চীনের আবাসনখাতে সংকট চলছেই, শেষ হবে কবে?

চীনের বেইজিংয়ে আবাসিক ভবনের কাছে একটি ফুট ওভারব্রিজে হাঁটছেন এক নারী। ছবি: রয়টার্স
চীনের আবাসনখাতে দীর্ঘদিনের সংকট কাটেনি এখনো। একসময় দেশটির আবাসনখাতের উত্থান-পতনের প্রতীক হয়ে ওঠা এভারগ্রান্ডের প্রতিষ্ঠাতা ধনকুবের হুই কা ইয়ানকে গত সপ্তাহে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দিয়েছেন দেশটির একটি আদালত। তবে তার সাজার মধ্যেও অবসান হয়নি আবাসনখাতের সংকট।
গত ৬ বছর আগে থেকে চীনের অর্থনৈতিক নিয়ন্ত্রক সংস্থা আবাসনখাতে অতিরিক্ত ঋণগ্রহণ কঠোর হাতে নিয়ন্ত্রণ করতে শুরু করে। কিন্তু সেই ধাক্কাও কাটেনি এখনো। দেশ জুড়ে এখনো পড়ে আছে অসংখ্য অর্ধনির্মিত বাড়ি।
বেইজিং ও সাংহাইয়ের মতো বড় শহরগুলোয় নতুন বাড়ির দাম বাড়ার যে গতি ছিল, থেমে গেছে সেটিও। কমছে জমি বিক্রি, বাড়ি বিক্রি ও নির্মাণকাজ।
এ ছাড়া ছোট শহরগুলোয় পুরনো বাড়ির দাম ২০২০ সালের তুলনায় কমে গেছে প্রায় এক-চতুর্থাংশ। যা বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে মানুষের ভোগব্যয়ে।
চীনের অর্থনীতি চলতি বছরের এপ্রিল-জুন প্রান্তিকে আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় বেড়েছে মাত্র ৪ দশমিক ৩ শতাংশে। যা গত তিন বছরের মধ্যে সবচেয়ে কম।
ঘরোয়া চাহিদা যখন দুর্বল, তখন রপ্তানির ওপর ভর করেই প্রবৃদ্ধি ধরে রাখতে হচ্ছে চীনকে। ২০১৯ সালের পর দেশটির বাণিজ্য উদ্বৃত্ত বেড়েছে দ্বিগুণের বেশি। এতে ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বেড়েছে বাণিজ্য উত্তেজনা।
রিয়েল এস্টেট পরামর্শক প্রতিষ্ঠান এনহ্যান্স ইন্টারন্যাশনালের প্রধান নির্বাহী স্যাম রাদওয়ান বলেছেন, চীনের আবাসন সংকট কাঠামোগত। একদিকে পরিবারের তুলনায় বাড়ির সংখ্যা বেশি। অন্যদিকে জনসংখ্যার এক-তৃতীয়াংশের বেশি মানুষ দ্বিতীয় বাড়িকে বিনিয়োগ হিসেবে ব্যবহার করেছেন।
এভারগ্রান্ড ২০২১ সালে ঋণখেলাপি হয় এবং ২০২৪ সালে তার লিকুইডেশন প্রক্রিয়া শুরু হয়। প্রতিদ্বন্দ্বী প্রতিষ্ঠান কান্ট্রি গার্ডেন ২০২৩ সালে ঋণখেলাপি হয় এবং তারপর থেকে আর কোনো জমি কেনেনি।
চীনের আদালতে ধনকুবের হুই কা ইয়ানের বিরুদ্ধে অর্থ আত্মসাৎ থেকে শুরু করে ঘুষ গ্রহণসহ নানা অভিযোগ প্রমাণিত হয়েছে। অনেক ক্ষুব্ধ গৃহমালিক ও পাওনাদার প্রশ্ন তুলেছেন, কেন তাকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়নি।
এরই মধ্যে হুইয়ের কারাদণ্ডের খবর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে দেখা দেয় ক্ষোভ। গত বৃহস্পতিবার দেশটির সোশ্যাল মিডিয়া ওয়েইবো প্ল্যাটফর্মে ক্ষোভসংক্রান্ত হ্যাশট্যাগটি ৩৭ কোটি বার দেখা হয়েছে। ৭২ হাজারের বেশি মানুষ এ আলোচনায় যোগ দেন।
সান্দং প্রদেশের ৩৮ বছর বয়সী বাড়ির মালিক জেসন ওয়াং বলেছেন, ‘যন্ত্রণা অসহ্য হয়ে উঠেছে’। তার বাড়ির দাম ২০১৯ সালে কেনার পর থেকে ২৫ শতাংশ কমে গেছে। এটি শুধু অর্থনৈতিক ক্ষতি নয়; এটি তার সারা জীবনের সঞ্চয়, ঋণের বোঝা এবং ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার ওপর আঘাত।
‘লোকে যখন কোনো রকমে পেট চালায়, তখন বাড়ি কিনবে কী করে’, প্রশ্ন তোলেন জেসন।
প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং ব্যাংক ঋণ ও রাষ্ট্রীয় সহায়তা আবাসন থেকে সেমিকন্ডাক্টর ও রোবটিক্সের মতো কৌশলগত প্রযুক্তি খাতে নিয়ে যেতে চাইছেন।
তবে বিশ্লেষকরা বলছেন, এই উদীয়মান খাতগুলো আবাসন খাতের পতনের প্রভাব এখনো পুষিয়ে উঠতে পারছে না।
রাদওয়ান অনুমান করছেন, অবিক্রিত বাড়ি বেচা শেষ করতে ১৮ মাস সময় লাগবে। তার মতে, ২০২৫ সালের দামের তুলনায় বাড়ির দাম আরও ৪০ শতাংশ কমাতে হবে। যাতে বাজারে ভারসাম্য আসে। আর এ প্রক্রিয়া শেষ হতে সময় লাগতে পারে আরও এক দশক।
অবশ্য অন্য বিশ্লেষকরা মনে করছেন, হয়তো সবচেয়ে খারাপ সময়টা কেটে গেছে। গ্যাভেকাল ড্রাগোনমিক্সের চীন গবেষণা বিভাগের উপপরিচালক ক্রিস্টোফার বেডর বলেছেন, ‘আমরা ধারণা করছি না যে এখান থেকে পরিস্থিতি আরও খারাপের দিকে যাবে।’
সূত্র : রয়টার্স









