জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে প্রধানমন্ত্রী
মারণাস্ত্র নয়, বিশ্ব বদলাবে মানবতায়
- বাংলাদেশ মেরামতে সরকার নিয়েছে ‘থ্রি-আর’ কৌশল
- সবার জন্য নিরাপদ দেশ গড়ার প্রতিশ্রুতি
- চালু হবে ‘ইউনিভার্সাল কার্ড’

জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে বক্তব্য রাখছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান
সবার জন্য নিরাপদ, শান্তিপূর্ণ ও কল্যাণমুখী বাংলাদেশ গড়ার অঙ্গীকার করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। জাতিসংঘের ৮১তম সাধারণ অধিবেশনে দেওয়া ভাষণে তিনি বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিবর্তন, রাষ্ট্র সংস্কার, অর্থনীতি, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, নারী ক্ষমতায়ন, কর্মসংস্থান, জলবায়ু পরিবর্তন ও রোহিঙ্গা সংকটসহ বিভিন্ন বিষয়ে সরকারের পরিকল্পনা তুলে ধরেছেন। পাশাপাশি একটি শান্তিময় বিশ্বের প্রত্যাশা করে তিনি বলেছেন, এমন একটি মানবিক বিশ্বসমাজ, যেখানে মারণাস্ত্র নয় বরং পরিবর্তনের হাতিয়ার হয়ে উঠবে যুক্তি-তর্ক, কূটনীতি, শিক্ষা ও মানবতা।
প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, তরুণরা যাতে নির্ভয়ে নিজেদের স্বপ্ন বাস্তবায়নের সুযোগ পায়, নারীরা আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে জীবন পরিচালনা করতে পারে এবং প্রতিটি শিশু যাতে তার সম্ভাবনা বিকাশের সুযোগ পায়— এমন একটি বাংলাদেশ গড়ে তুলতে চায় সরকার। সর্বোপরি জনগণকে নিরাপদ ও শান্তিপূর্ণ জীবনের নিশ্চয়তা দেওয়াই সরকারের লক্ষ্য।
‘থ্রি-আর’ কৌশলে বাংলাদেশ মেরামত: ভাষণে দেশের রাজনৈতিক পরিবর্তন ও রাষ্ট্র পুনর্গঠনের প্রসঙ্গ তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বললেন, দেড় দশকের শাসন-শোষণের অবসানের পর ২০২৪ সালে বাংলাদেশ নতুন পথে যাত্রা শুরু করেছে। তার দাবি, গুম, খুন, অপহরণ, দুর্নীতি, লুটপাট ও অর্থ পাচারের মতো সংকট থেকে বেরিয়ে বাংলাদেশ আবার গণতন্ত্রের পথে এগিয়ে যাচ্ছে।
ক্ষতবিক্ষত বাংলাদেশ মেরামতে সরকার ‘রিকভারি, রেস্টোরেশন অ্যান্ড রিকন্সট্রাকশন’— অর্থাৎ ‘থ্রি-আর’ কৌশল অনুসরণ করছে বলেও জানিয়েছেন তিনি।
তারেক রহমান বলেন, এই কৌশলের মাধ্যমে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান পুনর্গঠন, অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনা এবং দেশের উন্নয়নের ভিত্তি আরও শক্তিশালী করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
নির্বাচন ও গণতন্ত্রের কথা: ভাষণের শুরুতে ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের শহীদদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। একই সঙ্গে ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের গণঅভ্যুত্থানে নিহত ও আহতদের প্রতিও শ্রদ্ধা জানান তিনি।
প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, দীর্ঘ আন্দোলন-সংগ্রাম এবং হাজারো প্রাণের বিনিময়ে বাংলাদেশ ফ্যাসিবাদমুক্ত হয়েছে। চলতি বছরের ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত জাতীয় নির্বাচনে জনগণ বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল-বিএনপিকে রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব দিয়েছে বলেও উল্লেখ করেছেন তিনি।
