কারিগরি সফরে ‘আমলা কোটা’, বিদেশ গিয়ে কী করেন তারা

প্রতীকী ছবি
ড্রিল বিট, নজল— এসব গ্যাসকূপ খননের কারিগরি বিষয়। কোনটি ভালো, কোনটির মান খারাপ— যারা এসব নিয়ে কাজ করেন, তারাই তা সবচেয়ে ভালো বুঝবেন। সেখানে নন-টেকনিক্যাল কর্মকর্তারা কী বুঝবেন?
অথচ গ্যাসকূপ খননে ব্যবহৃত এসব যন্ত্রপাতির মান যাচাই করতে আজ রবিবার চীনে যাচ্ছে আট সদস্যের একটি দল। নেতৃত্বে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) পরিচালক মোহাম্মদ আসাদুল হক। যিনি জ্বালানি তেল বিপণনের দায়িত্বে।
দলের অন্যরা সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান সিলেট গ্যাস ফিল্ডস লিমিটেডের (এসজিএফএল) কর্মকর্তা হলেও আসাদুল হক প্রশাসন ক্যাডারের কর্মকর্তা; কারিগরি কাজের সঙ্গে তার প্রত্যক্ষ সম্পর্ক নেই। প্রেষণে বিপিসিতে আসা এই কর্মকর্তা কয়েক দিন পরই চলে যাবেন।
তবু তিনিই যাচ্ছেন কারিগরি যন্ত্রপাতির মান যাচাইয়ে। আসাদুল হক একা নন, এমন বিদেশ সফরে প্রশাসন ক্যাডারের নন-টেকনিক্যাল কর্মকর্তাদের উপস্থিতি যেন নিয়মে পরিণত হচ্ছে। তাদের সঙ্গে থাকেন নন-ক্যাডার কর্মকর্তারাও।
মন্ত্রণালয়ের বহু নন-টেকনিক্যাল কর্মকর্তা যন্ত্রপাতির মান যাচাই, কারিগরি প্রশিক্ষণ কিংবা নানা অসিলায় নিয়মিত বিদেশ সফর করছেন। গত দুই মাসেই বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ মন্ত্রণালয়ের অন্তত ২৪ কর্মকর্তা, জ্যেষ্ঠ সচিব থেকে উপসচিব পর্যন্ত বিদেশ গেছেন। তারা সফরে গিয়ে কাজের চেয়ে কেনাকাটা ও ঘোরাঘুরিতেই বেশি ব্যস্ত থাকেন।
এসব সফরের সুফল সংশ্লিষ্ট সংস্থার কোনো কাজেই আসে না। তারপরও সফর দলে তাদের রাখতে হয় অনেকটা বাধ্য হয়েই। কারণ বিদেশ সফরের জিওসহ প্রশাসনিক প্রক্রিয়ার চাবিকাঠি তাদের হাতেই। ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ও দাতা সংস্থাগুলোও সরকারি সুবিধা পেতে অনেক ক্ষেত্রে তাদের সফরসঙ্গী করে। ফলে কারিগরি কাজে প্রকৌশলী ও অভিজ্ঞদের বাদ দিয়ে জায়গা হয় নন-টেকনিক্যাল কর্মকর্তাদের।
সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই প্রতিকূল অর্থনৈতিক পরিস্থিতিতে অপ্রয়োজনীয় ব্যয় কমানোর ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে। সরকারপ্রধানও একাধিকবার অপ্রয়োজনীয় বিদেশ সফর পরিহারের নির্দেশনা দিয়েছেন।
কর্মকর্তাদের বিদেশ সফরসংক্রান্ত নীতিতেও মূল কথা হচ্ছে— সফরের বিষয় ও উদ্দেশ্যের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারাই যাবেন। কারণ বিদেশ সফরের উদ্দেশ্য নিছক ভ্রমণ নয়; সফর শেষে অর্জিত জ্ঞান, অভিজ্ঞতা ও প্রযুক্তি দেশে কাজে লাগানো। কিন্তু বাস্তবে যেন ‘কে শোনে কার কথা’ অবস্থা।
আগামী ৮ সেপ্টেম্বর জার্মানিতে রাষ্ট্রায়ত্ত কোল পাওয়ার জেনারেশন কোম্পানির বিদ্যুৎকেন্দ্রের বয়লার ফিড পাম্পের কার্টিজের মান যাচাই ও কারিগরি বৈঠকে যাচ্ছেন যুগ্মসচিব এ জে এম এরশাদ আহসান হাবীব। তিনি প্রকৌশলী নন, কাজটির সঙ্গেও তার প্রত্যক্ষ সংশ্লিষ্টতাও নেই। তার সঙ্গে যাচ্ছেন সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের নির্বাহী পরিচালক ও উপবিভাগীয় প্রকৌশলী।
চীন সফরের আরেকটি উদাহরণ আরও প্রশ্ন তোলে। গ্যাসকূপ খননের সময় সিমেন্টিং, মাড ইঞ্জিনিয়ারিং ও ড্রিল-স্টেম টেস্ট সরাসরি পর্যবেক্ষণ করতে গত ২৭ জুলাই ১০ দিনের সফরে যান ৯ কর্মকর্তা। তাদের মধ্যে সিলেট গ্যাস ফিল্ডসের সাত কর্মকর্তার সঙ্গে ছিলেন পেট্রোবাংলার প্রশাসন বিভাগের পরিচালক ও যুগ্মসচিব এস এম মাহবুব আলম এবং আরেক যুগ্মসচিব মোহাম্মদ রফিউল ফয়সাল— দুজনেরই এসব কারিগরি কাজের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতা নেই।
এর আগে ২৬ জুলাই সিলেট গ্যাস ফিল্ডসের ছয় কর্মকর্তা ও পেট্রোবাংলার একজনের সঙ্গে চীনে যান জ্বালানি বিভাগের প্রশাসনিক কর্মকর্তা সাবরিনা আফরিন মুস্তাফা; তিনি নিজেই ওই সফরের সরকারি আদেশ জারি করেছেন। গ্যাসকূপ বা বিদ্যুৎসংশ্লিষ্ট কারিগরি কর্মকর্তাদের প্রশ্ন, গ্যাসকূপ খননের মতো উচ্চ কারিগরি কাজ দেখতে গিয়ে একজন প্রশাসনিক কর্মকর্তা কী শিখবেন। তিনি কী বুঝবেন?
