রেলওয়ের ৬ কোটি টাকার গোপন দর ফাঁস, কাজ সেই আফসারের হাতে
- দর ফাঁসে কারও বিরুদ্ধে নেয়নি কোনো ব্যবস্থা
- ঠিকাদারের চিঠিতেই টেন্ডার টুকরো টুকরো

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
বাংলাদেশ রেলওয়ের লোকোমোটিভের (ইঞ্জিন) গুরুত্বপূর্ণ ট্রাকশন মোটর মেরামতকাজের গোপন প্রাক্কলিত দর (সম্ভাব্য ব্যয়) এক ঠিকাদারের কাছে ফাঁস করেছেন রেলওয়ের কিছু কর্মকর্তা-কর্মচারী। দরপত্র মূল্যায়ন শেষে দেখা যায়, যাদের কাছে তথ্য ফাঁস করা হয়েছে, সেই ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানই সাড়ে ছয় কোটি টাকার কাজ পেয়ে গেছে। আর এই কারসাজির ঘটনা ঘটেছে চট্টগ্রামের পাহাড়তলী রেলওয়ের প্রধান সরঞ্জাম নিয়ন্ত্রকের কার্যালয়ে।
গত ২৩ জুন ৩৪টি ট্রাকশন মোটর মেরামতের কাজটি শ্রীজা মেটাল ইন্ডাস্ট্রিজকে কার্যাদেশ দেওয়া হয়েছে। চুক্তিমূল্য ধরা হয় ৬ কোটি ৪৫ লাখ ৫২ হাজার টাকা। এর মালিক আফসার আলী বিশ্বাস।
২০২০ সালের ২০ অক্টোবর জাতীয় সংসদ ভবনে অনুষ্ঠিত রেলপথ মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটির বৈঠকে রেলের কেনাকাটায় নির্দিষ্ট গুটিকয়েক ঠিকাদারের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে আলোচনা হয়। তখন সংসদীয় কমিটির সদস্যরা অভিযোগ করেছিলেন, ৩৮টি প্রতিষ্ঠান কাজ পেলেও প্রকৃতপক্ষে পাঁচ-সাতজন এসব প্রতিষ্ঠানের মালিক। এরাই রেলের যাবতীয় দরপত্র নিয়ন্ত্রণ করে। সেই বৈঠকে ঠিকাদার আফসার আলী বিশ্বাসের নাম উঠে আসে।
দরপত্রের গোপন প্রাক্কলিত ব্যয় ফাঁস হওয়ার বিষয়টি স্বীকার করেছেন দরপত্র আহ্বানকারী কর্মকর্তা ও রেলওয়ের প্রধান সরঞ্জাম নিয়ন্ত্রক বেলাল হোসেন সরকার। তিনি আগামীর সময়কে বলেছেন, ‘ফাইল অনেক জায়গায় স্বাক্ষর হয়, সেখান থেকে হয়তো ফাঁস হয়েছে। ট্রাকশন মোটরের কাজটি জরুরি, তাই দরপত্রের কার্যক্রম এগিয়ে নেওয়া হয়েছে।’ ঠিকাদারের চিঠির পর দরপত্রের শর্ত পরিবর্তন প্রসঙ্গে এই কর্মকর্তা বলেছেন, যা হয়েছে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশে হয়েছে।
দরপত্র জমা দেওয়ার আগে দর ফাঁসের এ তথ্য রেলওয়ের কর্মকর্তারা জানলেও কারও বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেয়নি। উল্টো দরপত্র মূল্যায়নের পর ওই ঠিকাদারকে যোগ্য দরদাতা হিসেবে নির্বাচিত করে কার্যাদেশ দিয়ে দেওয়া হয়। এ ছাড়া দরপত্র জমা দেওয়ার আগে ওই ঠিকাদারের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে দরপত্রের শর্তেরও পরিবর্তন করা হয়। এতে সরকারি ক্রয় আইন ও সরকারি গোপন আইনের লঙ্ঘন হয়েছে বলে জানিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।
এ প্রসঙ্গে সেন্ট্রাল প্রকিউরমেন্ট টেকনিক্যাল ইউনিটের (বর্তমানে বাংলাদেশ পাবলিক প্রকিউরমেন্ট অথরিটি) সাবেক মহাপরিচালক অমূল্য কুমার দেবনাথ আগামীর সময়কে বলেছেন, ‘যেকোনো সরকারি কেনাকাটার প্রাক্কলিত দর গোপনীয়। এটি ফাঁস হওয়া মানে কর্মকর্তারা সরকারি কর্তব্যের অবহেলা করেছেন। জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে শাস্তির বিষয়ে আইনে স্পষ্ট উল্লেখ আছে। দরপত্র জমা দেওয়ার আগে শর্ত পরিবর্তন করা যেতে পারে। তবে কোনো প্রতিষ্ঠানকে সুবিধা দেওয়ার জন্য শর্ত পরিবর্তন করার সুযোগ নেই। একইভাবে কোনো প্রতিষ্ঠানকে সুবিধা দিতে প্যাকেজ ভাগ করাও পিপিআরের লঙ্ঘন।’