জাতিসংঘের বিশ্বমঞ্চে দাঁড়িয়ে প্রধানমন্ত্রী জানালেন, এই মুহূর্তে তিনি কিছুটা স্মৃতিকাতর। তার বাবা শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান এবং মা সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া এই বিশ্বমঞ্চে দাঁড়িয়ে বাংলাদেশ ও জনগণের পক্ষে বক্তব্য দিয়েছিলেন। একইভাবে তিনিও দেশের জনগণের স্বার্থ এবং শান্তিময় বিশ্ব প্রতিষ্ঠার প্রত্যাশা নিয়ে জাতিসংঘে বক্তব্য দিচ্ছেন।
সংঘাত নয়, সমাধান কূটনীতিতে: বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে চলমান সংঘাত ও যুদ্ধের প্রভাব তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, মানবসৃষ্ট সংঘাতের কারণে বহু দেশে অশান্ত পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। বিপুলসংখ্যক মানুষ বাস্তুচ্যুত হচ্ছে। তৈরি হচ্ছে মানবিক সংকট। যুদ্ধ ও সংঘাত বিশ্ব অর্থনীতির ওপরও চাপ সৃষ্টি করছে।
তার ভাষায়, যেকোনো সংঘাতের সমাধান আলোচনা, কূটনৈতিক প্রক্রিয়া ও পারস্পরিক সহযোগিতার মাধ্যমে হওয়া উচিত। রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে সমতা, ন্যায্যতা, পারস্পরিক স্বার্থ, সম্মান ও মর্যাদা রক্ষাই দ্বিপক্ষীয় ও বহুপক্ষীয় সম্পর্কের ভিত্তি হওয়া উচিত।
তিনি বলেছেন, আমাদের প্রত্যাশা একটি শান্তিময় বিশ্ব, এমন একটি মানবিক বিশ্বসমাজ, যেখানে মারণাস্ত্র নয় বরং পরিবর্তনের হাতিয়ার হয়ে উঠবে যুক্তি-তর্ক, কূটনীতি, শিক্ষা ও মানবতা। একে অপরের স্বাধীনতা এবং সার্বভৌমত্বের প্রতি শ্রদ্ধাশীল একটি সমঝোতামূলক বিশ্বসমাজ প্রতিষ্ঠার কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে বাংলাদেশ জাতিসংঘকে দেখতে চায়।
ফিলিস্তিনের পক্ষে বাংলাদেশের সমর্থন: ফিলিস্তিনি জনগণের দুর্দশা নিয়ে বাংলাদেশের জনগণের উদ্বেগের কথা তুলে ধরেছেন প্রধানমন্ত্রী। আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার ও স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠাসহ ফিলিস্তিনি জনগণের ন্যায্য দাবির প্রতি বাংলাদেশের অবিচল সমর্থন পুনর্ব্যক্ত করেছেন তিনি। বিশ্বশান্তি প্রতিষ্ঠায় জাতিসংঘের বিভিন্ন উদ্যোগের প্রতিও বাংলাদেশের সমর্থন অব্যাহত থাকবে বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী।
রোহিঙ্গা সংকটের স্থায়ী সমাধান চান: মিয়ানমার থেকে জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুত ১২ লাখের বেশি রোহিঙ্গাকে দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশ আশ্রয় দিয়ে আসছে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, এর ফলে বাংলাদেশের অর্থনীতি, পরিবেশ, নিরাপত্তা এবং স্থানীয় জনগোষ্ঠীর ওপর ব্যাপক চাপ তৈরি হয়েছে।
রোহিঙ্গা সংকটের চূড়ান্ত সমাধানে জাতিসংঘ ও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কার্যকর সহযোগিতা চান তারেক রহমান। একই সঙ্গে রোহিঙ্গাদের নিজ দেশে ফেরত পাঠানো না হওয়া পর্যন্ত জীবন রক্ষাকারী সহায়তা অব্যাহত রাখার আহ্বান জানিয়েছেন।
