মানুষের কল্যাণেই ঈদের আনন্দ বাবুর

মানুষকে রাস্তা পারাপারে সহায়তা করেন বাবু। গতকাল রাজশাহী নগরীর সাহেববাজার জিরো পয়েন্টে
রাজশাহীর ব্যস্ত সাহেববাজার জিরো পয়েন্টে হঠাৎ চোখে পড়ে সাদা পোশাকে এক ব্যক্তি এক হাতে মাইক, অন্য হাতে বাঁশি নিয়ে কখনো যানবাহন থামাচ্ছেন, কখনো পথচারীদের নিরাপদে রাস্তা পার করে দিচ্ছেন, আবার কখনো সতর্ক করছেন চালকদের। প্রথম দেখায় তাকে ট্রাফিক পুলিশের সদস্য মনে হলেও বাস্তবে তার নেই কোনো সরকারি দায়িত্ব, নেই কোনো পদবি। তবু দিনের পর দিন, রোদ-বৃষ্টি আর ক্লান্তি উপেক্ষা করে বৃদ্ধ বয়সেও তিনি দাঁড়িয়ে থাকেন রাজপথে। কারণ তার বিশ্বাস, একজন মানুষ নিরাপদে পরিবারের কাছে ফিরে যেতে পারলে বেঁচে যায় একটি পরিবার, বেঁচে থাকে অসংখ্য স্বপ্ন।
তার নাম ওয়ালিউর রহমান বাবু। তিনি মুক্তিযুদ্ধের তথ্যসংগ্রাহক, সংস্কৃতিকর্মী, অভিনয়শিল্পী ও সমাজসেবক। সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ও সাবেক প্রধান বিচারপতি হাবিবুর রহমানের ছোট ভাই হলেও সেই পরিচয়কে ছাপিয়ে রাজশাহীর মানুষের কাছে তিনি একজন পরোপকারী— যিনি সংকটে মানুষের পাশে দাঁড়ান, বিনিময়ে কিছুই আশা করেন না।
গতকাল শুক্রবার বিকালে সাহেববাজার জিরো পয়েন্টে ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণের ফাঁকে তিনি বলছিলেন, ‘কোনো মানুষের পাশে দাঁড়িয়ে যদি কিছু করতে পারি, সেদিনটিই আমার কাছে ঈদের দিন।’
দীর্ঘদিন ধরে তিনি নিরাপদ সড়কের দাবিতে কাজ করছেন। একের পর এক সড়ক দুর্ঘটনায় মানুষের মৃত্যু তাকে গভীরভাবে ব্যথিত করে। তার মতে, নিরাপদ সড়ক নিশ্চিত করা শুধু সরকারের দায়িত্ব নয়; চালক, যাত্রী ও পথচারী— সবার সম্মিলিত দায়িত্ববোধই দুর্ঘটনা কমাতে পারে। কারণ প্রতিটি দুর্ঘটনার সঙ্গে শুধু একটি প্রাণ ঝরে যায় না, ভেঙে পড়ে একটি পরিবারের ভবিষ্যৎ, থেমে যায় বহু স্বপ্ন। তাই সচেতনতা সৃষ্টিকে তিনি সামাজিক দায়িত্ব হিসেবেই নিয়েছেন।
চব্বিশের গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী কিছুদিন যখন রাজশাহীর সড়কে পুলিশ ছিল না, ট্রাফিক ব্যবস্থা যখন কার্যত ভেঙে পড়েছিল, তখন স্বেচ্ছাসেবকদের নিয়ে বাবু নেমে পড়েন রাজপথে। যান চলাচল স্বাভাবিক করার পাশাপাশি পরিচ্ছন্নতা অভিযান, ভাঙচুর হওয়া সরকারি দপ্তর পরিষ্কার করার কাজেও অংশ নেন তিনি।
ওয়ালিউর রহমান বাবু দুই দশকের বেশি সময় ধরে রাজশাহী, গোদাগাড়ী, নওগাঁ ও নাটোরসহ মুক্তিযুদ্ধের ৭ নম্বর সেক্টরের বিস্তীর্ণ এলাকায় ঘুরে মুক্তিযুদ্ধের অজানা ইতিহাস সংগ্রহ করছেন। মুক্তিযোদ্ধা, প্রত্যক্ষদর্শী ও সাধারণ মানুষের স্মৃতি লিপিবদ্ধ করে তিনি বিশ্বাস করেন, মুক্তিযুদ্ধের প্রকৃত ইতিহাস শুধু যুদ্ধক্ষেত্রে নয়; সাধারণ মানুষের জীবন, ত্যাগ, অশ্রু ও স্মৃতির মধ্যেও বেঁচে থাকে।
রাজশাহী মেট্রোপলিটন পুলিশের উপকমিশনার (মিডিয়া) গাজিউর রহমান বললেন, ‘ওয়ালিউর রহমান বাবুর মতো সচেতন ও মানবিক নাগরিকরা আমাদের জন্য অনুপ্রেরণা। তিনি দীর্ঘদিন ধরে ব্যক্তিগত উদ্যোগে মানুষকে সচেতন করছেন এবং প্রয়োজনে ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণে সহযোগিতা করছেন, যা অবশ্যই প্রশংসার দাবিদার। তবে ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণ একটি সংবেদনশীল দায়িত্ব। তাই যেকোনো সহযোগিতা অবশ্যই আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সঙ্গে সমন্বয় করে এবং নিরাপত্তার বিষয়টি মাথায় রেখেই হওয়া উচিত।’
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতকোত্তর পাস করা বাবুর একমাত্র চাওয়া, মানুষ যেন তাকে এমন একজন হিসেবেই মনে রাখেন, যিনি প্রয়োজনের সময় পাশে দাঁড়িয়েছিলেন। তাই আজও কোনো ব্যস্ত মোড়ে তিনি বাঁশি হাতে দাঁড়িয়ে থাকেন। তার কাছে বছরের সবচেয়ে বড় উৎসব ঈদ নয়, নিরাপদে ঘরে ফেরা মানুষের হাসিমুখ।




