং জলবায়ু পরিবর্তনজনিত সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির ঝুঁকি মোকাবিলায় এগুলো প্রকৃতির তৈরি একধরনের প্রতিরক্ষা দেয়াল। সাগরলতা ও অন্যান্য উপকূলীয় উদ্ভিদের শিকড় বালু আটকে রেখে সেই প্রাকৃতিক সুরক্ষাব্যবস্থাকে আরও শক্তিশালী করে। অথচ সেই বালিয়াড়িই এখন গুঁড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে।
সমুদ্রসৈকতের প্রতিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকা বা ইসিএর ভেতরে বালু ফেলে জায়গা ভরাট করে নির্মাণ করা হচ্ছে দীর্ঘ একটি সড়ক। এতে কেটে ও উপড়ে ফেলা হচ্ছে সাগরলতা, সমতল করে দেওয়া হচ্ছে প্রাকৃতিকভাবে তৈরি বালুর ডেইল এবং ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে লাল কাঁকড়ার আবাসস্থল।
পরিবেশবাদীদের অভিযোগ, সড়ক নির্মাণের জন্য পাশেই বিকল্প জায়গা থাকা সত্ত্বেও সৈকতের প্রাকৃতিক প্রতিরক্ষাব্যবস্থা ধ্বংস করা হচ্ছে।
কক্সবাজার পৌরসভা সূত্রে জানা গেছে, সুগন্ধা পয়েন্ট থেকে হোটেল সায়মন পর্যন্ত ১ দশমিক ৬ কিলোমিটার দীর্ঘ ও ২৮ মিটার প্রশস্ত এ সড়ক নির্মাণ করা হচ্ছে ‘নগর উন্নয়ন ও নগর শাসন প্রকল্পের’ আওতায়। ২০২৫ সালের ১৭ জুন প্রকল্পটির দরপত্র আহ্বান করা হয়। পরে ৬৩ কোটি ৫০ লাখ টাকায় কাজটি পায় ন্যাশনাল ডেভেলপমেন্ট ইঞ্জিনিয়ার্স (এনডিই)। জাপান আন্তর্জাতিক সহযোগিতা সংস্থা (জাইকা) প্রকল্পটির অর্থায়ন করছে এবং বাস্তবায়ন করছে কক্সবাজার পৌরসভা। ২০২৭ সালের ৫ অক্টোবরে নির্মাণকাজ শেষ হওয়ার কথা রয়েছে।
সরেজমিনে দেখা গেছে, সৈকতের বিস্তীর্ণ এলাকায় বালু ফেলে ভূমি উঁচু ও সমতল করা হচ্ছে। ভরাট করা অংশের ওপর দিয়েই তৈরি হচ্ছে সড়ক। কোথাও কোথাও সড়কের জায়গা করতে কেটে ফেলা হয়েছে বালিয়াড়ি। মাটির সঙ্গে উপড়ে ফেলা হয়েছে সাগরলতার ঝোপ। একের পর এক বালুর ডেইল সমতল করে দেওয়া হচ্ছে।
শ্রমিকরা জানান, তারা ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান এনডিইর পক্ষে এ কাজ করছেন।
পরিবেশবাদীদের মতে, কক্সবাজারের সৈকত রক্ষার প্রশ্ন এখন শুধু পর্যটন বা সৌন্দর্য বর্ধনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি, ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস ও উপকূলীয় ক্ষয়ের ঝুঁকি বাড়ছে। এমন বাস্তবতায় বালিয়াড়ি ও উপকূলীয় উদ্ভিদ প্রাকৃতিক সুরক্ষার গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
সাগরলতার শিকড় বালু আটকে রাখে। বালিয়াড়ি ঢেউ ও জলোচ্ছ্বাসের শক্তি কমাতে ভূমিকা রাখে। একই সঙ্গে এসব এলাকায় গড়ে ওঠে নানা প্রাণী ও উদ্ভিদের আবাসস্থল। ফলে একটি সড়ক নির্মাণের জন্য এই প্রাকৃতিক কাঠামো সরিয়ে ফেলার প্রভাব কেবল নির্মাণস্থলের কয়েকশ মিটারের মধ্যে সীমাবদ্ধ না-ও থাকতে পারে।
বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা) কক্সবাজারের সাংগঠনিক সম্পাদক এইচ এম নজরুল ইসলাম জানালেন, এই বালিয়াড়ির একটি অংশ কয়েক বছর আগেই উপকূল সুরক্ষার উদ্দেশ্যে গড়ে তোলা হয়েছিল। ২০২২ সালে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থায়নে একটি বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা কক্সবাজার সমুদ্রসৈকতের ভাঙন রোধ এবং পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য সুরক্ষায় প্রাকৃতিক প্রতিরক্ষাব্যবস্থা হিসেবে বালুর ডেইল তৈরিতে কাজ করে। এখন সড়ক নির্মাণের জন্য সেই ডেইলেরই অংশ সরিয়ে দেওয়া হচ্ছে।
