জনসংখ্যা বাড়ছে, বাড়ছে না ঘর
আয়ারল্যান্ডের আবাসন সংকট আরও গভীরে

ছবি: রয়টার্স
ইউরোপের অন্যতম সমৃদ্ধ অর্থনীতির দেশ আয়ারল্যান্ড। কিন্তু আবাসনের প্রশ্নে দেশটির চিত্র ক্রমেই বিপরীতমুখী। জনসংখ্যা বাড়ছে, বাড়ছে অভিবাসন, বাড়ছে বাড়ির দাম ও ভাড়া। বিপরীতে চাহিদার সঙ্গে তাল মিলিয়ে বাড়ছে না নতুন আবাসনের সরবরাহ। ফলে গৃহহীন মানুষের সংখ্যা ১৭ হাজার ছাড়িয়েছে। সরকারের বিপুল বিনিয়োগ ও নতুন নতুন পরিকল্পনার পরও আবাসন সংকট কাটার লক্ষণ স্পষ্ট নয়।
দ্রুত বাড়ছে জনসংখ্যা
আয়ারল্যান্ডের জনসংখ্যা ২০২৫ সালের এপ্রিল পর্যন্ত বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৫৪ লাখ ৫৮ হাজার ৬০০। এক বছরে জনসংখ্যা বেড়েছে ৭৮ হাজার ৩০০, অর্থাৎ ১ দশমিক ৫ শতাংশ। এই বৃদ্ধির ৭৬ শতাংশই এসেছে নিট অভিবাসন থেকে। ওই ১২ মাসে দেশটিতে ১ লাখ ২৫ হাজার ৩০০ মানুষ অভিবাসী হিসেবে প্রবেশ করেছেন; বিপরীতে দেশ ছেড়েছেন ৬৫ হাজার ৬০০ জন। ফলে নিট অভিবাসন দাঁড়িয়েছে ৫৯ হাজার ৭০০।
রাজধানী ডাবলিনেই বাস করেন প্রায় ১৫ লাখ ৬৮ হাজার মানুষ। দেশটির মোট জনসংখ্যার ২৮ দশমিক ৭ শতাংশ। ফলে কর্মসংস্থান ও জনসংখ্যার প্রধান কেন্দ্রগুলোতে আবাসনের চাহিদা ডাবলিনেই সবচেয়ে বেশি।
রেকর্ড নির্মাণ, তবু ঘাটতি
২০২৫ সালে আয়ারল্যান্ডে ৩৬ হাজার ২৮৪টি নতুন আবাসিক ইউনিট সম্পন্ন হয়েছে। ২০২৪ সালের তুলনায় এটি ২০ দশমিক ৪ শতাংশ বেশি এবং ২০১১ সালে বর্তমান সিরিজের পরিসংখ্যান শুরু হওয়ার পর সর্বোচ্চ। এর মধ্যে অ্যাপার্টমেন্ট ১২ হাজার ৪৭টি, স্কিম হাউজ ১৮ হাজার ৩০৮টি এবং একক বাড়ি ৫ হাজার ৯২৯টি।
তবে এই রেকর্ডও প্রয়োজনের তুলনায় কম। আইরিশ পার্লামেন্টের গবেষণা বিভাগের (ইএসআরআই) বিশ্লেষণ অনুযায়ী, জনসংখ্যাগত কাঠামোগত চাহিদা মেটাতে বছরে গড়ে প্রায় ৪৪ হাজার আবাসন ইউনিট প্রয়োজন। অতিরিক্ত জমে থাকা চাহিদা বিবেচনায় নিলে প্রয়োজনীয় সংখ্যা বছরে প্রায় ৫২ হাজারে পৌঁছাতে পারে।
২০২৬ সালের দ্বিতীয় প্রান্তিকে পরিস্থিতি আরও উদ্বেগজনক। এপ্রিল থেকে জুন পর্যন্ত ৮ হাজার ৮২৩টি নতুন আবাসন সম্পন্ন হয়েছে। ২০২৫ সালের একই সময়ের তুলনায় ৩ দশমিক ৬ শতাংশ কম। অ্যাপার্টমেন্ট নির্মাণ কমেছে ১২ দশমিক ২ শতাংশ। অর্থাৎ সরবরাহ বাড়ানোর যে গতি দেখা গিয়েছিল, তা ধরে রাখাই এখন বড় চ্যালেঞ্জ।
