দেশে সরকারি ব্যাংকের ইতিহাসে প্রথম নজির
জনতা ব্যাংকে মহাদুর্নীতি, ভেঙে দেওয়া হচ্ছে বোর্ড

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
রাষ্ট্রায়ত্ত জনতা ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ ও ব্যবস্থাপনা কমিটি একসঙ্গে ভেঙে দেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। দেশের ইতিহাসে এই প্রথম কোনো সরকারি ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ ভাঙার এমন পথে হাঁটছে ব্যাংক খাতের নিয়ন্ত্রক সংস্থাটি। জনতা ব্যাংক ঘিরে অনিয়মের ভয়াবহ সব চিত্র বেরিয়ে আসায় এমন পদক্ষেপ। অনিয়মে ডুবে এরই মধ্যে ব্যাংকটির ৭৫ শতাংশ ঋণই খেলাপি, এবার তার চেয়েও বড় জালিয়াতির তথ্য মিলেছে। ব্যাংকের প্রধান কার্যালয় থেকে উপশাখা, দেশ কিংবা বিদেশ— সব স্তরেই অনিয়মের ছাপ।
এসবের মধ্যে রেমিট্যান্সের প্রণোদনা আত্মসাৎ, এলসির (ঋণপত্র) ভুয়া কমিশন, কেন্দ্রীয়ভাবে স্বয়ংক্রিয় যন্ত্রের ঝুঁকিপূর্ণ ব্যবহার, অস্তিত্বহীন ল্যাপটপ কেনা, বৈদেশিক হিসাবে লেনদেনে সমন্বয়হীনতার মাধ্যমে শত শত কোটি টাকা লোপাট, হলমার্কসহ হাজারো গ্রাহকের অদাবিকৃত বিপুল অর্থ কুক্ষিগত এবং গোঁজামিলে রাষ্ট্রীয় অর্থ অপচয় অন্যতম। আর অনিয়ম-দুর্নীতির নেপথ্যের দরজা খোলা রেখেছেন খোদ ব্যাংকটির পরিচালনা পর্ষদ, ব্যবস্থাপনা কমিটিসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। পরিস্থিতি এতটাই জটিল, এসব অনিয়মের দায় প্রমাণিত হওয়ায় পর্ষদ ভেঙে দেওয়ার মতো কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংক পরিদর্শন দল গত জুনে জনতা ব্যাংকের অনিয়ম নিয়ে শুরু করে তদন্ত। দফায় দফায় অনুসন্ধানের পর তৈরি করে প্রতিবেদন। যেখানে উঠে এসেছে অনিয়ম, জালিয়াতি, দুর্নীতির ভয়াবহ এক চিত্র। এমন প্রেক্ষাপটে জনতা ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ ও ব্যবস্থাপনা কমিটির সঙ্গে একাধিক বৈঠক করে বাংলাদেশ ব্যাংক। বৈঠকে কোনো যৌক্তিক কারণ এবং উপযুক্ত জবাব দিতে ব্যর্থ হয় জনতা ব্যাংক কর্তৃপক্ষ। ফলে গর্ভনর বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে নিয়ে ফের বোর্ডকে জবাব দিতে ১৫ দিনের সময় বেঁধে দেন। কিন্তু ব্যাংক এবারও ব্যর্থ হয় সন্তোষজনক জবাব দিতে। যার ফলে অনুসন্ধান দল ব্যাংকটির পরিচালনা পর্ষদ ও ব্যবস্থাপনা কমিটি ভেঙে দেওয়ার সুপারিশ করে। কিন্তু বাংলাদেশ ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট বিভাগের নির্বাহী পরিচালক ও ডেপুটি গভর্নর গত সপ্তাহে ব্যাংকটিকে যথাযথ পদক্ষেপ নেওয়ার জন্য চিঠি পাঠান। যদিও গতকাল বুধবার সন্ধ্যা পর্যন্ত জনতা ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ বা ব্যবস্থাপনা কমিটি কোনোটিই ভেঙে দেওয়া হয়নি। উল্টো ব্যাংকটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) বলছেন, তারা এরই মধ্যে বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রশ্নের জবাব দিয়েছেন। আলোচনা করে আরও ‘ভালো করে’ জবাব দেওয়া হবে।
