বেওয়ারিশ লাশের অভিভাবক হাফেজ সেলিম

মর্গে পড়ে আছে নিথর দেহ। নেই পরিচয়, খোঁজ মেলেনি আত্মীয়স্বজনের। ঘণ্টার পর ঘণ্টা পড়ে থাকলেও অজ্ঞাতপরিচয়ের মৃত ব্যক্তির পাশেও দাঁড়ায়নি কেউ। খবর পেয়ে ছুটে এলেন নাটোরের হাফেজ সেলিম হোসেন। অভিভাবক হয়ে লাশ সংগ্রহের পর ধর্মীয় রীতিনীতি মেনে নিজ খরচে করলেন দাফন। এমন অর্ধশতাধিক বেওয়ারিশ দেহের শেষ ঠিকানার ব্যবস্থার মাধ্যমে স্থাপন করলেন মানবিকতার অনন্য দৃষ্টান্ত। পুরো জেলায় ছড়িয়ে পড়েছে তার নাম, ভাসছেন গণপ্রশংসায়।
হাফেজ সেলিম নাটোর র্যাব ক্যাম্প মসজিদের ইমাম ও খতিব। পাশাপাশি শিক্ষকতা করেন স্থানীয় একটি মাদ্রাসায়। থাকেন জেলা শহরের কানাইখালী এলাকায়। ২০২৩ সালে সেলিম মৃত ব্যক্তিদের পরিচয় শনাক্ত না হওয়া বেওয়ারিশ লাশ দাফনে নেন বিশেষ উদ্যোগ। কাজটি যেহেতু একা করা যায় না, তাই গড়ে তুলেছেন স্বেচ্ছাসেবক দল। একপর্যায়ে তা রূপ নেয় পূর্ণাঙ্গ সংগঠনে। নাম দিয়েছেন ‘কবরের যাত্রী’।
স্থানীয়রা জানালেন, নাটোর সরকারি হাসপাতাল মর্গে ও সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত পরিচয়হীন মরদেহ এলেই খবর দেওয়া হয় হাফেজ সেলিমকে। অনেক পরিবার ভীতি ও অসহায়ত্বের কারণে এগোয় না লাশ দাফনে। ফলে বেওয়ারিশ লাশ হিসেবে ময়নাতদন্ত শেষে তার কাছে হস্তান্তর করে পুলিশ। এরপর সংগঠনের সদস্যদের নিয়ে কবর খনন, গোসল এবং ধর্মীয় রীতি অনুযায়ী জানাজা শেষে দাফন অথবা শেষকৃত্যের ব্যবস্থা করেন তিনি। এই কাজে তাকে উদারভাবে সহায়তা করেন সংগঠনের সদস্য হাফেজ মো. আশরাফ, মোহাম্মদ নূর ইসলাম, হাফেজ মোহাম্মদ শিহাব উদ্দিন ও তামিম হোসেন। এ ছাড়া তাৎক্ষণিক এগিয়ে আসেন অনেক তরুণ-যুবক।
‘মুসলিম নর-নারীর লাশ দাফনেই শেষ হয়ে যায় না তার কাজ। মরহুমের জন্য মাদ্রাসার ছাত্রদের নিয়ে কোরআনখানি ও দোয়াও করেন হাফেজ সেলিম’— যোগ করলেন তারা।
নাটোরের মানবিক ব্যক্তিত্ব জুলফিকুল হায়দার বাবু ও সংবাদকর্মী এম জাহিদুল হুদা ফরহাদের ভাষ্য, এটি একটি মানবিক দায়িত্ববোধের কাজ। বেওয়ারিশ লাশের খবর পেলেই হাফেজ সেলিম ছুটে যান। পরিচয়হীন ও স্বজনহীন মৃত ব্যক্তির শেষবিদায়ে উপস্থিত থাকা অনন্য মানবিক দায়িত্ব। এ কাজে সমাজের মানুষ এগিয়ে এলে অনেক সহজ হয়ে যায় সেবাটি।
এ কাজের অনুপ্রেরণা কোথায় পেলেন— এমন প্রশ্নের জবাবে হাফেজ সেলিম বললেন, “অনেক বেওয়ারিশ লাশ ঘণ্টার পর ঘণ্টা পড়ে থাকে হাসপাতাল মর্গে। খোঁজ থাকে না পরিবার ও আত্মীয়স্বজনের। উপলব্ধি করলাম, শেষ মুহূর্তে এসব মরদেহের পাশে দাঁড়ানো আমাদের মানবিক দায়িত্ব। সেখান থেকে বেওয়ারিশ লাশ দাফনের উদ্যোগ। একপর্যায়ে গড়ে তুলি ‘কবরের যাত্রী’ সংগঠন।”
‘শুধু দাফনকাজ সম্পন্ন হলেই শেষ হয় না আমাদের দায়িত্ব। মাদ্রাসার ছাত্রদের মাধ্যমে তিন দিন মৃত ব্যক্তির রুহের মাগফিরাত কামনায় কোরআনখানি ও দোয়া পড়ানো হয়। মারা যাওয়া অসহায় ও গরিব পরিবারের জন্য স্বল্পমূল্যে কাফনের কাপড় বিক্রির উদ্যোগও নিয়েছি। যেসব পরিবারের কাফনের কাপড় কেনার সামর্থ্য নেই, তাদের বিনাপয়সায় কাপড় দেওয়া হয়। আল্লাহ যতদিন বাঁচিয়ে রাখেন, ততদিন বেওয়ারিশ মরদেহ দাফন করে যাওয়ার ইচ্ছে’— দায়িত্ববোধ তুলে ধরলেন তিনি।
হাফেজ সেলিমের কাজের প্রশংসা করে নাটোরের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার ইফতেখায়ের আলম বললেন, ‘তার এ সামাজিক ও মানবিক উদ্যোগকে স্বাগত জানাই। বিভিন্ন সময় পুলিশের উদ্ধার হওয়া বেওয়ারিশ লাশ হাফেজ সেলিম ভাইয়ের কাছে হস্তান্তর করা হয়। তিনি তার সহকর্মীদের নিয়ে জানাজা ও দাফন করেন। এমন মানবিক কাজ করায় তাদের সাধুবাদ জানাই। তাদের সর্বাত্মক সহযোগিতা করবে পুলিশ।’






