আমার শরীরে ৭০-৮০টি ইনজেকশন পুশ করা হয়েছে : গাজী সালাউদ্দিন

গাজী সালাউদ্দিন তানভীর। ছবি : সংগৃহীত
কারাগার ও রিমান্ডে থাকাকালে চরম নির্যাতনের শিকার হয়েছেন বলে অভিযোগ করেছেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) সাবেক যুগ্ম সদস্যসচিব গাজী সালাউদ্দিন তানভীর। তার দাবি, শরীরে অন্তত ৭০ থেকে ৮০টি অজ্ঞাত ইনজেকশন পুশ করা হয়েছে। এতে শরীরের বিভিন্ন অংশ অবশ হয়ে গেছে।
আজ শুক্রবার ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির (ডিআরইউ) শফিকুল কবির মিলনায়তনে সংবাদ সম্মেলনে এসব অভিযোগ করেন গাজী সালাউদ্দিন তানভীর। নিজের শারীরিক অবস্থা এবং কারাগার ও রিমান্ডে থাকার সময়ের বিভিন্ন ঘটনার কথা তুলে ধরেন তিনি।
সংবাদ সম্মেলনে তার পরিবারের সদস্যদের পাশাপাশি এনসিপির রাজনৈতিক পর্ষদ সদস্য সারোয়ার তুষার এবং দলের স্বাস্থ্য, মানবাধিকার ও আইন সেলের নেতারা উপস্থিত ছিলেন।
তানভীরের দাবি, ৫ আগস্ট থেকে ১৫ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত কারাগার ও রিমান্ডে তাকে চরম নির্যাতন করা হয়েছে। নির্যাতনের বিষয়টি বাইরে প্রকাশ করলে পরিবারের সদস্যদের গুম করে ফেলার হুমকি দেওয়া হয়েছিল বলেও অভিযোগ করেন তিনি।
তবে এসব হুমকি উপেক্ষা করেই সত্য তুলে ধরতে সংবাদ সম্মেলনে এসেছেন বলে জানান তানভীর। তার ভাষ্য, জীবনের ঝুঁকি থাকলেও তিনি কাউকে ভয় পান না।
তানভীর বলেছেন, ‘বাংলাদেশের রাষ্ট্রযন্ত্রের মধ্যে সরকারের মধ্যে খুনি ফ্যাসিস্ট হাসিনার আমলের কালো ছায়া আগের মতোই হুবহু রয়ে গেছে। জেলে গিয়ে আমি তার প্রমাণ পেয়েছি।’
তানভীরের অভিযোগ, কারাগারে যাওয়ার পর থেকেই তাকে বিভিন্নভাবে হয়রানি ও নির্যাতন করা হয়। তিনি জানান, ২ আগস্ট সাইবার সুরক্ষা আইনে তার বিরুদ্ধে মামলা হয়। ৫ আগস্ট তাকে গ্রেপ্তার করা হয়। বগুড়া সদর থানা বিএনপির সভাপতি এইচ এস মাফুতুন আহমেদ খান ওই মামলার বাদী বলে দাবি করেন তিনি।
গ্রেপ্তারের পর বগুড়া কারাগারের একটি সেলে তাকে রাখা হয়। তার দাবি, সেলটি ছিল অপরিচ্ছন্ন। সেখানে আলো-বাতাসের ব্যবস্থা ছিল না। বিদ্যুৎ বা ফ্যানও ছিল না।
কারাগারে খাবার নিয়েও অভিযোগ করেন তানভীর। তার দাবি, ৫ আগস্ট জুলাই গণঅভ্যুত্থান দিবস উপলক্ষে অন্যদের ভালো খাবার দেওয়া হলেও তাকে দুই দিনের পুরোনো ও পচা খাবার দেওয়া হয়।
নিয়মিত এমন খাবার দেওয়ায় একপর্যায়ে তিনি ডায়রিয়ায় আক্রান্ত হন। পরে তাকে শহীদ জিয়া মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হয়। তবে চিকিৎসক যে ওষুধ লিখে দিয়েছিলেন, তা তাকে দেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ করেন তানভীর। তার দাবি, পরিবর্তে তাকে অজ্ঞাত ওষুধ খাওয়ানো হয়।
শারীরিক নির্যাতনের পাশাপাশি অসংখ্য ইনজেকশন দেওয়ার অভিযোগও করেছেন তানভীর। তিনি বলেছেন, ‘আমার শরীরে অসংখ্য ইনজেকশন পুশ করা হয়েছে। এসব কীসের ইনজেকশন তা আমি জানি না। অন্তত ৭০-৮০টি ইনজেকশন দেওয়া হয়েছে আমাকে।’
একদিন হাত-পা কাঁপতে থাকলে একজন চিকিৎসক এসে তাকে ইনজেকশন দেন। এরপর তার ডান হাত ও ডান পা অবশ হয়ে যায় বলে দাবি করেন তানভীর।