বিদেশ সফরের এই প্রবণতা শুধু চীনেই সীমাবদ্ধ নয়। ১১ জুলাই থেকে ১ আগস্ট পর্যন্ত ২২ দিনের কর্মসূচিতে যুক্তরাষ্ট্রে একাই গেছেন বিদ্যুৎ বিভাগের উপসচিব মোহাম্মদ সোলায়মান। ‘ইন্দো-প্যাসিফিক মহাসাগরীয় অঞ্চলের জন্য মার্কিন জ্বালানি নীতি’ শীর্ষক কর্মসূচিতেও মাঠপর্যায়ের কোনো প্রকৌশলী বা সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞকে নেওয়া হয়নি। যে জ্ঞান মাঠে কাজে লাগানোর কথা, সেই জ্ঞান অর্জনের সফরে মাঠের মানুষই যদি না থাকেন, তবে সফরের সার্থকতা কোথায়— এ প্রশ্ন মাঠপর্যায়ের প্রকৌশলীদের।
বিদেশ সফরের এমন উদাহরণ আরও আছে। ১৫ জুন বিদ্যুৎকেন্দ্রের যন্ত্রপাতি আমদানির আগে মান যাচাই করতে ইতালি যান বিদ্যুৎ বিভাগের উপসচিব (বর্তমানে যুগ্মসচিব) রোকসিন্দা ফারহানা। সফরের উদ্দেশ্য ছিল সিলেটের ২২৫ মেগাওয়াট বিদ্যুৎকেন্দ্রের কিছু যন্ত্রপাতির প্রি-শিপমেন্ট ইন্সপেকশন। তার সঙ্গে ছিলেন কেন্দ্রের ব্যবস্থাপক ও একজন সহকারী প্রকৌশলী। অর্থাৎ কাজটির সঙ্গে সরাসরি যুক্ত ছিলেন দুজন কারিগরি কর্মকর্তা। প্রশ্ন উঠেছে, তাদের সঙ্গে প্রশাসনিক কর্মকর্তাকে কেন যেতে হবে?
একইভাবে প্রশ্ন উঠেছে, সিঙ্গাপুর ও যুক্তরাষ্ট্র সফর নিয়েও। পিডিবির ২২৫ মেগাওয়াট বিদ্যুৎকেন্দ্রের মালপত্রের মান পরীক্ষা করতে সিঙ্গাপুরে গেছেন বিদ্যুৎ বিভাগের যুগ্মসচিব মো. মাহফুজুর রহমান, সঙ্গে ছিলেন সংশ্লিষ্ট দুই প্রকৌশলী।
আবার ১৫০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎকেন্দ্রের যন্ত্রপাতির মান যাচাইয়ে যুক্তরাষ্ট্রে গেছেন বিদ্যুৎ বিভাগের জ্যেষ্ঠ সহকারী সচিব রুনা লায়লা, অথচ তারও এ ধরনের কারিগরি জ্ঞান বা অভিজ্ঞতা নেই। ৫ জুলাই তেল-গ্যাসকূপ পরীক্ষা ও সংশ্লিষ্ট যন্ত্রপাতির রক্ষণাবেক্ষণ প্রশিক্ষণে মালয়েশিয়ায় গেছেন জ্বালানি বিভাগের জ্যেষ্ঠ সচিব রফিকুল ইসলাম।
তার সঙ্গে ছিলেন সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের তিন কর্মকর্তা। অর্থাৎ কারিগরি প্রশিক্ষণ থেকে যন্ত্রপাতির মান পরীক্ষা— সবখানেই যেন নন-টেকনিক্যাল কর্মকর্তাদের জন্য একটি অদৃশ্য আসন সংরক্ষিত।
বিদেশ সফরের তালিকা আরও দীর্ঘ। ৭ থেকে ২৪ জুলাই জাপানে নবায়নযোগ্য জ্বালানি নিয়ে ‘নলেজ কো-ক্রিয়েশন প্রোগ্রাম’-এ অংশ নিয়েছেন বিদ্যুৎ খাতের ছয় কর্মকর্তা, যাদের কাজের সঙ্গে প্রশিক্ষণের সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে। তাদের সঙ্গে ছিলেন বিদ্যুৎ বিভাগের জ্যেষ্ঠ সহকারী সচিব মো. নাজমুল হামিদ রেজা।
পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ডের একটি ক্রেনের মান পরীক্ষা করতে ৭ জুন ফিনল্যান্ডে যাওয়া তিন কর্মকর্তার মধ্যে দুজন ছিলেন নির্বাহী প্রকৌশলী। তাদের সঙ্গে ছিলেন সংস্থাটির সদস্য ও যুগ্মসচিব নাজমুল সায়াদাত, যার কারিগরি দক্ষতা নেই।
