‘ফুটকি’ যে ফলে ফিরে আসে শৈশব

‘ছোটবেলার মতো এসো ফুল তুলিতে যাই, ফুলে ফুলে গড়ে দেবো আঁচল সারাটাই, কী ফুল নেবে গো, কী ফুল চাই?...’ নব্বই দশকের ব্যান্ড ‘মনিটর’-এর এই গানটি কানে এলেই কেমন যেন হঠাৎ হারিয়ে যাই সেই ছোটবেলায়। চোখের সামনে ভেসে ওঠে মফস্বল শহর রংপুরের সেই দিনগুলো। বয়স তখন সাত কি আট। পৃথিবীটা ছিল ছোট, অথচ আনন্দগুলো ছিল বিশাল।
সেই সময়ের রংপুর শহরের সেন্ট্রাল রোডের পায়রা চত্বর, শহীদ মোবারক সরণি— সবই ছিল আমাদের চেনা জগৎ। রংপুর সরকারি কলেজের ছাত্রাবাস ‘পাংঘা হাউস’-এ বড়রা খেলতে যেত। অ্যান্টিক ধাঁচের সেই ভবনটি দেখতে তখন আমাদের কাছে বেশ রহস্যময় লাগত।
আমরা ছোট বলে বড়দের খেলায় জায়গা হতো না। তবু খেলার মাঠের আশপাশে ঘুরঘুর করতাম— এই বুঝি কেউ বলল, ‘আয়, তুইও খেল।’
তিন দশকের বেশি সময় আগে সেই পুরনো পাংঘা হাউস ভেঙে ফেলা হয়েছে। তার জায়গায় এখন দাঁড়িয়ে আছে রংপুরের সুউচ্চ ও আধুনিক সুবিধাসম্পন্ন হোটেল নর্থভিউ। হোটেলটি আমাদের দাদাবাড়ি লাগোয়া। সময় বদলেছে, জায়গার চেহারা বদলেছে, শুধু স্মৃতিগুলো রয়ে গেছে আগের মতোই।
পাংঘা হাউসটি সম্ভবত তিনতলা ছিল। ওপরে ছিল একটি চিলেকোঠা। সেই ছাদে দাঁড়িয়ে নিচের দিকে তাকালে মনে হতো, বিশাল এক সবুজ গালিচা যেন বিছিয়ে রাখা হয়েছে। ছোট্ট চোখে তখন মাঠটিকে কী যে বড় মনে হতো! মাঠের চারপাশ ছিল ঘন জঙ্গলে ঢাকা। সেই জঙ্গলও ছিল আমাদের কাছে ভয়ের চেয়ে বেশি আকর্ষণের।
খেলতে না দিলেও তাই বারবার ছুটে যেতাম। যদি কোনোদিন বড়রা দলে নেয়! আর বড়দের ফুটবলটি যখন জঙ্গলের দিকে চলে যেত, তখন শুরু হতো আমাদের আরেক প্রতিযোগিতা— কে সবার আগে বলটি উদ্ধার করে আনতে পারে।
আজ ভাবলে অবাক লাগে, তখন সাপ-বিচ্ছু কিংবা বিষাক্ত কোনো পোকামাকড়ের কথা মাথাতেই আসত না। জঙ্গল মানেই ছিল অভিযান, ফুটবল মানেই ছিল উত্তেজনা আর বন্ধুত্ব মানেই ছিল সারা দিনের নির্ভেজাল আনন্দ।
আমার সেই শৈশবের খেলার সাথী ছিল পাশের বাড়ির ‘মায়া’। বয়সের ব্যবধান পেরিয়ে জীবনের কতটা পথ যে আমরা চলে এসেছি! এই তো সেদিন মায়ার সঙ্গে দেখা হলো। ওর মেয়ে এখন পুরোদস্তুর ডাক্তার।
কথা বলতে বলতে হঠাৎ সেই ছোটবেলার একটি ফলের কথা মনে পড়ল। জিজ্ঞেস করলাম, ‘হ্যারে, তোর কি সেই ফলটার কথা মনে আছে?’