পরে তাকে শহীদ জিয়া মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হয়। সেখানে চিকিৎসক তাকে স্ট্রোক হয়েছে বলে জানিয়েছিলেন বলে দাবি তার। তবে কারা কর্তৃপক্ষ বিষয়টি অস্বীকার করে বলে জানান তানভীর।
হাসপাতালে তার সিটি স্ক্যান করা হলেও রিপোর্টে কী এসেছে, তা তাকে জানানো হয়নি বলে অভিযোগ করেন তিনি। পরে এমআরআই করার কথা বলা হয়। তানভীরের ভাষ্য, হাসপাতালের এমআরআই মেশিন নষ্ট থাকার কথা জানানো হলেও তাকে ওই মেশিনে ঢোকানো হয়।
তার দাবি, মেশিনের ভেতরে থাকা অবস্থায় বিকট শব্দ হয়ে সেটি বন্ধ হয়ে যায়। এরপর কোমর থেকে পা পর্যন্ত তাঁর শরীর অবশ হয়ে যায়। তিনি আরও দাবি করেন, ওই অবস্থায় ১০ থেকে ১২ ঘণ্টা অচেতন ছিলেন।
তানভীর আরও অভিযোগ করেন, একদিন হাসপাতাল থেকে কারাগারে নেওয়ার সময় সাদা পোশাকে কয়েকজন ব্যক্তি গাড়িতে ওঠেন। তার দাবি, ওই ব্যক্তিরা তাকে নির্যাতন করেন। তাদের একজন বসুন্ধরা গ্রুপের প্রসঙ্গ তোলেন।
তানভীরের অভিযোগ, ওই ব্যক্তিরা বসুন্ধরা গ্রুপের মালিক আহমেদ আকবর সোবহান ও তার ছেলে আনভীরের নাম উল্লেখ করে তাকে নির্যাতন করেন। এ ছাড়া কারাগারের ভেতরে একটি অন্ধকার কক্ষে নিয়েও তাকে নির্যাতন করা হয়েছে বলে অভিযোগ করেন তিনি।
তার দাবি, নির্যাতনের সময় নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী, আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া ও সালাহউদ্দিন আম্মারের নাম উল্লেখ করে বলা হতো, জুলাইয়ের সঙ্গে যুক্ত সবাইকে এভাবে নির্যাতন করা হবে।
কারাগারে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের বিশেষ সুবিধা দেওয়ার অভিযোগও করেছেন তানভীর। তার দাবি, তাদের অনেকে কারাগারে ভালো অবস্থায় ছিলেন। ফোনে কথা বলতেন। পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে নিয়মিত সাক্ষাৎ করতেন। এমনকি রাতে আওয়ামী লীগের নেতাদের গাড়িতে করে বাইরে নিয়ে যাওয়া হতো। পরে ভোরে তাদের কারাগারে ফিরিয়ে আনা হতো বলেও দাবি করেন তানভীর।
নিজের শারীরিক অবস্থার কথা তুলে ধরে তিনি বলেছেন, ‘আমার ওপর এতটাই নির্যাতন করা হয়েছে, বর্তমানে আমার প্রস্রাব-পায়খানা ব্যাগে ও প্যাডে করতে হচ্ছে।’
বর্তমানে তিনি একটি বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। তাকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে রেফার করা হয়েছে বলেও জানান তানভীর।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আপত্তিকর ও মানহানিকর পোস্ট দেওয়ার অভিযোগে সাইবার সুরক্ষা আইনের মামলায় গাজী সালাউদ্দিন তানভীরকে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল। পরে আদালত তাকে রিমান্ডে পাঠান। বিষয়টি নিয়ে এর আগে সংবাদমাধ্যমেও প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে।
১৫ সেপ্টেম্বর তিনি ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগার থেকে জামিনে মুক্তি পান। এরপর চিকিৎসার জন্য হাসপাতালে ভর্তি হন। তার নির্যাতনের অভিযোগ নিয়ে এর আগে এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলামও প্রশ্ন তুলেছিলেন। তানভীরের চিকিৎসার পূর্ণাঙ্গ রেকর্ড প্রকাশের দাবিও জানিয়েছিলেন তিনি।






