বাল্যবিয়ের পাঠ আছে, নেই প্রতিরোধের প্রস্তুতি
- উচ্চশিক্ষায় ২৮% বাল্যবিয়ে

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
দশম শ্রেণির শিক্ষার্থী হুমাইরা আক্তার। বয়স ১৬ বছর। নিয়মিত স্কুলে যাওয়া এই কিশোরী একদিন হঠাৎ জানতে পারে, কয়েক দিনের মধ্যেই তার বিয়ে। কিছুদিন আগেই পাঠ্যবইয়ে সে পড়েছে বাল্যবিয়ের কুফল সম্পর্কে। জেনেছে বাল্যবিয়ের সংজ্ঞা, ক্ষতিকর দিক ও আইনি বিধানও। কিন্তু নিজেই যখন সেই ঘটনার শিকার হতে যায়, তখন কী সেই জ্ঞান তাকে দেখাতে পারে পরিস্থিতি মোকাবিলার পথ?
বাংলাদেশে বাল্যবিয়ের হার আগের তুলনায় কমেছে। কিন্তু পরিস্থিতি এখনো উদ্বেগজনক। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) মাল্টিপল ইন্ডিকেটর ক্লাস্টার সার্ভে (এমআইসিএস) ২০২৫-এর প্রাথমিক ফলে দেখা যায়, ২০ থেকে ২৪ বছর বয়সী নারীদের ৪৭ শতাংশের বিয়ে হয়েছে ১৮ বছর পূর্ণ হওয়ার আগেই। ২০১৯ সালে এই হার ছিল ৫১ দশমিক ৪ শতাংশ। অর্থাৎ অগ্রগতি হলেও এখনো প্রায় প্রতি দুই নারীর একজনের বিয়ে ১৮ বছরের আগেই হচ্ছে।
এমন বাস্তবতায় শুধু বাল্যবিয়ের ক্ষতি বা আইন জানানো নয়, ঝুঁকিতে পড়লে কীভাবে নিজের অধিকার রক্ষা করবে, কোথায় সাহায্য চাইবে এবং কীভাবে শিক্ষাজীবন চালিয়ে যাবে— সেই প্রস্তুতিও শিক্ষার্থীদের দেওয়া জরুরি।
পাঠ্যবইয়ে আছে, ধারাবাহিকতা কম
মাধ্যমিক পর্যায়ের পাঠ্যবই ঘেঁটে দেখা গেল, বাল্যবিয়ে নিয়ে আলোচনা একেবারে নেই, তা নয়। সপ্তম শ্রেণির ‘বাংলাদেশ ও বিশ্বপরিচয়’ বইয়ের ‘বাংলাদেশের সামাজিক সমস্যা’ অধ্যায়ের শেষ দুটি পাঠে আলোচনা রয়েছে বাল্যবিয়ের ধারণা, কারণ, প্রভাব, প্রতিরোধ ও আইন নিয়ে। নবম-দশম শ্রেণির বইয়েও বিষয়টি এসেছে সামাজিক সমস্যা হিসেবে।
তবে মাধ্যমিক শিক্ষাজীবনে বাল্যবিয়ে নিয়ে ধারাবাহিকভাবে শেখার সুযোগ সীমিত। আলাদা কোনো অধ্যায় বা দীর্ঘমেয়াদি পাঠক্রমের পরিবর্তে বৃহত্তর সামাজিক সমস্যার অংশ হিসেবেই পড়ানো হয় বিষয়টি। উচ্চ মাধ্যমিকে গিয়ে সুযোগ হয়ে পড়ে আরও সীমিত। সমাজকর্ম ও সমাজবিজ্ঞানের মতো কিছু ঐচ্ছিক বিষয়ে বাল্যবিয়ের কথা থাকলেও সবাই যেহেতু এগুলো পড়ে না, তাই একাদশ-দ্বাদশ শ্রেণিতে পাঠ্যক্রমভিত্তিকভাবে বাল্যবিয়ের কুফল সম্পর্কে শেখার সুযোগ খুব কম।
জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ডের (এনসিটিবি) প্রধান সম্পাদক প্রফেসর ড. এ কে এম শওকত আলী খানও স্বীকার করলেন এই সীমাবদ্ধতার কথা। তিনি জানালেন, বর্তমান পাঠ্যবইয়ে বাল্যবিয়ে বিষয়ে কিছুটা আলোচনা থাকলেও ভবিষ্যতের শিক্ষাক্রমে বিষয়টি আরও ব্যাপকভাবে অন্তর্ভুক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে। বিষয়টি কিছুটা পরিমার্জন ও সম্প্রসারণের চেষ্টা করা হয়েছে ২০২৬ সালের পাঠ্যক্রমেও।