প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, রোহিঙ্গাদের ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় ব্যর্থ হলে ভবিষ্যতে এ সংকট আরও বড় মানবিক বিপর্যয়ে রূপ নিতে পারে।
শান্তিরক্ষা মিশনে বাংলাদেশের ভূমিকা: বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বাংলাদেশের শান্তিরক্ষীদের ভূমিকার কথা তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, প্রতিকূল পরিস্থিতিতেও জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে বাংলাদেশের নারীদের সাহসী অংশগ্রহণ ‘নারী, শান্তি ও নিরাপত্তা’ কর্মসূচির প্রতি বাংলাদেশের অঙ্গীকারের প্রতিফলন।
পূর্ণাঙ্গ ও সাধারণ নিরস্ত্রীকরণ, পারমাণবিক অস্ত্রের বিস্তার রোধ এবং অস্ত্র নিয়ন্ত্রণের প্রতিও বাংলাদেশের প্রতিশ্রুতি পুনর্ব্যক্ত করেছেন তিনি।
জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় উদ্যোগ: জলবায়ু পরিবর্তনের নেতিবাচক প্রভাব মোকাবিলায় সরকারের বিভিন্ন উদ্যোগ তুলে ধরেন তারেক রহমান। পানি সংরক্ষণ ও দূষণ রোধে অভ্যন্তরীণ পদক্ষেপ জোরদারের পাশাপাশি আন্তঃসীমান্ত পানি ব্যবস্থাপনায় সহযোগিতার কথাও জানিয়েছেন তিনি।
জাতিসংঘের অধিবেশনের অন্যান্য আলোচনাতেও প্রধানমন্ত্রী জলবায়ু ঝুঁকিতে থাকা দেশগুলোর জন্য জলবায়ু অর্থায়ন ও প্রযুক্তি সহায়তার প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরেছেন।
কর্মসংস্থান ও শিল্পায়নে জোর: বাংলাদেশের সামনে অপার সম্ভাবনার দ্বার উন্মুক্ত হয়েছে বলে উল্লেখ করেছেন প্রধানমন্ত্রী। দেশের কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীকে দক্ষ মানবসম্পদে পরিণত করতে সরকার ব্যাপক কর্মসূচি বাস্তবায়ন করছে বলে জানিয়েছেন তিনি।
বিপুল কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং বাংলাদেশকে একটি উৎপাদনকেন্দ্র হিসেবে গড়ে তুলতে বিভিন্ন পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে বলেও উল্লেখ করেছেন প্রধানমন্ত্রী।
নারীর অর্থনৈতিক ক্ষমতায়ন: দেশের জনসংখ্যার অর্ধেকের বেশি নারী উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, আর্থসামাজিক রূপান্তরের ক্ষেত্রে নারীদের সরকারের সব পরিকল্পনার অগ্রভাগে রাখা হয়েছে। নারী শিক্ষা, কর্মসংস্থান ও উদ্যোক্তা তৈরিকে অগ্রাধিকার দেওয়ার কথা জানিয়েছেন তিনি। ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পে নারী উদ্যোক্তাদের জন্য অর্থায়নের সুযোগ সম্প্রসারণের কথাও বলেছেন।
‘ইউনিভার্সাল কার্ড’ চালুর পরিকল্পনা: অর্থনৈতিক বৈষম্য কমিয়ে রাষ্ট্রীয় সহায়তা মানুষের কাছে পৌঁছে দিতে বিভিন্ন সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির কথা তুলে ধরেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তিনি বললেন, এরই মধ্যে ‘ফ্যামিলি কার্ড’, ‘ফারমার্স কার্ড’ ও ‘স্পোর্টস কার্ড’-এর মতো কর্মসূচি চালু হয়েছে। এসব কর্মসূচিকে সমন্বয় করে একটি ‘ইউনিভার্সাল কার্ড’ চালু করার পরিকল্পনা রয়েছে সরকারের।
