রোবটের দেশি কারিগর

ছবি: আগামীর সময়
চারটি রোবট ও ডিভাইস বানিয়ে সাড়া ফেলেছেন ইরান সরদার। ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির এই শিক্ষার্থীকে নিয়ে লিখেছেন মোফাজ্জল হোসেন
গৈলা। বরিশালের আগৈলঝাড়া উপজেলার এক প্রত্যন্ত গ্রাম। এখানেই ২০০৫ সালে জন্ম নেন ইরান সরদার। শুরুতে রোবট সম্পর্কে কিছুই জানতেন না। ২০১৭ সালের ৬ ডিসেম্বর বিশ্বখ্যাত মানবাকৃতির রোবট ‘সোফিয়া’কে বাংলাদেশে প্রথম নিয়ে আসা হয়। ইরান তখন অষ্টম শ্রেণির ছাত্র। তখনই রোবটিকস নিয়ে তার মনে কৌতূহল জাগে। মানবাকৃতির রোবট তৈরির স্বপ্ন বুনতে শুরু করেন তিনি। সেই স্বপ্ন তাকে প্রতিদিন নতুনভাবে অনুপ্রাণিত করে। পড়াশোনার পাশাপাশি রোবটিকস ও বিজ্ঞান সম্পর্কে অনলাইন মাধ্যম ব্যবহার করে আরও গভীরভাবে জানার চেষ্টা করেন। বিভিন্ন বিজ্ঞানমেলা, বিজ্ঞান কুইজ এবং বিভিন্ন ধরনের রোবট তৈরির প্রজেক্টে তার নিয়মিত অংশগ্রহণ শুরু হয়।
করোনা মহামারীর বিপর্যয়ে পৃথিবীর সবকিছু স্তব্ধ হলেও বন্ধ হয়নি ইরানের অধ্যবসায়। লকডাউনে ঘরবন্দি অবস্থায় তিনি তৈরি করেন রোবট ‘করোনা সেবক’। বিজ্ঞানমেলায় এটি বিভাগীয় পর্যায়ে দ্বিতীয় স্থান অর্জন করে। এখান থেকেই সাফল্যের পদযাত্রা শুরু হয় ইরানের। করোনায় প্রায় দুই বছরের মতো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকার দিনগুলোতে তিনি নিজেকে আরও অভিজ্ঞ ও দক্ষ করে তোলেন।
একসময় মানবাকৃতির রোবট বানানোর জন্য ইরান তার ছোট্ট রুমে নানা যন্ত্রাংশ জোগাড় করে কাজ শুরু করেন। শুরুতে বারবার ব্যর্থ হয়েছেন; তবু থেমে যাননি। একদিন তার মা রুমে এসে অর্ধেক তৈরি রোবটটি দেখে অবাক হয়ে যান এবং ছেলেকে উৎসাহ দেন। সেই উৎসাহ আজও ইরানকে নতুন প্রযুক্তির সঙ্গে পরিচিত হওয়ার এবং উদ্ভাবনের পথে এগিয়ে যাওয়ার প্রেরণা জোগায়। তার তৈরি করা হিউম্যান রোবট ‘রিবা’ বেশ সাড়া ফেলে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাসম্পন্ন রোবটটি মানুষের মতো চোখের পলক ফেলা, কথা বলা এবং অঙ্গভঙ্গি করার সক্ষমতা রাখে। এমনকি এটি বাংলা-ইংরেজিসহ বিভিন্ন ভাষায় কথা বলতে এবং যেকোনো প্রশ্নের উত্তর দিতে পারে। একজন চিকিৎসক, শিক্ষক ও অভিভাবকের মতো নির্দেশক হিসেবে কাজ করার পাশাপাশি ব্যক্তিগত সহকারীর মতো বিভিন্ন তথ্য দিয়ে সাহায্য করার সক্ষমতাও রয়েছে রোবট রিবার। এটি শিশুদের বিনোদন দিতে পটু। সূর্যের আলো থেকে সোলারে নিজের ব্যাটারি চার্জ করে নিতেও দক্ষ।
ইরান সরদার একসময় খেয়াল করলেন, দেশে বেশ অগ্নিদুর্ঘটনা হওয়ায় নানা ক্ষয়ক্ষতি তো হচ্ছেই, অনেকে আহত হচ্ছেন, এমনকি প্রাণও হারাচ্ছেন। দুর্ঘটনার প্রবণতা কমাতে তিনি ‘অগ্নি’ নামে একটি ডিভাইস তৈরি করেন, যেটি আগুন লাগার এক সেকেন্ডের মধ্যেই আশপাশের মানুষকে স্থানীয় ভাষায় সতর্ক করতে পারে। শুধু তাই নয়, নিকটবর্তী ফায়ার সার্ভিস স্টেশনে ফোনকল করা এবং লোকেশন শেয়ার করার সক্ষমতাও রাখে এটি। এতে আগুন ছড়িয়ে পরার আগেই দ্রুত নিয়ন্ত্রণে আনার এবং বড় দুর্ঘটনার প্রবণতা কমার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।
