কেঁচো সারে বগুড়ার লিমার বাজিমাত

ছবি: আগামীর সময়
বগুড়ার সোনাতলা উপজেলার সদর ইউনিয়নের তাসলিমা আক্তার লিমা। ২০০৮ সালে এসএসসি পাসের পর ভর্তি হন গাইবান্ধার কৃষি ইনস্টিটিউটে। পড়াশোনা করতে করতেই বিয়ে করেন এক সহপাঠীকে। কিছু দিন পর স্বাবলম্বী হতে শুরু করেন কাপড়ের ব্যবসা। কিন্তু তাতে মেলেনি সফলতা। অবশ্য সবসময়ই কৃষি খাত নিয়ে কিছু করার তাড়না ছিল তার। সেই ইচ্ছা থেকেই ২০২২ সালে বগুড়া শহরতলির মাটিডালি এলাকায় শুরু করেন ভার্মি কম্পোস্ট প্রজেক্ট। নাম দেন লিমা’স ড্রিম। গয়না বন্ধক রেখে ছোট আকারে শুরু করেছিলেন। কিছু দিনের মধ্যেই বাড়তে থাকে চাহিদা। এরপর সোনাতলায় চালু করেন ইউনিট-২-এর কার্যক্রম। নিজে চাকরির পেছনে ছোটেননি লিমা, উল্টো এখন তার অধীনেই কাজ করেন ৩০ জন। এখন তার মাসিক আয় ১ লাখ টাকার বেশি।
সোনাতলা রানীরপাড়া গ্রামে লিমা’স ড্রিমের ইউনিট-২-এ গিয়ে দেখা গেল, বড় দুটি শেডে চলছে ভার্মি কম্পোস্ট বা কেঁচো সার উৎপাদন। এটি অত্যন্ত কার্যকরী একটি জৈব সার, যা রাসায়নিক সারের বিকল্প হিসেবে ব্যবহৃত হয়।
লিমা জানালেন ভার্মি কম্পোস্টের উৎপাদন প্রক্রিয়া। প্রথমে বিভিন্ন স্থান থেকে সংগ্রহ করা হয় ভার্মি কম্পোস্টের মূল কাঁচামাল গোবর। এরপর বিশেষ কায়দায় রাখা হয় অ্যামাইনো অ্যাসিড নিঃসরণের জন্য। ১০ থেকে ১৫ দিন পর এই গোবর হাউজে রেখে সেখানে ছেড়ে দেওয়া হয় কেঁচো। যেগুলো ধীরে ধীরে গোবর খেতে শুরু করে। এর ১৫ থেকে ২০ দিন পর হাউজ থেকে তুলে শর্টিং মেশিনে দিয়ে কেঁচো এবং ডাস্ট আলাদা করা হয়। এভাবে এই ইউনিটে প্রতি মাসে ৬০ থেকে ৭০ টন ভার্মি কম্পোস্ট উৎপাদন হয়।
তাসলিমা আক্তার লিমা বলছিলেন, ‘কৃষি ডিপ্লোমা করার সময়ই ভার্মি কম্পোস্ট নিয়ে আমার কাজ করার ইচ্ছা জাগে। প্রথমে পাঁচ কেজি কেঁচো কিনে উৎপাদন শুরু করি। বাজারজাত করতে প্রথমে বেশ বেগ পেতে হয়েছে। পরে আমার সার মানসম্পন্ন হওয়ায় অ্যাগ্রো ওয়ান নামক একটি কোম্পানির আগ্রহে তাদের সঙ্গে চুক্তি করি। এরপর থেকে কোম্পানিটিই আমার উৎপাদিত সব জৈব সার কিনে বাজারজাত করছে।’
প্রথম দিকে গোবরের কাজ করতে একটু খারাপ লাগলেও এখন কোনো সমস্যা হয় না— জানালেন এক নারী কর্মী। তিনি বলছিলেন, সংসারে অভাব ছিল, কিন্তু কাজ ছিল না। লিমা’স ড্রিমে কাজ করায় সংসারে সচ্ছলতা এসেছে। সন্তানরা নির্বিঘ্নে লেখাপড়া করতে পারছে।
লিমা বললেন, ‘আমি একা ভালো থাকতে চাই না। আশপাশের সবাইকে নিয়ে ভালো থাকতে চাই। আমি একজনকে একবেলা ভাত খাওয়াতে চাই না। বরং ১০ জনকে ভাত খাওয়ানোর টাকা একজনের জন্য কর্মসংস্থানে ব্যয় করতে চাই।’ এই ইচ্ছা থেকেই কাজ করে চলেছেন বলে জানালেন। তার লক্ষ্য, অনেক মানুষের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা।
উপজেলা কৃষিবিষয়ক কর্মকর্তা কৃষিবিদ সোহরাব হোসেন বললেন, ভার্মি কম্পোস্ট ব্যবহার করে কৃষির ব্যয় কমিয়ে ফলন ও উৎপাদন বাড়াতে এবং রাসায়নিক সারের ব্যবহার কমানো সম্ভব। এ কারণে কেঁচো সার উৎপাদনের ওপর গুরুত্বও দিচ্ছে সরকার।
তিনি বললেন, ‘আমাদের দিক থেকে লিমাকে যতটা সম্ভব সবরকমের সহযোগিতা করা হবে। অন্য যে কেউ এই উদ্যোগ নিলে তার প্রতিও আমাদের পক্ষ থেকে সহযোগিতা থাকবে।’
স্থানীয়রা বলছেন, নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত কল্পে চাষাবাদে রাসায়নিক সার ব্যবহারের পরিবর্তে জৈব সারের ব্যবহার বৃদ্ধিসহ লিমার হাত ধরে এই অঞ্চলের অসহায় দরিদ্র পরিবারগুলো আয়ের পথ পেয়েছে। নারীর ক্ষমতায়নেও তাসলিমা আক্তার লিমা রেখেছেন দারুণ ভূমিকা।