শিক্ষা ও স্বাস্থ্যকে বিশেষ গুরুত্ব: শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও খেলাধুলাকে সরকারের অগ্রাধিকার খাত হিসেবে তুলে ধরেছেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেছেন, দেশের ইতিহাসে এবার শিক্ষা খাতে সর্বোচ্চ বাজেট বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। আগামী পাঁচ বছরের মধ্যে পর্যায়ক্রমে শিক্ষা খাতে জিডিপির বরাদ্দ ৫ শতাংশে উন্নীত করার পরিকল্পনা রয়েছে। কর্মমুখী ও নৈতিক মানসম্পন্ন শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে তুলতে কারিগরি ও ব্যবহারিক শিক্ষার ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে বলেও জানিয়েছেন তিনি।
প্রাথমিক পর্যায়ের শিক্ষার্থীদের জন্য বিনামূল্যে ব্যাগ, পোশাক ও দুপুরের খাবার দেওয়ার কর্মসূচির কথাও তুলে ধরেছেন প্রধানমন্ত্রী।
বিজ্ঞান-প্রযুক্তিতে নতুন সম্ভাবনা: বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিই আগামী বিশ্বের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করবে বলে মন্তব্য করেছেন সরকারপ্রধান। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, জীবপ্রযুক্তি ও বিজ্ঞানের নতুন যুগে প্রবেশের কথা উল্লেখ করে তিনি বললেন, প্রযুক্তির সুযোগ এখনো সবার জন্য সমান নয়। বাংলাদেশের বিপুল তরুণ জনগোষ্ঠী ও ক্রমবর্ধমান ডিজিটাল সক্ষমতাকে কাজে লাগাতে উন্নত প্রযুক্তি, জ্ঞান ও গবেষণার সুযোগ সবার নাগালের মধ্যে আনতে হবে।
স্বল্পোন্নত দেশের উত্তরণে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা: বাংলাদেশ স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে উত্তরণের অপেক্ষায় রয়েছে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, এ উত্তরণকে টেকসই করতে প্রয়োজন সুনিশ্চিত অর্থায়ন, বাজারে অধিকতর প্রবেশাধিকার, প্রযুক্তি হস্তান্তর এবং সক্ষমতা বৃদ্ধি। উন্নয়নশীল দেশগুলোতে টিকা, চিকিৎসাসামগ্রী ও রোগ নির্ণয়ের সরঞ্জামের টেকসই উৎপাদন নিশ্চিত করার ওপরও গুরুত্ব দেন তিনি।
রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ক্ষমতায়ন: প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, রাষ্ট্রের নাগরিকদের ক্ষমতাহীন রেখে রাষ্ট্র কখনো শক্তিশালী হতে পারে না। জনগণের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ক্ষমতায়ন নিশ্চিত করেই সমৃদ্ধ, স্বনির্ভর, কল্যাণমুখী গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করতে চায় সরকার।
এমন একটি বাংলাদেশ গড়ার প্রত্যয় জানিয়েছেন তিনি, যেখানে দল-মত, ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সবাই সমান অধিকার, সম্মান ও মর্যাদা নিয়ে নিরাপদে বসবাস করতে পারবে।
‘সবার আগে বাংলাদেশ, সবার জন্য বাংলাদেশ’: ভাষণের শেষ পর্যায়ে ‘সবার আগে বাংলাদেশ’ এবং ‘সবার জন্য বাংলাদেশ’— এ অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেছেন প্রধানমন্ত্রী। বিশ্বশান্তি প্রতিষ্ঠায় জাতিসংঘের নীতি ও মূল্যবোধের প্রতি বাংলাদেশের অকুণ্ঠ সমর্থন জানিয়ে তিনি বলেছেন, শান্তি, মানবতা, গণতন্ত্র ও পারস্পরিক সহযোগিতার ভিত্তিতেই ভবিষ্যতের বিশ্ব গড়ে তুলতে হবে।
জাতিসংঘের এবারের অধিবেশনে সভাপতিত্ব করছেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান।