২০২৫ সালের ২৬ অক্টোবর দুপুরে রাজধানীর
ফার্মগেটের একটি দুর্ঘটনা দেশবাসীকে হতবাক করে দিয়েছিল। মেট্রোরেল বিয়ারিং প্যাড খুলে
এক পথচারী মারা যান সেদিন। দুর্ঘটনাটি ইরানের মনেও ভীষণ দাগ কাটে। তিনি এ ধরনের ঝুঁকি
কমানোর উপায় খুঁজতে থাকেন। অবশেষে গভীর চিন্তাভাবনায় নিজের আইডিয়াকে কাজে লাগিয়ে দেশীয়
প্রযুক্তির মাধ্যমে উদ্ভাবন করেন ‘মেট্রোরেল বিয়ারিং প্যাড সেফটি মনিটরিং সিস্টেম’
ডিভাইস। ইরানের মতে, ‘বিয়ারিং প্যাডটি খুলে যাওয়ার মূল কারণ মেট্রোরেল চলাচলের সময়
অতিমাত্রায় কম্পন সৃষ্টি হয়। উচ্চমাত্রায় কম্পনের ফলে ব্যবহৃত বিয়ারিং প্যাডটি তার
স্বাভাবিক অবস্থা ধরে রাখতে না পেরে ছিটকে পড়ে যায়।’ ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির
কম্পিউটিং অ্যান্ড ইনফরমেশন সিস্টেম ডিপার্টমেন্টে শিক্ষার্থী ইরানের তৈরি করা ডিভাইসটি
সেন্সরের মাধ্যমে বিয়ারিং প্যাডকে মনিটর করতে সক্ষম। তাই বিয়ারিং প্যাড স্বাভাবিক অবস্থা
থেকে সামান্য সরে গেলেও মেট্রোরেল কন্ট্রোল রুমে পিলার নম্বরসহ আগাম সিগন্যাল পাঠাতে
পারবে, যা কর্তৃপক্ষকে আসন্ন দুর্ঘটনা প্রতিরোধে পদক্ষেপ নেওয়ার সুযোগ দেবে। ডিভাইস
নিয়ে ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি টিমের হয়ে মেট্রোরেল কর্তৃপক্ষের সঙ্গে
কাজ করছেন ইরান। গবেষণাটি এখনো চলমান। প্রজেক্টটি সরকারিভাবে
পরিচালনা করা হচ্ছে।
তরুণ উদ্ভাবক ইরান সরদার জানালেন, রোবটিকসের উপকরণগুলো বেশ ব্যয়বহুল; তার ওপর বাংলাদেশে সহজলভ্য নয়। বেশিরভাগই অন্যত্র থেকে নিয়ে আসতে হয়। ফলে খরচ আরও বাড়ে। এ ব্যয়গুলো হাতখরচের টাকা জমিয়ে এবং মায়ের কাছ থেকে সাহায্য নিয়ে তিনি নিজেই বহন করেন।
শুরুতে রোবটিকস নিয়ে ইরানের কাজ প্রতিবেশী ও আশপাশের মানুষ ভালো চোখে দেখতেন না। বলতেন, এগুলো বানালে কী কাজে আসবে? ভবিষ্যতে কী কাজে দেবে? তখন তার খারাপ লাগত, তবে পছন্দের কাজ বন্ধ রাখেননি। একদিন তার উদ্ভাবনগুলো জাতীয় টেলিভিশনে প্রচারিত হলো। টিভির পর্দায় নিজের কাজ দেখে তিনি যেমন আবেগাপ্লুত হয়েছিলেন, তেমনি খুশিতে ভেসে গিয়েছিল তার পরিবারও। খবরটি দ্রুতই প্রতিবেশী ও এলাকার মানুষের কাছে পৌঁছে যায়। তারা অনেকে সে অনুষ্ঠান দেখেছিলেন। তারা গর্বের সঙ্গে একে অপরকে বলছিলেন, ‘এ তো আমাদের এলাকার ছেলে।’
ইরান বললেন, ‘এখনো অনেক প্রত্যন্ত অঞ্চলের মানুষ জানে না রোবটিকস কী? আমরা চাই বিভিন্ন পর্যায়ে যারা রোবটিকস নিয়ে কাজ করতে আগ্রহী, তাদের মধ্যে এটি ছড়িয়ে দিতে। যেন অন্যান্য দেশের মতো আমাদের দেশেও রোবটিকস চর্চা হয়, বিশ্ব মঞ্চে নিজ দেশকে তুলে ধরতে পারি। এর জন্য প্রয়োজন উন্নতমানের প্রযুক্তিগত ল্যাব, রোবটিকস গবেষণা সেন্টার। এগুলো গড়ে তুলতে রাষ্ট্রের কার্যকর হস্তক্ষেপ দরকার।’






