যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় জর্ডানে সিরিয়া-ইসরায়েল বৈঠক

সিরিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদ আল-শাইবানি। ছবি: রয়টার্স
তুরস্ক সীমান্তের কাছে সিরিয়ার একটি বিমানঘাঁটিতে ইসরায়েলি হামলার পর উত্তেজনা কমাতে জর্ডানে দেশটির গোয়েন্দা কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করেছেন সিরিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদ আল-শাইবানি। সিরিয়ার রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম সানা এ তথ্য জানিয়েছে।
সংবাদ সংস্থা সানা এক কূটনৈতিক সূত্রের বরাতে জানিয়েছে, রবিবার যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় বৈঠকটি হয়েছে। এতে ইসরায়েলের একটি ‘উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিদল’ অংশ নিয়েছে।
বার্তা সংস্থা এএফপি জানিয়েছে, বৈঠকে শাইবানি ইসরায়েলের গোয়েন্দা সংস্থা মোসাদের প্রধান রোমান গোফম্যানের সঙ্গে দেখা করেছেন।
সানার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আলোচনায় ‘ইসরায়েলের হামলা, গ্রেপ্তার ও লক্ষ্যবস্তু করার অভিযান বন্ধে বাস্তবসম্মত ব্যবস্থা’ নেওয়ার বিষয়টি গুরুত্ব পেয়েছে। পাশাপাশি দুই দেশের মধ্যে দীর্ঘমেয়াদি নিরাপত্তা চুক্তির আলোচনা আবার শুরুর বিষয়েও কথা হয়েছে।
ইসরায়েল ও তুরস্কের মধ্যে উত্তেজনা কমানো এবং তাদের বিরোধ যেন সিরিয়ার ভূখণ্ডে ছড়িয়ে না পড়ে, সে বিষয়েও আলোচনা হয়েছে।
এক বছরেরও বেশি সময় ধরে ইসরায়েল ও সিরিয়ার প্রেসিডেন্ট আহমেদ আল-শারার সরকারের মধ্যে নিরাপত্তা চুক্তির জন্য মধ্যস্থতা করছে যুক্তরাষ্ট্র। ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে দীর্ঘদিনের শাসক বাশার আল-আসাদ ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর থেকে সিরিয়ায় শত শত হামলা চালিয়েছে ইসরায়েল।
পাশাপাশি ইসরায়েল-অধিকৃত গোলান মালভূমিতে ইসরায়েল ও সিরিয়ার বাহিনীর মধ্যে দীর্ঘদিনের ব্যবধান তৈরি করে রাখা জাতিসংঘের নিয়ন্ত্রিত বাফার জোনেও সেনা পাঠিয়েছে দেশটি।
বৃহস্পতিবার উত্তর-পশ্চিম সিরিয়ার ইদলিবে আবু দুহুর বিমানঘাঁটিতেও হামলা চালায় ইসরায়েল। তুরস্কের সেনারা ওই ঘাঁটিতে মোতায়েন হতে পারে— এমন আশঙ্কায় হামলা চালানো হয়েছে বলে দাবি করেছে ইসরায়েল। তবে সিরিয়া ও তুরস্ক এই দাবি অস্বীকার করেছে।
ওই ঘটনার পর থেকেই ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ও তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ানের মধ্যে পাল্টাপাল্টি বক্তব্য চলছে। দুই নেতার মধ্যে উত্তেজনাও বেড়েছে।
রবিবারের বৈঠকে সিরিয়ার পক্ষ থেকে বলা হয়ে, ‘সিরিয়া একটি সার্বভৌম রাষ্ট্র। জাতীয় স্বার্থ অনুযায়ী দেশটির সেনাবাহিনী পুনর্গঠন ও উন্নয়ন এবং জোট ও অংশীদারত্ব নির্ধারণের পূর্ণ অধিকার রয়েছে।’
সিরিয়া ‘এই সার্বভৌম অধিকার সীমিত করে এমন কোনো ব্যবস্থা বা প্রক্রিয়া’ মেনে নেবে না বলেও জানিয়েছে।
সানার প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, আলোচনায় সিরিয়ার তাৎক্ষণিক অগ্রাধিকার ছিল আল-আসাদকে ক্ষমতাচ্যুত করার আগে ইসরায়েল যে অবস্থানে ছিল, সেখানে ইসরায়েলি সেনাদের ফিরিয়ে নেওয়া।