তার মতে, বাল্যবিয়ে কী, এর ক্ষতি কী বা এসংক্রান্ত আইন জানানোই যথেষ্ট নয়। শিক্ষার্থী যখন বাস্তবে বাল্যবিয়ের মুখোমুখি হবে, তখন কীভাবে ওই পরিস্থিতি থেকে বের হয়ে আসতে পারে, সেটিও শিক্ষার অংশ হওয়া প্রয়োজন। তিনি বলছিলেন, ‘একজন শিক্ষার্থী যখন বাল্যবিয়ের মুখোমুখি হবে, তখন কী কী ব্যবস্থা নিলে সে ওই পরিস্থিতি থেকে বের হতে পারবে— সেগুলোও যদি আমরা অন্তর্ভুক্ত করতে পারি, তাহলে বিষয়টি আরও কার্যকর হবে।’
শুধু বই নয়, দরকার বাস্তব প্রস্তুতিও
বিভিন্ন মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিকের একাধিক শিক্ষকের সঙ্গে কথা বলেছে আগামীর সময়। তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেল, নির্ধারিত পাঠের বাইরে অনেক প্রতিষ্ঠানে বাল্যবিয়ে নিয়ে নিয়মিত ক্লাস বা নির্দিষ্ট সময় বরাদ্দ নেই। বিভিন্ন সভা, দিবস বা সচেতনতামূলক কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে আলোচনা হলেও পুরো শিক্ষাবর্ষে ধারাবাহিকভাবে বিষয়টি নিয়ে কাজ করার কাঠামো নেই বেশিরভাগ প্রতিষ্ঠানে।
ব্রাহ্মণবাড়িয়া সদর উপজেলার চাপুইর আজিজুল হক উচ্চ বিদ্যালয়ের শিক্ষক শাহনাজ সুলতানা এবং উলচাপাড়া মালেকা ছাহেব আলী উচ্চ বিদ্যালয়ের শিক্ষক মোহাম্মদ কামরুজ্জামান ভূঁইয়া দুজনই মনে করেন, পাঠ্যবইয়ের পাশাপাশি বাল্যবিয়ে নিয়ে কাজ করা দরকার আরও বিস্তৃত ও ধারাবাহিকভাবে।
শাহনাজ সুলতানা জানালেন, বইয়ে কুফল, আইন ও প্রতিরোধের বিষয় থাকলেও পরিবার ও সমাজের মানসিকতা পরিবর্তন না হলে তা বাস্তবে প্রয়োগ কঠিন। তাই অভিভাবকদের নিয়ে নিয়মিত প্রয়োজন সচেতনতামূলক সভা, স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও স্বাস্থ্যকর্মীদের সম্পৃক্ততা এবং কার্যকর পদক্ষেপ।
মোহাম্মদ কামরুজ্জামান ভূঁইয়ার মতে, বিষয়টি আলাদা অধ্যায় হিসেবে বা আরও বিস্তারিতভাবে তুলে ধরার পাশাপাশি বাল্যবিয়ে প্রতিরোধে শিক্ষকদের আলাদা প্রশিক্ষণও প্রয়োজন। এতে শিক্ষকরা শিক্ষার্থীদের শুধু তথ্য দেওয়ার বাইরেও প্রস্তুত হতে পারবেন বাস্তব পরিস্থিতিতে সহায়তা করার বিষয়েও।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক মোহাম্মদ মমিনুর রশিদ জানালেন, পাঠ্যবইয়ে বাল্যবিয়ের কারণ, ক্ষতি, প্রতিরোধ ও আইন সম্পর্কে আরও তথ্য দেওয়া যেতে পারে। তবে এর পাশাপাশি শিক্ষকরা বিষয়টি কীভাবে পড়াচ্ছেন এবং শিক্ষার্থীদের কতটা বাস্তব প্রস্তুতি দিচ্ছেন, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ।
এই শিক্ষাবিদের ভাষ্য, ‘কোনো এলাকায় বাল্যবিয়ের ঘটনা ঘটতে যাচ্ছে জানতে পারলে শিক্ষার্থী প্রথমে কার কাছে যাবে, সেখানে কাজ না হলে কার কাছে অভিযোগ করবে এবং কীভাবে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী বা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে জানাবে— দরকার এসব শেখানোও। মমিনুর রশিদের মতে, শুধু পাঠ্যবইয়ে একটি বিষয় অন্তর্ভুক্ত করলেই সমস্যার সমাধান হবে না; রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান, স্থানীয় সরকার, অভিভাবক, শিক্ষক ও শিক্ষার্থী— সব পক্ষকে কাজ করতে হবে সমন্বিতভাবে।’