তার ভাষ্য, বাংলাদেশ পরিবেশ সংরক্ষণ আইন অনুযায়ী কক্সবাজার সমুদ্রসৈকত দেশের ১৩টি প্রতিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকার একটি। এ ধরনের এলাকায় পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্যের ক্ষতি করে এমন স্থায়ী বা অস্থায়ী স্থাপনা নির্মাণ কিংবা মাটি, পানি ও বায়ুর প্রাকৃতিক বৈশিষ্ট্য পরিবর্তন করতে পারে এমন কর্মকাণ্ড নিষিদ্ধ।
এদিকে সুগন্ধা থেকে কলাতলী পর্যন্ত এ সড়ক নির্মাণে পরিবেশ অধিদপ্তরের কোনো ছাড়পত্র নেওয়া হয়নি বলে জানিয়েছেন পরিবেশ অধিদপ্তর কক্সবাজার জেলা কার্যালয়ের উপপরিচালক খন্দকার মাহমুদ পাশা।
তিনি বলেছেন, বিষয়টি সরেজমিনে পরিদর্শন করে প্রতিবেদন দিতে একজন কর্মকর্তাকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। প্রতিবেদন পাওয়ার পর প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান এনডিইর প্রকল্প ব্যবস্থাপক মোহাম্মদ শাহীন মিয়া বললেন, পরিবেশের ছাড়পত্র নেওয়ার বিষয়টি কক্সবাজার পৌরসভা বলতে পারবে।
কক্সবাজার পৌরসভার সহকারী প্রকৌশলী রুমেল বড়ুয়ার ভাষ্য, সমুদ্রসৈকতের সৌন্দর্য বর্ধন, ভাঙনকবলিত এলাকা রক্ষা এবং পর্যটকদের সুবিধার কথা বিবেচনায় নিয়েই সড়কটি নির্মাণ করা হচ্ছে।
কক্সবাজারভিত্তিক পরিবেশবাদী সংগঠন ইয়ুথ এনভায়রনমেন্ট সোসাইটির (ইয়েস) চেয়ারম্যান মুজিবুল হক জানালেন, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি ও উপকূলীয় ক্ষয় মোকাবিলায় নেদারল্যান্ডস, যুক্তরাষ্ট্র ও নিউজিল্যান্ডসহ বিভিন্ন দেশে প্রাকৃতিক বালিয়াড়ি সংরক্ষণ ও তৈরিতে বিপুল অর্থ ব্যয় করা হচ্ছে।
তার ভাষ্য, কক্সবাজারেও যুক্তরাষ্ট্রের অর্থায়নে সৈকতের ভাঙন রোধ ও জীববৈচিত্র্য সুরক্ষায় বালুর ডেইল তৈরি করা হয়েছিল। কিন্তু পাশেই বিকল্প জায়গা থাকা সত্ত্বেও সড়ক নির্মাণের নামে সেই প্রাকৃতিক সুরক্ষাব্যবস্থা ধ্বংস করা হচ্ছে। এ ধরনের কর্মকাণ্ড শিগগির বন্ধ করা প্রয়োজন বলে মনে করেন তিনি।
বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা) কক্সবাজার জেলা শাখার সাধারণ সম্পাদক কলিম উল্লাহ জানিয়েছেন, কক্সবাজার সৈকতে কোনো ধরনের স্থাপনা নির্মাণ না করা এবং স্থায়ী ও অস্থায়ী স্থাপনা অপসারণের বিষয়ে উচ্চ আদালতের নির্দেশনা রয়েছে।
তার ভাষ্য, ২০১৩ সালে প্রণীত কক্সবাজারের মহাপরিকল্পনা অনুযায়ী পৌরসভা এলাকার জোয়ার-ভাটার মধ্যবর্তী রেখা থেকে সৈকতসংলগ্ন প্রথম ৩০০ মিটার এলাকাকে ‘নো ডেভেলপমেন্ট জোন’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। সেখানে কোনো ধরনের স্থাপনা নির্মাণের সুযোগ নেই। এর পরও বালিয়াড়ি দখল করে সড়ক নির্মাণ উদ্বেগজনক বলে মন্তব্য করেন তিনি।
পরিবেশবিদদের আশঙ্কা, প্রাকৃতিক প্রতিরক্ষাব্যবস্থা দুর্বল হয়ে পড়লে ভবিষ্যতে ঢেউ ও জলোচ্ছ্বাসের আঘাতে উপকূলীয় ক্ষয়ের ঝুঁকি আরও বাড়তে পারে।