গোপন দর আগেই ঠিকাদারের পকেটে: পাবলিক প্রকিউরমেন্ট রুলস (পিপিআর) ২০০৮-এর বিধি ৩১ এবং পাবলিক প্রকিউরমেন্ট অ্যাক্ট (পিপিএ) ২০০৬-এর ধারা ১৮ অনুযায়ী, দরপত্র উন্মুক্ত হওয়ার আগে কাজের দাপ্তরিক প্রাক্কলিত ব্যয় সম্পূর্ণ গোপন থাকার কথা। সরকারি গোপন আইন ১৯২৩-এর ধারা ৫ অনুযায়ী কোনো গোপন তথ্য অনুমোদনহীন ব্যক্তিকে জানানো অপরাধ। কিন্তু রেলওয়ের নথিতে দেখা যায়, দরপত্র চলাকালে ‘মেসার্স শ্রীজা মেটাল ইন্ডাস্ট্রিজ’ রেলওয়েকে চিঠি দিয়ে জানতে চায়, দরপত্রে প্রাক্কলিত মূল্যের ৮০ শতাংশ অর্থাৎ ৪ কোটি ৭৬ লাখ টাকার অভিজ্ঞতা চাওয়া হয়নি কেন? জবাবে রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ নথিতে উল্লেখ করে, দাপ্তরিক প্রাক্কলিত ব্যয় সম্পূর্ণ গোপনীয় তথ্য।
তবে রেলওয়ের অনুমোদিত প্রাক্কলনের নথির সঙ্গে ঠিকাদারের চিঠির অঙ্ক মিলিয়ে দেখা যায়, ৩৪টি মোটর মেরামতের অনুমোদিত প্রাক্কলিত ব্যয় ছিল ৫ কোটি ৯৫ লাখ টাকা। এর ঠিক ৮০ শতাংশ হিসাব করলে দাঁড়ায় ৪ কোটি ৭৬ লাখ টাকা। হুবহু এ অঙ্ক মিলে যাওয়ায় তথ্য ফাঁসের বিষয়টি আরও স্পষ্ট হয়।
ঠিকাদারের চিঠিতেই টেন্ডার টুকরো টুকরো: একই নথিতে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান শ্রীজা মেটালের আরেকটি আপত্তির জবাবে রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ দরপত্র ভাগ করার বিষয়টি স্বীকার করেছে। পূর্বে ১৩০টি ট্রাকশন মোটর মেরামতের জন্য দরপত্র আহ্বান করা হলেও পরে তা ভেঙে ৩৪টি ও ৯৭টির দুটি আলাদা লট করা হয়। এর কারণ হিসেবে রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ নথিতে বাজেট স্বল্পতার কথা উল্লেখ করে। পিপিআর ২০০৮-এর বিধি ১৭ অনুযায়ী, বড় ক্রয়কে কৃত্রিমভাবে ছোট ছোট ভাগে ভেঙে প্রতিযোগিতা বা আর্থিক সীমাসংক্রান্ত আইন এড়ানো যাবে না।
বিপিপিএর ওয়েবসাইটে প্রকাশিত কার্যাদেশের নোটিশ অনুযায়ী, শ্রীজা মেটালের ঠিকানা হলো ঢাকার বিজয় নগরের আকরাম টাওয়ারের অষ্টম তলার ১ ও ২ নম্বর স্যুট। অনুসন্ধানে দেখা যায়, আফসার আলী বিশ্বাসের মালিকানাধীন আরেক প্রতিষ্ঠান ‘বিশ্বাস কনস্ট্রাকশন’-এর ঠিকানাও হুবহু একই। অর্থাৎ, ভিন্ন ভিন্ন নামে প্রতিষ্ঠান খোলা হলেও এগুলো একই জায়গা থেকে নিয়ন্ত্রিত হচ্ছে, যা সংসদীয় কমিটিতে ওঠা অভিযোগের সঙ্গে মিল পাওয়া যায়।
এ বিষয়ে শ্রীজা মেটাল ইন্ডাস্ট্রিজ ও বিশ্বাস কনস্ট্রাকশনের স্বত্বাধিকারী আফসার আলী বিশ্বাস আগামীর সময়কে বলেছেন, ‘প্রাক্কলিত দর কোনো গোপন বিষয় না। এটা ওপেন সিক্রেট। কাজটি পিপিআর অনুযায়ী পেয়েছি। মিথ্যা তথ্য দিয়ে কাজটি আটকে দেওয়ার চেষ্টা হচ্ছে।’
এক দশকের ফাইল খুঁজছে দুদক: ট্রাকশন মোটর মেরামতে অনিয়মের এসব অভিযোগের পর দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) একটি অনুসন্ধান দল গঠন করেছে গত ৮ মার্চ। দুদকের চিঠিতে বর্তমান দরপত্রটির পাশাপাশি গত এক দশকে সম্পন্ন হওয়া আরও কয়েকটি কাজের নথিপত্র তলব করা হয়েছে। এর মধ্যে ২০১৫, ২০১৭, ২০১৮ এবং ২০১৯ সালে সম্পন্ন হওয়া পাঁচটি ভিন্ন ভিন্ন ট্রাকশন মোটর ও আর্মেচার মেরামতের চুক্তির যাবতীয় রেকর্ডপত্র, বিল-ভাউচার, পেমেন্ট রেকর্ড এবং পারফরম্যান্স সার্টিফিকেট চাওয়া হয়েছে।