বাল্যবিয়ে প্রতিরোধে লক্ষ্য শুধু শিক্ষার্থীদের জ্ঞান বাড়ানো নয়; সেই জ্ঞানকে বাস্তব জীবনে প্রয়োগের সক্ষমতা তৈরি করা হওয়া উচিত মন্তব্য করে তার পরামর্শ, স্থানীয় পর্যায়ে বাল্যবিয়ের ঘটনা দ্রুত জানানোর ও ব্যবস্থা নেওয়ার কার্যকর ব্যবস্থা থাকা প্রয়োজন। প্রতিটি ইউনিয়ন বা গ্রামপর্যায়ে এ ধরনের একটি সেল বা অভিযোগ জানানোর ব্যবস্থা করা যেতে পারে। সেখানে একটি নির্দিষ্ট ফোন নম্বর বা যোগাযোগের মাধ্যম থাকবে, যাতে বাল্যবিয়ের খবর জানার পাশাপাশি দ্রুত পদক্ষেপ নিতে পারে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।
পরিবারকেও আনতে হবে সচেতনতায়
বাল্যবিয়ের সিদ্ধান্ত শুধু মেয়েটির বিষয় নয়; পরিবারের অর্থনৈতিক অবস্থা, সামাজিক চাপ, নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ কিংবা মেয়ের ভবিষ্যৎ নিয়ে অভিভাবকের ধারণাও এতে রাখে বড় ভূমিকা। তাই শিক্ষার্থীর পাশাপাশি সচেতনতার আওতায় আনা জরুরি পরিবারকেও।
বিশেষজ্ঞদের কথার বাস্তব প্রতিফলন পাওয়া যায় সপ্তম শ্রেণিতে পড়ুয়া এক শিক্ষার্থীর অভিভাবকের অভিজ্ঞতায়। তিনি বলছিলেন, ‘আমার বড় মেয়ের সময় যদি এসব বিষয় এভাবে পড়ানো হতো, তাহলে হয়তো এত তাড়াতাড়ি তার বিয়ে দিতাম না। ছোট মেয়ের বইয়ে এসব পড়ে এখন বুঝি, বাল্যবিয়ের ক্ষতি নিয়ে আরও বেশি করে লেখা ও শেখানো দরকার।’
শিক্ষা বাড়লে কমে বাল্যবিয়ে
বাল্যবিয়ের সঙ্গে শিক্ষার সম্পর্কও স্পষ্ট। এমআইসিএস ২০২৫-এর প্রাথমিক ফলে দেখা যায়, ২০-২৪ বছর বয়সী নারীদের মধ্যে উচ্চ মাধ্যমিক বা তার বেশি শিক্ষিতদের ১৮ বছরের আগে বিয়ের হার ২৮ শতাংশ। মাধ্যমিক পর্যায়ে এ হার ৫৬ শতাংশ, নিম্নমাধ্যমিকে ৬৩ শতাংশ এবং কোনো শিক্ষা বা শুধু প্রি-প্রাথমিক পর্যায় পর্যন্ত পড়া নারীদের ক্ষেত্রে ৬৯ শতাংশ। প্রাথমিক শিক্ষায় এ হার ৭১ শতাংশ। সবচেয়ে দরিদ্র পরিবারের নারীদের মধ্যে ১৮ বছরের আগে বিয়ের হার ৬৩ শতাংশ।
অর্থাৎ শিক্ষার স্তর বাড়ার সঙ্গে কমছে ১৮ বছরের আগে বিয়ের হার। তাই শুধু মেয়েদের স্কুলে ভর্তি করানো নয়, তাদের শিক্ষাজীবনে ধরে রাখার পাশাপাশি সেই শিক্ষাকে বাল্যবিয়ে প্রতিরোধে কার্যকর করে তোলাও গুরুত্বপূর্ণ।
২০২৮ সালে নতুন শিক্ষাক্রম প্রণয়নের সময় বাল্যবিয়ে প্রতিরোধের বিষয়গুলো আরও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা হবে আশ্বাস দিয়েছেন এনসিটিবির প্রধান সম্পাদক ড. এ কে এম শওকত আলী খান। জানালেন, এ বিষয়ে সুপরামর্শ লিখিতভাবে পেলে ভবিষ্যৎ শিক্ষাক্রমে তা বিবেচনার সুযোগ রয়েছে।
একজন শিক্ষার্থীকে যেন শুধু পরীক্ষার খাতায় লিখতে না হয়, বাল্যবিয়ে ক্ষতিকর বা আইনত দণ্ডনীয়; বরং নিজের বিয়ে ঠিক হয়ে গেলে কীভাবে নিজের অধিকার রক্ষা করবে, কোথায় সাহায্য চাইবে, কার কাছে যাবে এবং কীভাবে শিক্ষাজীবন চালিয়ে যাবে— সেটিও যেন জানে, সেই প্রস্তুতিই এখন জরুরি।