২০২৫ সালে নতুন আবাসনের ৫৭ দশমিক ৬ শতাংশ নির্মিত হয়েছে ডাবলিন ও মধ্যপূর্ব অঞ্চলের কিলডেয়ার, লাউথ, মিথ ও উইকলোর সমন্বয়ে গঠিত অঞ্চলটিতে। ফলে দেশের অন্যান্য অংশে সরবরাহের ভারসাম্য নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে।
ভাড়া নাগালের বাইরে
আবাসন সংকটের সবচেয়ে বড় চাপ পড়ছে ভাড়ার বাজারে। আরটিবি-ইএসআরআই রেন্ট ইনডেক্স অনুযায়ী, ২০২৫ সালের চতুর্থ প্রান্তিকে নতুন ভাড়াটিয়াদের জাতীয় গড় মাসিক ভাড়া ছিল ১ হাজার ৭৫৫ ইউরো। একই সময়ে পুরনো ভাড়াটিয়াদের গড় ভাড়া ছিল ১ হাজার ৫০৩ ইউরো। নতুন ভাড়াটিয়াদের ক্ষেত্রে এক বছরে ভাড়া বেড়েছে ৫ শতাংশ। পুরনো ভাড়াটিয়াদের ভাড়াও বেড়েছে ৪ দশমিক ৪ শতাংশ।
ডাবলিনে চাপ আরও তীব্র। উচ্চ ভাড়া, সীমিত সরবরাহ ও বাড়ির ক্রমবর্ধমান দাম নিম্ন ও মধ্যম আয়ের মানুষের জন্য রাজধানীতে বাস করা কঠিন করে তুলছে।
বাড়ি কেনার সামর্থ্যও কমছে
বাড়ির বিক্রয়মূল্যও ঊর্ধ্বমুখী। সিএসও-এর মার্চ ২০২৬-এর রেসিডেন্সিয়াল প্রোপার্টি প্রাইস ইনডেক্স অনুযায়ী, এক বছরে আয়ারল্যান্ডে আবাসিক সম্পত্তির দাম বেড়েছে ৬ দশমিক ৫ শতাংশ। ডাবলিনে দাম বেড়েছে ৫ দশমিক ৭ শতাংশ এবং ডাবলিনের বাইরে ৭ দশমিক ২ শতাংশ। ২০২৬ সালের মার্চ পর্যন্ত ১২ মাসে একটি আবাসিক সম্পত্তির মধ্যম মূল্য ছিল ৩ লাখ ৯০ হাজার ৪৬১ ইউরো। ডাবলিনে মধ্যম মূল্য ছিল ৫ লাখ ইউরো। ফলে একদিকে বাড়ির দাম ও মর্টগেজের ব্যয় বাড়ছে, অন্যদিকে ভাড়ার বাজারেও স্বস্তি নেই। তরুণ ও প্রথমবারের ক্রেতাদের জন্য বাড়ির মালিকানা ক্রমেই কঠিন হয়ে উঠছে।
গৃহহীন ১৭ হাজারের বেশি
সংকটের সবচেয়ে নির্মম চিত্র গৃহহীনতার পরিসংখ্যানে। ২০২৬ সালের মে মাসে আয়ারল্যান্ডে জরুরি আবাসনে ছিলেন ১৭ হাজার ৪৪৭ জন। এর মধ্যে ১১ হাজার ৮৬৪ জন প্রাপ্তবয়স্ক এবং ৫ হাজার ৫৮৩ শিশু। জরুরি আবাসনে থাকা পরিবারের সংখ্যা ছিল ২ হাজার ৬৮৪। এপ্রিলের তুলনায় মে মাসে সংখ্যা ১০১ জন কমেছে। কিন্তু এক বছর আগের তুলনায় মে ২০২৬-এ গৃহহীন মানুষের সংখ্যা প্রায় ১১ শতাংশ বেশি। পরিবার বেড়েছে ১৮ দশমিক ১ শতাংশ এবং গৃহহীন শিশু বেড়েছে ১৫ দশমিক ৩ শতাংশ। ডাবলিনে পরিস্থিতি আরও সংকটজনক। মে মাসে রাজধানীতে জরুরি আবাসনে ছিলেন ১২ হাজার ৩৭০ জন। যা এক বছর আগের তুলনায় ৯ দশমিক ৩ শতাংশ বেশি।
তবে সরকারি এই পরিসংখ্যানে রাস্তায় রাত কাটানো মানুষ, গৃহসহিংসতার আশ্রয়কেন্দ্রে থাকা ব্যক্তি কিংবা হিডেন হোমলেসের অনেক ঘটনাই অন্তর্ভুক্ত হয় না। ফলে প্রকৃত আবাসন সংকট আরও বড় হতে পারে।