জনতা ব্যাংকের তথ্যই বলছে, ১০ বছরের বেশি ইন-অপারেটিভ (চলমান) হিসাব স্বয়ংক্রিয়ভাবে গ্রাহকের তথ্য শনাক্ত করতে পারছে না ব্যাংকটির কোর ব্যাংকিং সফটওয়্যার (সিবিএস)। এতে ১০ বছরের বেশি সময় অদাবিকৃত আমানত শনাক্ত করতে না পারার সমস্যা সমাধানে পদক্ষেপ নিতে ব্যর্থ হচ্ছে ব্যাংক কর্তৃপক্ষ। ফলে বর্তমান সিবিএসের মাধ্যমে ব্যাংকটির শাখাভিত্তিক অদাবিকৃত তথ্য পেতে সংকট কাটছে না। এ নিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিদর্শন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ব্যাংকটির সিবিএসে অদাবিকৃত আমানত চিহ্নিতের সুযোগ না থাকায় বড় জালিয়াতি ও পাচারের সুযোগ রয়েছে। আর ব্যাংকটির ২০০৯ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত সময়ের সঠিক তথ্য সংগ্রহ করা যাচ্ছে না। এতে ব্যাংক ব্যবস্থাপনার দক্ষতা না থাকা উদ্দেশ্যপ্রণোদিত প্রতীয়মান হয়েছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ইডিএফের মেয়াদান্তে বাংলাদেশ ব্যাংক জনতা ব্যাংকের এফসি ক্লিয়ারিং অ্যাকাউন্ট ডেবিট করার অথবা শাখার মাধ্যমে ঋণপত্রের মেয়াদান্তে মূল্য পরিশোধে নস্ট্রো অ্যাকাউন্ট (বিদেশে বাংলাদেশের কোনো ব্যাংকের হিসাব) নগদায়নের পর গ্রাহকের নামে দায় সৃষ্টির নিয়ম মানেনি ব্যাংকটি। একইভাবে ইডিএফের (রপ্তানি উন্নয়ন তহবিল) অসমর্থিত এন্ট্রিগুলো সমন্বয় করা হয়নি। গত ৩০ জুন স্থানীয় কার্যালয় থেকে পাঠানো অ্যাডভাইসের মাধ্যমে ইডিএফের অসমর্থিত ৪ কোটি ৯৫ লাখ ২৭ হাজার ৬৫৩ মার্কিন ডলারের মধ্যে ৪ কোটি ৪৩ লাখ ৬৪ হাজার মার্কিন ডলার সমন্বয় হয়েছে। বিষয়টিতে ব্যাংক ব্যবস্থাপনা ও পরিচালনা পর্ষদের অদক্ষতা ও অকার্যকারিতা পরিলক্ষিত হয়।
নথিপত্র বলছে, জনতা ভবন করপোরেট শাখা নস্ট্রো হিসাব থেকে ডেবিটকৃত অর্থের বিপরীতে যথাসময়ে ফোর্সড (ডিমান্ড) লোন সৃষ্টি করা হয়নি। ঋণগুলো যথাসময়ে সৃষ্টি না করায় একদিকে গ্রাহকের প্রতি ব্যাংকের প্রাপ্য অর্থের দায় সৃষ্টি করা হয়নি। আবার শাখার যথাযথ সুদ আয় হিসাবায়ন হয়নি। ওরিয়ন অয়েল অ্যান্ড শিপিং লিমিটেডের প্রাপ্য অর্থ বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (বিপিডিবি) থেকে আদায়ে ব্যাংক ব্যবস্থাপনার উদ্যোগ পর্যাপ্ত প্রতীয়মান হয়নি। বিপিডিবির দেওয়া সম্মতিপত্রের পরিপ্রেক্ষিতে ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদের মঞ্জুরি করা ঋণসীমার আওতায় ওরিয়ন অয়েল অ্যান্ড শিপিং লিমিটেডের পক্ষে আমদানির জন্য বিশেষ এলসি খোলা হয় এবং প্রতিষ্ঠানটির বিলের মাধ্যমে দায় সমন্বয় করা হয়। বকেয়া ৮ হাজার ৩০৭ কোটি টাকায় সৃষ্টি গ্রাহকের এগ্রো হিসাবে এখন পর্যন্ত পরিশোধ করা হয়নি। এতে গ্রাহকের হিসাবে সৃষ্ট নস্ট্রো ডেবিট দায় ৮ হাজার ৩১৬ কোটি টাকা সমন্বয় করা যাচ্ছে না। আর বেক্সিমকো গ্রুপভুক্ত প্রতিষ্ঠানগুলোর নামে যথাসময়ে ডিমান্ড লোন সৃষ্টি না করার কারণে ব্যাংকটি প্রায় ৮ হাজার ২০০ কোটি টাকার সুদ আদায়ের সুযোগ থেকে বঞ্চিত হয়েছে। একইভাবে ওরিয়ন অয়েল অ্যান্ড শিপিং লিমিটেডের নামে যথাসময়ে ডিমান্ড লোন সৃষ্টি না করার কারণে প্রায় ৪৭০ কোটি টাকা সুদ আদায়ের সুযোগ থেকে বঞ্চিত হয়েছে। অর্থাৎ সঠিক ব্যাংকিং নিয়মাচার পরিপালন না করার কারণে প্রায় ৮ হাজার ২৭০ কোটি টাকার সুদ আদায় হয়নি।