জীবনের বায়ান্নটি বছর পেরিয়ে পেছনের দিনগুলোর দিকে তাকালে এখন হাসি পায়। অথচ তখন সেই ফলটিই ছিল আমাদের কাছে দারুণ মজার এক খেলনা।
ফলটি চোখে পড়লেই গাছ থেকে তুলে নিতাম। তারপর শুরু হতো এক অদ্ভুত খেলা। একজন আরেকজনের কপালে ফলটি চেপে ধরতাম। একটু পরই— ফট!
ফলটি ফেটে যেত। কপালে ছোট্ট একটা দাগ বা চিহ্ন পড়ে যেত। তারপর হাসাহাসি। শুধু একবার নয়, সুযোগ পেলেই বারবার। কে কতবার কপালে ফল ফুটিয়ে দিতে পারে— সেটাই যেন ছিল আনন্দের বিষয়।
সেই ফলটির নাম ‘ফুটকি’। ফলটি ফাটার সময় ‘ফটফট’ শব্দ হতো বলেই হয়তো আমাদের শৈশবের ভাষায় এর নাম হয়ে গিয়েছিল ফুটকি। নামের মধ্যেই যেন লুকিয়ে আছে এর ছোট্ট এক শব্দের গল্প।
উদ্ভিদটির ইংরেজি নাম Cape gooseberry। এর বৈজ্ঞানিক নাম Physalis minima। এটি Solanaceae পরিবারের উদ্ভিদ। একসময় গ্রামের ঝোপঝাড়, পতিত জমি কিংবা বাড়ির আশপাশে সহজেই চোখে পড়ত এই ছোট্ট ফলের গাছ।
শুধু শৈশবের খেলার উপকরণই নয়, লোকজ ব্যবহারে ফুটকিরও রয়েছে আলাদা পরিচিতি। বিভিন্ন তথ্য অনুযায়ী, এই ফলে ফাইলাসিন, ট্যানিন, ম্যালিক অ্যাসিড, ভিটামিন সিসহ নানা রাসায়নিক উপাদান রয়েছে। লোকজ চিকিৎসায় ফল ও উদ্ভিদটির বিভিন্ন অংশের ব্যবহারও রয়েছে। একসময় মূত্রজনিত সমস্যা ও বিভিন্ন রোগে এটি ব্যবহারের কথা গ্রামবাংলায় প্রচলিত ছিল। কোথাও কোথাও তরকারি হিসেবেও ফুটকি খাওয়ার চল ছিল।
তবে সময়ের সঙ্গে বদলে গেছে আমাদের গ্রাম, বদলে গেছে মাঠ-ঘাট, ঝোপঝাড় আর মানুষের জীবনযাপন। নগরায়ণ, জমির ব্যবহার পরিবর্তন এবং প্রকৃতির স্বাভাবিক পরিবেশ কমে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে হারিয়ে যেতে বসেছে শৈশবের সেই চেনা ফুটকি। যে ফলটি একসময় পাড়ার শিশুদের খেলায় আনন্দ এনে দিত, সেটিই এখন অনেকের কাছে অচেনা।
সময়ের স্রোতে পাংঘা হাউস নেই, সেই মাঠও আগের মতো নেই। জঙ্গলের অনেকটাই হারিয়ে গেছে। বড় হয়ে গেছি আমরা। মায়ার মেয়েও ডাক্তার হয়ে গেছে। অথচ স্মৃতির ভেতর কোথাও যেন সেই সাত-আট বছরের শিশুটি এখনো দৌড়ে বেড়ায়।
হয়তো কোনো এক বিকালে আবার পাংঘা হাউসের ছাদে দাঁড়িয়ে নিচের সবুজ মাঠের দিকে তাকাবে সে। দূরে কোথাও ফুটবল গড়িয়ে যাবে। পাশ থেকে মায়া ডাকবে। আর ঝোপের ভেতর থেকে কেউ হয়তো তুলে আনবে একটি ফুটকি। তারপর— ফট! এক মুহূর্তেই ফিরে আসবে পুরো শৈশব।
লেখক: কৃষিবিদ ও গবেষক