হ্যাপ (এইচএপি) নিয়েও প্রশ্ন
হাউজিং অ্যাসিস্ট্যান্ট পেমেন্ট বা এইচএপির কার্যকারিতা নিয়েও উদ্বেগ বাড়ছে। আয়ারল্যান্ডের বেসরকারি জরিপ সংস্থা সিমন কমিউনিটিস অফ আয়ারল্যান্ডের জুন ২০২৬-এর জরিপে ১৬টি এলাকায় ভাড়ার জন্য পাওয়া ১ হাজার ৩০৩টি সম্পত্তির মধ্যে মাত্র ২০টি এইচএপি সীমার মধ্যে ছিল। এর ১৭টি ছিল ডাবলিনে এবং মাত্র তিনটি কিলডেয়ারে। বাকি ১৩টি এলাকায় একটি সম্পত্তিও এইচএপি সীমার মধ্যে পাওয়া যায়নি। অর্থাৎ সরকারি ভাড়া-সহায়তা পাওয়ার যোগ্যতা থাকলেও সেই সীমার মধ্যে বাসা খুঁজে পাওয়া অনেকের জন্য প্রায় অসম্ভব হয়ে উঠছে।
সরকারের পরিকল্পনা কতটা কার্যকর?
সরকার ২০২৫-৩০ মেয়াদে ৩ লাখ নতুন বাড়ি নির্মাণের পরিকল্পনা নিয়েছে। এর মধ্যে ৭২ হাজার সামাজিক আবাসন এবং ৯০ হাজার সাশ্রয়ী আবাসনের ব্যবস্থা করার লক্ষ্য রয়েছে। শুধু ২০২৬ সালেই আবাসন খাতে ৯ বিলিয়ন ইউরোর বেশি মূলধনী বিনিয়োগের কথা জানিয়েছে সরকার। কিন্তু সংকটের গভীরতা বিবেচনায় শুধু অর্থ বরাদ্দই যথেষ্ট নয়। নির্মাণশিল্পে শ্রমিকের ঘাটতি, জমির মূল্য, নির্মাণ ব্যয়, পরিকল্পনা অনুমোদনের জটিলতা এবং পানি-বিদ্যুৎ-পরিবহনসহ অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা। সব মিলিয়ে বাড়ি নির্মাণের গতি বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। আইরিশ পার্লামেন্টের গবেষণাতেও নির্মাণ শ্রমবাজারের সক্ষমতার সীমাবদ্ধতাকে আবাসন সরবরাহের অন্যতম বাধা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
সামনে বড় পরীক্ষা
আয়ারল্যান্ডের আবাসন সংকট শুধু বাড়ি কম’ এমন সমস্যা নয়। এটি জনসংখ্যা বৃদ্ধি, অভিবাসন, নগরায়ণ, জীবনযাত্রার ব্যয়, নির্মাণ সক্ষমতা ও সামাজিক নিরাপত্তার সম্মিলিত সংকট। ২০২৫ সালে রেকর্ডসংখ্যক বাড়ি নির্মিত হলেও তা প্রয়োজনের তুলনায় কম। ২০২৬ সালের দ্বিতীয় প্রান্তিকে নির্মাণ আবার কমেছে। সরকারের নতুন পরিকল্পনার সাফল্য তাই শেষ পর্যন্ত নির্ধারিত হবে ঘোষিত অর্থের পরিমাণ দিয়ে নয়, কত দ্রুত সাধারণ মানুষের নাগালের মধ্যে নিরাপদ ও সাশ্রয়ী আবাসন পৌঁছানো যায়— তার ওপর। আয়ারল্যান্ডের সামনে এখন সেটিই সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক ও সামাজিক পরীক্ষা।