নথিপত্র বলছে, সংযুক্ত আরব আমিরাতে (ইউএই) জনতা ব্যাংকের দুটি শাখায় ৪১ দশমিক ৪৮ মিলিয়ন আমিরাতি দিরহাম শ্রেণিকৃত ঋণ রয়েছে। ওই ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের দায় ছিল বাংলাদেশি মুদ্রায় ৪ কোটি ৩৯ লাখ টাকা। আবার ঋণের মধ্যে শেখ খলিফা ফান্ডের ফাইন্যান্স মার্জিন, মেট্রোপলিটন এন্টারপ্রাইজ ও শেখ খলিফা বিন জায়েদ আল-নাহিয়ানের নামে দীর্ঘমেয়াদি ১৪২ দশমিক ৮৮ মিলিয়ন (৩০৪ কোটি টাকা) অবলোপন করা রয়েছে, যা উদ্বেগজনক।
বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিদর্শনে উঠে এসেছে, ব্যাংকটির ট্রেজারি ডিপার্টমেন্টের সরবরাহ করা তথ্য অনুসারে ২০২৫ সালের ১ অক্টোবর ব্যাংকটির ৫৮টি শাখার ৪৮৮টি হিসাবে ১০ বছর ও তার বেশি সময় ধরে অদাবিকৃত আমানতের পরিমাণ ৯৪ কোটি টাকা। ওই বিবরণীতে ব্যাংকটির স্থানীয় কার্যালয়সহ অনেক শাখার তথ্য উল্লেখ ছিল না।
জনতা ব্যাংক, ইউএইর প্রধান কার্যালয়ে বিভিন্ন খাতে খরচের সর্বোচ্চ অনুমোদিত সীমার চেয়ে প্রকৃত ব্যয় উল্লেখযোগ্য পরিমাণ বেশি দেখা গেছে। আবার প্রধান নির্বাহীর কার্যালয়ে ২০২০ সালের ২৭ মে লিবার্টি কম্পিউটার্স এলএলসি থেকে ২১ হাজার ৮৯২ দিরহামে ছয়টি ল্যাপটপ কেনা হয়। কিন্তু সেগুলোর কোনো অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি। দেশটিতে জনতা ব্যাংকের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তার কার্যালয়ে ১২ কর্মকর্তার মধ্যে তিনজন ভারতীয় নাগরিক অনুমোদন ছাড়া নিয়োগ দেওয়া হয়।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, জনতা এক্সচেঞ্জ কোম্পানি ইতালির রোমে। এর প্রধান কার্যালয় ও রোম শাখা আগে একই এলাকায় ছিল। কিন্তু ২০১৭ সালে কোনো বোধগম্য কারণ ছাড়াই দুটি আলাদা অফিস করা হয়েছে। অন্যদিকে ইতালিতে জনতা এক্সচেঞ্জ কোম্পানি এসআরএল, ইতালি থেকে পাঠানো বৈদেশিক রেমিট্যান্স ব্যাংকটির দিলকুশা করপোরেট শাখার ‘সান্দ্রি অ্যাকাউন্ট-অ্যাডভান্স পেমেন্ট টু ট্রান্সফার’ খাত থেকে অগ্রিম পরিশোধ করা হয়।
জনতা ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) মো. মজিবর রহমান অদক্ষতা ও ত্রুটির বিষয়টি স্বীকারও করলেন। আগামীর সময়কে তিনি বললেন, ‘বাংলাদেশ ব্যাংকের পদক্ষেপের বিষয়টি সবার জানা। আমরা জবাব দিয়েছি। সংশ্লিষ্ট বিভাগের কর্মকর্তাদের নিয়ে আপত্তির বিষয়গুলো সম্পর্কে আলোচনা হয়েছে। পরে ভালো করে জবাব দেওয়া হবে। আর হলমার্কের ৮০ কোটি টাকার মতো অদাবিকৃত অর্থ আদালতে মামলা থাকায় ফেরত দেওয়া যাচ্ছে না। আদালতের আদেশ পেলে তা সমন্বয় করা হবে। আর নস্ট্রো হিসাবে যে অনিয়মের কথা বলা হয়েছে, তা সিস্টেমের ত্রুটির কারণে হয়েছে। এটা সামনে দূর করা হবে। যদিও এভাবে ব্যাংক চালাতে ঝুঁকি থাকে।’
এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বললেন, ‘সংযুক্ত আরব আমিরাতে মূলধন বাড়ানো হয়েছে। মাদার ব্যাংক হিসাবে ২ বিলিয়ন দিরহাম সমপরিমাণ অর্থ নিশ্চিত করতে বলা হয়েছে। তাতে অর্থ মন্ত্রণালয় সম্মতি দিয়েছে। আমরা খেলাপি আদায়ে মনোযোগ দিচ্ছি। এক্সিট পলিসির মাধ্যমে আদায় বাড়ানোর চেষ্টা করছি।’
বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র ও নির্বাহী পরিচালক আরিফ হোসেন খানের ভাষ্য, ‘বাংলাদেশ ব্যাংক সবসময় অনিয়মের বিপক্ষে। সেটা চব্বিশের গণঅভ্যুত্থান-পূর্ববর্তী কিংবা পরবর্তী হোক। আর বিদেশে অনিয়ম হলে তা তো পার পাবে না। আইন মেনে সব করা হবে। কোনো অপরাধী যেন পার না পায়। অপরাধীর কোনো পরিচয় দেখে না বাংলাদেশ ব্যাংক।’