একইভাবে ৩৩ কেভি ইনডোর টাইপ গ্যাস ইনসুলেটেড সুইচগিয়ারের মান যাচাইয়ে ২০ জুন জার্মানি যান সংস্থাটির অর্থ ও হিসাব শাখার নিয়ন্ত্রক মো. ইদ্রিস। অর্থাৎ যে যন্ত্রের মান যাচাই করতে প্রকৌশলীর প্রয়োজন, সেখানে কখনো প্রশাসন, কখনো হিসাব— সবারই যেন জায়গা আছে; শুধু জায়গাটা অনিশ্চিত প্রকৌশলীর।
মালয়েশিয়াতে গত ১৮ থেকে ২৪ জুলাই জ্বালানি রূপান্তরবিষয়ক প্রশিক্ষণে বিদ্যুৎ-জ্বালানি বিভাগের সংস্থাগুলোর কোনো প্রকৌশলী যাননি— গিয়েছিলেন উপসচিব এস এম জাকারিয়া।
ফেনীর সোনাগাজীতে ১৩০ মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্পের জন্য আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীদের সঙ্গে মতবিনিময় করতে গত ১৫ জুন তিন দিনের সফরে সিঙ্গাপুরে যান অতিরিক্ত সচিব কে এম আলী রেজা।
দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার নতুন জ্বালানি এবং টেকসই উন্নয়নবিষয়ক সাত দিনের একটি আন্তর্জাতিক শিক্ষা সফরে অংশ নিতে বাংলাদেশ থেকে গত ২৯ জুন চীনে গিয়েছিলেন সাত আমলা। তাদের মধ্যে দুজন যুগ্মসচিব, দুজন উপসচিব এবং তিনজন জ্যেষ্ঠ সহকারী সচিব। প্রকৌশলী কিংবা মাঠপর্যায়ে কাজে যুক্ত কাউকেই রাখা হয়নি।
ভোক্তা অধিকার সংগঠন ক্যাবের জ্বালানি উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. এম শামসুল আলমের বক্তব্যেও উঠে এসেছে মূল সমস্যাটি। তার মতে, বিদ্যুৎ-জ্বালানি খাতের মাঠপর্যায়ের কাজ বাস্তবায়ন করেন প্রকৌশলীরাই। যন্ত্রপাতি পরীক্ষা, কারিগরি প্রশিক্ষণ কিংবা সংশ্লিষ্ট কাজে বিদেশ যাওয়ার প্রয়োজন হলে তাদেরই যাওয়ার কথা। কিন্তু সেখানে মন্ত্রণালয়ের লোকজন ঢুকে পড়লে জবাবদিহির ঘাটতি তৈরি হয়। কর্মকর্তারা রাষ্ট্রের সুবিধার চেয়ে ব্যক্তিগত সুবিধাকে প্রাধান্য দিলে তা রাষ্ট্রীয় অর্থের অপচয়।
জ্বালানি বিশেষজ্ঞের প্রশ্নটিও সরল— একজন মন্ত্রণালয় কর্মকর্তাকে কেন কারিগরি কাজে বিদেশ যেতে হবে? নীতিগত সংস্কার করতে হলে বিদেশ সফর নয়; প্রয়োজন সংশ্লিষ্ট বিষয়ে পড়াশোনা, প্রশিক্ষণ ও প্রস্তুতি। ইন্টারনেটের এই যুগে প্রাথমিক জ্ঞান অর্জনের উপায়ও হাতের নাগালে।
সাবেক এক মন্ত্রিপরিষদসচিব আগামীর সময়কে বলেছেন, সরকারের অর্থনৈতিক সংকটের সময়ে প্রতিটি সরকারি ব্যয়ের হিসাব চাইতে হবে। বিদেশ সফর যদি সত্যিই প্রয়োজনীয় হয়, সংশ্লিষ্ট প্রকৌশলী ও বিশেষজ্ঞই যাবেন; সফর শেষে কী শিখলেন, কীভাবে তা কাজে লাগালেন— তারও হিসাব দিতে হবে। না হলে বিদেশ সফর জ্ঞান অর্জনের কর্মসূচি না হয়ে উঠবে সরকারি অর্থে ভ্রমণের আরেক নাম।



