যশোর
গার্লস স্কুলে বাল্যবিয়ের থাবা, ১১ প্রতিষ্ঠানে শূন্য পাস

ফাইল ছবি
যশোরের মণিরামপুর উপজেলার হেলানচীকৃষ্ণবাটি সেকেন্ডারি গার্লস স্কুল। ১৯৮৪ সালে ৮৪ শতক জমির ওপর প্রতিষ্ঠিত। আছে চারতলা মনোরম ভবন। মাধ্যমিক শাখায় ৯ শিক্ষক। অথচ পুরো মাধ্যমিক শাখায় ছাত্রী সংখ্যা মাত্র ৩৫! বাল্যবিয়ের করাল গ্রাসে ঝরে পড়েছে একের পর এক শিক্ষার্থী। আর সেই বাল্যবিয়ের বলি হয়ে ২০২৬ সালের এসএসসি পরীক্ষায় অংশ নিয়েও অকৃতকার্য হয়েছে একমাত্র পরীক্ষার্থী উর্মী মণ্ডল।
বিদ্যালয় সূত্রে জানা যায়, ২০২৫ সালের এসএসসি পরীক্ষায় এই স্কুল থেকে পাঁচ শিক্ষার্থী অংশ নিয়ে শতভাগ পাসের সাফল্য পেয়েছিল। কিন্তু ২০২৬ সালে এসএসসিতে পরীক্ষার্থী কমে দাঁড়ায় মাত্র একজনে। আর সেই একমাত্র পরীক্ষার্থীও অকৃতকার্য হয়।
হঠাৎ কেন পরীক্ষার্থীর সংখ্যা কমে গেল এবং ফলাফলের এই বিপর্যয়ের কারণ কী— এমন প্রশ্নের জবাবে চাঞ্চল্যকর তথ্য দিলেন বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আব্দুর রহমান। বললেন, ‘২০২৫ সালে উর্মী মন্ডলসহ মোট ৫ জন ছাত্রী অষ্টম শ্রেণি থেকে নবম শ্রেণিতে উঠেছিল। কিন্তু নবম শ্রেণিতে পড়া অবস্থাতেই উর্মীসহ সবকটি মেয়ের বিয়ে হয়ে যায়। বিয়ের পর আমরা বহু চেষ্টা করেও অন্য মেয়েদের আর স্কুলে ফেরাতে পারিনি। কেবল উর্মীই ক্লাসে ফিরেছিল।’
‘উর্মী কোলে দুধের সন্তান নিয়ে ২০২৬ সালের এসএসসি পরীক্ষায় অংশ নিয়েছিল। একদিকে সংসারের চাপ, অন্যদিকে সন্তানের দেখভাল— সব মিলিয়ে পরীক্ষার জন্য উপযুক্ত প্রস্তুতি নেওয়া উর্মীর পক্ষে সম্ভব হয়ে ওঠেনি। শিক্ষকরা সর্বোচ্চ আন্তরিকতা নিয়ে চেষ্টা করলেও শেষ পর্যন্ত সফল হয়নি। এ ছাড়া একই গ্রামে মাধ্যামিক স্তরে আরও দুটি প্রতিষ্ঠান রযেছে। এ কারণে ছাত্রী সংকট দেখা দিয়েছে’— জানালেন প্রধান শিক্ষক।
সাবেক প্রধান শিক্ষক হয়রত আলী বলেন, হেলানচীকৃষ্ণবাটি বালিকা বিদ্যালয়টি মণিরামপুরের বাল্যবিবাহের এক নির্মম বাস্তবতার প্রতিফলন। পর্যাপ্ত অবকাঠামো ও শিক্ষক থাকা সত্ত্বেও শুধু বাল্যবিয়ের কারণে ঝরে পড়ছে শিক্ষার্থীরা, ভেস্তে যাচ্ছে একটি করে সম্ভাবনাময় ভবিষ্যৎ।
এ বিষয়ে স্থানীয় প্রশাসনের সহযোগিতাও চাইলেন সাবেক এই প্রধান শিক্ষক।
শুধু যশোরের হেলানচীকৃষ্ণবাটি মাধ্যমিক বালিকা বিদ্যালয় নয়। ২০২৬ সালের মাধ্যমিক স্কুল সার্টিফিকেট (এসএসসি) পরীক্ষায় যশোর মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ডের অধীনে ১১টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের কোনো শিক্ষার্থীই পাস করতে পারেনি। অর্থাৎ এসব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে পাসের হার শূন্য শতাংশ।
আজ সোমবার যশোর বোর্ডের পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক প্রফেসর এস. এম. হোসেন আলী স্বাক্ষরিত ‘শূন্য পাস করা প্রতিষ্ঠানের তালিকা’ থেকে এই তথ্য পাওয়া গেছে।
ওই তালিকা বিশ্লেষণে দেখা গেছে, শতভাগ ফেল করা এই ১১টি স্কুলের মোট পরীক্ষার্থী ছিল ৩৪ জন। তবে এদের মধ্যে কেউই উত্তীর্ণ হতে পারেনি। সাতক্ষীরা জেলায় সবচেয়ে বেশি (৪টি) এমন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান রয়েছে। এ ছাড়া যশোরে ৪টি, খুলনায় ২টি এবং বাগেরহাটে ১টি স্কুল রয়েছে এই তালিকায়।
শূন্য পাস করা ১১ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান
সাতক্ষীরা
সাতক্ষীরা নৈশ সেকেন্ডারি স্কুল (৭ জন পরীক্ষার্থী), গোদারা সেকেন্ডারি স্কুল (৪ জন), বাবুরাবাদ ধাপুখালী সেকেন্ডারি স্কুল (৪ জন) এবং সাহেবখালী সিদ্দিক গাজী সেকেন্ডারি স্কুল (৪ জন)।
যশোর
হেলানচীকৃষ্ণবাটি সেকেন্ডারি গার্লস স্কুল (১ জন), চান্দুয়া সমসকাটি গার্লস হাইস্কুল (৩ জন), শাড়াতলা জুনিয়র গার্লস হাইস্কুল (২ জন) এবং মুক্তিযোদ্ধা জি কে জি এস সেকেন্ডারি গার্লস স্কুল (১ জন)।
খুলনা
কাটেঙ্গা সেকেন্ডারি স্কুল (৪ জন) এবং আসমা সারোয়ার ইসলামিক হাই স্কুল (৪ জন)।
বাগেরহাট
ডি এন একতা গার্লস হাই স্কুল (২ জন)।
যশোর বোর্ডে সচিব প্রফেসর ড. মো. আব্দুল মতিন বলেন, শূন্য পাস করা ১১টি প্রতিষ্ঠানকে আগামী ২৪ ঘণ্টার মধ্যে কারণ দর্শানোর নোটিস দেওয়া হবে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর অ্যাকাডেমিক দুর্বলতা কিংবা শিক্ষকদের গাফিলতির প্রমাণ পাওয়া গেলে বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে। প্রয়োজনে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের স্বীকৃতি বাতিলের বিষয়টিও বিবেচনা করা হবে।





