৫০ বছর ধরে বর্জ্যমুক্ত রাখছেন রাস্তা-বাজার

ফুলবাড়িয়ার বাবুগঞ্জ বাজারের ময়লা-আবর্জনা পরিষ্কার করছেন সত্তরোর্ধ্ব হযরত আলী
ময়মনসিংহের ফুলবাড়িয়ায় রাঙ্গামাটিয়ার বাবুগঞ্জ বাজার। উপজেলার অন্যতম পরিচ্ছন্ন স্থান হিসেবেও বেশ পরিচিত। সকাল বা রাত— কখনো এখানে রাস্তা বা গলিতে পাওয়া যায় না ময়লা-আবর্জনা। চলতে-ফিরতে পায়ে আটকাবে না কোনো কাগজ বা পলিথিন। কিন্তু এ কাজের জন্য নির্দিষ্ট করা নেই কোনো কর্মচারী, কাউকে দেওয়া হয় না বেতন-ভাতা। এরপরও নিয়মিত বর্জ্যমুক্ত থাকছে পুরো বাজার ও আশপাশের রাস্তা। এসবই হচ্ছে সত্তরোর্ধ্ব হযরত আলীর হাতের ছোঁয়ায়।
৫০ বছর ধরে বাজারটি পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখছেন উপজেলার রাঙ্গামাটিয়া ইউনিয়নের পাহাড় অনন্তপুর গ্রামের হযরত আলী (৭৩)। বয়সের ভারে কুঁচকে গেছে শরীরে চামড়া। কানেও শোনেন কম। শারীরিক জটিলতাও অনেক। তবে এসবের কিছুই থামাতে পারেনি তার পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার কাজ। সকাল থেকে এশার নামাজের আগ পর্যন্ত ঘুরে ঘুরে পরিষ্কার করছেন বাজারের ময়লা-আবর্জনা। এর জন্য কারও কাছে কখনো চান না মজুরি। স্ত্রী-সন্তানসহ তিনজনের সংসারে বছর জুড়েই টানাপড়েন চললেও নেই কোনো চাহিদা।
২০-২২ বছর বয়স থেকে বাড়ির আশপাশ, রাস্তাঘাট ও বাজার পরিচ্ছন্নতার কাজ করছেন হযরত। ধীরে ধীরে এটি তার নেশায় পরিণত হয়। ঝড়-বৃষ্টি নেই, রাত-দুপুরও দেখেন না তিনি। অসুস্থ না হলে প্রতিদিন সকাল থেকে রাত পর্যন্ত ঘুরে ঘুরে বাজারে পড়ে থাকা কাগজ, পলিথিন, ময়লা-আবর্জনা কুড়িয়ে বস্তায় ভরে ফেলেন নির্দিষ্ট স্থানে।
বাবুগঞ্জ বাজারের দৈর্ঘ্য প্রায় ৩০০ মিটার। পৃথক মৌজা ও বাজারটির মাঝ দিয়ে বয়ে গেছে বানার খাল। বাজারে দোকান রয়েছে প্রায় দুইশ। সরকারি দ্বিতল একটি বিশাল মার্কেটও আছে। এখানে প্রতিদিন যত বর্জ্য তৈরি হয়, সেগুলো হেঁটে হেঁটে বস্তায় নিয়ে বাজার লাগোয়া ভাগাড়ে ফেলেন হযরত। কাজ করতে করতে যখন ক্লান্তি আসে, ইউনিয়ন পরিষদের বারান্দায় শুয়ে একটু বিশ্রাম নেন।
হযরত আলীর একমাত্র ছেলে দিনমজুর। অন্যের বাড়িতে কাজ করেন স্ত্রী। এরপরও কোনো হতাশা বা উচ্চাকাঙ্ক্ষা নেই এই বৃদ্ধের। কষ্ট করে চললেও আপত্তি নেই পরিবারের কোনো সদস্যের। তারা প্রথম দিকে মাঝেমধ্যে বাধা দিলেও এখন উপভোগ করেন।
হযরত আলী জানালেন, যুবক বয়সে বাড়ির আশপাশ ও রাস্তাঘাট ঝাড় দিয়ে পরিষ্কার করতেন। সেই থেকে এ কাজকে ভালোবেসে ফেলেন। একপর্যায়ে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা নেশায় পরিণত হয়। রাস্তাঘাটে কাগজ, পলিথিন বা যেকোনো ময়লা পড়ে থাকলে সহ্য করতে পারেন না তিনি।
বাবুগঞ্জ বাজার বণিক সমবায় সমিতির সভাপতি ওবাদুল ইসলাম চৌধুরী পান্না বলেছেন, হযরত আলী অত্যন্ত ভালো মানুষ। তিনি নিজ থেকে ৫০ বছর ধরে বাজারের ময়লা-আবর্জনা পরিষ্কার করেন। সকালে বাড়ি থেকে চলে আসেন, রাত পর্যন্ত বর্জ্য কুড়িয়ে নির্দিষ্ট স্থানে ফেলেন। শুধু দুপুরে বাড়িতে গিয়ে খেয়ে আসেন। পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা কাজের বিনিময়ে তার কোনো চাহিদাও নেই।
রাঙ্গামাটিয়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান রফিকুল ইসলাম মুক্তা চৌধুরী বললেন, ‘ছোটবেলা থেকেই দেখে আসছি, ঝড়-বৃষ্টি নেই, প্রতিদিন সকাল থেকে রাত পর্যন্ত টানা বাজারের ময়লা-আবর্জনা পরিষ্কার করেন হযরত আলী। হতদরিদ্র মানুষ, তারপরও অন্য কোনো কাজ করেন না। এই মহতী কাজটি করছেন। ক্লান্ত হয়ে পড়লে পরিষদের বারান্দায় শুয়ে বা বসে বিশ্রাম নেন। মাঝেমধ্যে আমরা খাবার কিনে দিই। ইউনিয়ন পরিষদ থেকেও দেওয়ার চেষ্টা করি বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা।’