ইসরায়েল-অধিকৃত গোলান মালভূমির ওপর সিরিয়ার সার্বভৌমত্বের দাবিও পুনর্ব্যক্ত করেছেন সিরীয় কর্মকর্তারা।
এদিকে, ইসরায়েলি সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে, বৈঠকটি ‘ইতিবাচক’ হয়েছে।
আলোচনার পর ইসরায়েলি কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, বৈঠকে সিরিয়ায় তুরস্কের সামরিক তৎপরতা ঠেকানো, গোলান মালভূমির সিরীয় অংশকে সামরিক কর্মকাণ্ডমুক্ত রাখা, সিরিয়ার দ্রুজ সম্প্রদায়ের ‘নিরাপত্তা নিশ্চিত করা’ এবং সিরীয় সেনাবাহিনীকে নির্দিষ্ট কিছু কৌশলগত অস্ত্র সংগ্রহ থেকে বিরত রাখার বিষয়গুলো প্রাধান্য পেয়েছে।
সিরিয়ার দখল করা এলাকা থেকে ইসরায়েলি সেনা প্রত্যাহারের বিষয়টিও ‘কূটনৈতিক অগ্রগতির’ সঙ্গে শর্তযুক্ত করা হয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় আগের দফার আলোচনায় সিরিয়া ও ইসরায়েল গোয়েন্দা তথ্য বিনিময় এবং উত্তেজনা কমানোর জন্য একটি যৌথ ব্যবস্থা গঠনে সম্মত হয়েছিল। তবে ফেব্রুয়ারির শেষ দিকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু করলে আলোচনা থেমে যায়। এরপর তা আবার কবে শুরু হবে, সে বিষয়ে কোনো তারিখ নির্ধারিত হয়নি।
বৈঠকের আগে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে শাইবানি বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে বলেছেন, দামেস্ক ইসরায়েলকে বিশ্বাস করে না। তবে কূটনীতির জন্য দরজা খোলা রয়েছে। তিনি বলেছেন, গত সপ্তাহে সিরিয়ার আবু দুহুর বিমানঘাঁটিতে ইসরায়েলি হামলার পর দুই দেশের মধ্যে যোগাযোগ পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গিয়েছিল।
শাইবানি বলেছেন, বছরের শুরুর দিকে দুই পক্ষ কাগজে ‘প্রায় সব বিষয়ে’ একমত হয়েছিল। এর মধ্যে ছিল দক্ষিণ সিরিয়ায় নিরাপত্তা অঞ্চল এবং এমন একটি বাফার জোন তৈরির ব্যবস্থা, যেখানে শুধু জাতিসংঘের বাহিনী থাকবে।
মধ্যপ্রাচ্য ইনস্টিটিউটের রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও গবেষক হাসান আল জাজিরাকে বলেছেন, ইসরায়েলের আগের কর্মকাণ্ডের কারণে এবারের আলোচনা থেকে উত্তেজনা কমার সম্ভাবনা কম।
তিনি বলেছেন, ‘এর বিপরীতটাই হওয়ার সম্ভাবনা বেশি। সিরিয়া যখন পরিস্থিতি শান্ত করার আগ্রহ জানিয়েছে, তখন ইসরায়েল আরও দাবি তুলতে পারে। এরপর যুক্তরাষ্ট্র মূলত এসব নতুন দাবি নিয়ে সিরিয়ার সঙ্গে আলোচনা করবে। এর মধ্যে উত্তরে ও উত্তরের বাইরের এলাকায় তুরস্কের সামরিক উপস্থিতি বাড়ানোর বিষয়টিও থাকবে।’
হাসান আরও বলেছেন, সিরিয়া আশঙ্কা করছে, দেশটি ইসরায়েল ও তুরস্কের মধ্যে ‘যুদ্ধক্ষেত্রে’ পরিণত হবে। দেশটির ভূখণ্ড দখল করে ইসরায়েল যে অবস্থান তৈরি করেছে, তা নিয়েও উদ্বেগ রয়েছে।
তার মতে, এই দখল ‘হেরমোন, পুরো জাবাল আল-শেখ এলাকা এবং দক্ষিণের তিনটি প্রদেশ পর্যন্ত’ বিস্তৃত হতে পারে।
সিরিয়ার দৃষ্টিকোণ থেকে হাসান বলেছেন, ইসরায়েলের সঙ্গে আলোচনার মূল লক্ষ্য হলো ‘সিরীয় অঞ্চলে নতুন সরকারের কর্তৃত্ব ভেঙে পড়া’ ঠেকানো। একই সঙ্গে ইসরায়েল ও তুরস্কের কোনো সংঘাত যেন বাশার আল-আসাদের পতনের পর সিরিয়ায় ‘রাজনৈতিক কাঠামো গঠন, প্রতিষ্ঠা ও সুসংহত করার’ প্রক্রিয়াকে বাধাগ্রস্ত না করে, সেটিও নিশ্চিত করতে চায় দামেস্ক।
সূত্র : আল জাজিরা







