শিল্পীর প্রতি অসম্মান
‘হ্যাডম দেখানো’র সংস্কৃতি কোথায় গিয়ে থামবে?

লেখক: হুমায়ুন আহমেদ শ্রাবণ
মানিক মিয়া অ্যাভিনিউয়ের কনসার্টে আর্ক ব্যান্ডের ভোকালিস্ট হাসানের দিকে দর্শকসারি থেকে পানির বোতল ছোড়ার ঘটনা সাধারণ মানুষের মধ্যে ক্ষোভ সৃষ্টি করেছে। বাংলাদেশের ব্যান্ডসংগীতের ইতিহাসে হাসান গুরুত্বপূর্ণ একটি নাম। তিনি শুধু একজন সঙ্গীতশিল্পী নন, দেশের ব্যান্ডসংগীতের একটি পরিচিত মুখ ও দীর্ঘ সময়ের সাংস্কৃতিক যাত্রার অংশ। তাকে মঞ্চে এভাবে অপমানিত হতে দেখা অত্যন্ত দুঃখজনক। একই সঙ্গে প্রশ্ন জাগে—কীভাবে আমরা এতটা আক্রমণাত্মক ও অসহিষ্ণু হয়ে উঠলাম?
আমাদের সমাজে দীর্ঘদিন ধরেই নিয়ম ভাঙাকে কিংবা অন্য কাউকে আক্রমণ করাকে একধরনের বীরত্ব হিসেবে উপস্থাপনের প্রবণতা তৈরি হয়েছে। প্রচলিত ভাষায় যাকে অনেকে ‘হ্যাডম দেখানো’ বলেন। লাইন ভঙ্গ করে সামনে যাওয়া, অনুমতি ছাড়া অনুষ্ঠানে প্রবেশ, কিংবা কারও একান্ত ব্যক্তিগত মুহূর্তে গিয়ে মোরাল পুলিশিং এবং এসবের ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে গর্বের সঙ্গে প্রকাশ করা হয়।
এর পেছনে বড় একটি কারণ হলো দীর্ঘদিন ধরে মব মানসিকতার বিস্তার। সমাজে যখন কারও বক্তব্য, রাজনৈতিক অবস্থান, পোশাক কিংবা জীবনযাপন পছন্দ না হলেই দলবদ্ধভাবে তাকে হেনস্তা করার প্রবণতা বাড়তে থাকে, তখন সাংস্কৃতিক পরিসরও সেই প্রভাব থেকে মুক্ত থাকে না।
এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে রাজনৈতিক মেরুকরণ। একজন শিল্পী কখন কোথায় গান গেয়েছেন, কোন সরকারের অনুষ্ঠানে ছিলেন কিংবা কোনো রাজনৈতিক ঘটনায় কী অবস্থান নিয়েছেন এসব দিয়ে তার শিল্পকে বিচার করার প্রবণতা বাড়ছে। একজন শিল্পীর রাজনৈতিক মত অবশ্যই থাকতে পারে। সেই মতের সমালোচনাও হতে পারে। কিন্তু দ্বিমতের ভাষা যখন শারীরিক আক্রমণ হয়, তখন সেটি সহিংসতায় পরিণত হয়।
আরেকটি বড় কারণ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ‘ভাইরাল সংস্কৃতি’ ও ইকো চেম্বারের প্রভাব। এখন কেউ বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করলেও জানেন, মুহূর্তের মধ্যে তাঁর কর্মকাণ্ডের ভিডিও ছড়িয়ে পড়তে পারে হাজারো মানুষের কাছে। দুর্ভাগ্যজনকভাবে, এই দৃশ্যমানতাকেই কেউ কেউ একধরনের স্বীকৃতি বা সাফল্য বলে মনে করেন। ফলে অপমান, উসকানি কিংবা বিশৃঙ্খল আচরণও কখনো কখনো ‘ভাইরাল’ হওয়ার উপায় হয়ে দাঁড়ায়।
এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অ্যালগরিদম। ব্যবহারকারীরা সাধারণত নিজেদের মত ও বিশ্বাসের সঙ্গে মিল আছে—এমন পোস্ট, ভিডিও ও মন্তব্যই বেশি দেখতে পান। একই ধরনের মতামত বারবার সামনে আসতে থাকায় ভিন্নমতের প্রতি সহনশীলতা কমে যায়। একই সঙ্গে নিজেকে একটি বড় গোষ্ঠীর অংশ বলে মনে হওয়ার কারণে নিজের অবস্থানকেই একমাত্র সঠিক বলে ভাবার প্রবণতাও শক্তিশালী হয়। এর ফল হিসেবে ভিন্নমতকে যুক্তি দিয়ে বোঝার পরিবর্তে আক্রমণ করার মানসিকতা তৈরি হয় । অনলাইনে আক্রমণাত্মক ভাষা ও আচরণ যখন স্বাভাবিক হয়ে ওঠে, তখন তার প্রভাব ধীরে ধীরে বাস্তব জীবনের আচরণেও পড়ে।
তবে এসব ঘটনার দায় শুধু ব্যক্তির নয়; এর বড় দায় রাষ্ট্র ও সামাজিক প্রতিষ্ঠানগুলোরও। একটি সমাজের মানুষ কীভাবে ভাববে, কোন মূল্যবোধ ধারণ করবে এবং কোন আচরণকে গ্রহণযোগ্য বলে মনে করবে—তা দীর্ঘ সময় ধরে রাষ্ট্রের নীতি, শিক্ষাব্যবস্থা, আইন প্রয়োগ, সামাজিক প্রতিষ্ঠান ও রাজনৈতিক সংস্কৃতির মধ্য দিয়ে গড়ে ওঠে। ফলে সমাজে আজ যে আগ্রাসী ও অসহিষ্ণু মনোভাব দেখা যাচ্ছে, তার দায় রাষ্ট্র ও সমাজকেও নিতে হবে।
এ ক্ষেত্রে রাজনৈতিক নেতৃত্বের আচরণও গুরুত্বপূর্ণ। রাজনৈতিক পরিসরে যখন দীর্ঘদিন ধরে আক্রমণাত্মক ভাষা, প্রতিপক্ষকে হেয় করা, বিদ্বেষমূলক বক্তব্য এবং ভিন্নমতকে শত্রু হিসেবে দেখার প্রবণতা চলতে থাকে, তখন এর প্রভাব রাজনীতির গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ থাকে না। সেই ভাষা ও আচরণ ধীরে ধীরে সাধারণ মানুষের মধ্যেও ছড়িয়ে পড়ে। একসময় এমন ধারণা তৈরি হয় যে দ্বিমত মানেই প্রতিপক্ষকে অপমান করা, আক্রমণ করা কিংবা শক্তি প্রদর্শনের মাধ্যমে তাকে দমিয়ে রাখা।
সবচেয়ে কঠিন কাজটি অবশ্য দীর্ঘমেয়াদি। কারণ, অসহিষ্ণুতার এই সংস্কৃতি এক দিনে তৈরি হয়নি, এক দিনেই তা দূরও হবে না। পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, সাংস্কৃতিক পরিসর, গণমাধ্যম ও রাষ্ট্র—সব ক্ষেত্রেই নিয়ম মেনে চলা, ভিন্নমতকে সহ্য করা এবং অন্যের মর্যাদার প্রতি শ্রদ্ধাশীল হওয়ার চর্চা গড়ে তুলতে হবে।




