সেক্যুলার স্বৈরাচারের পতনে ধর্মীয় স্বৈরাচারের ঝুঁকি তৈরি হয়

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
রাষ্ট্র, সংগঠন ও গণঅভ্যুত্থান নিয়ে দীর্ঘদিন কাজ করছেন কবি, বিশ্লেষক এবং বুদ্ধিজীবী ফরহাদ মজহার। সম্প্রতি
বাংলাদেশ জুলাই গণঅভ্যুত্থানের দুই বছর অতিক্রান্ত করল। জুলাই গণঅভ্যুত্থানসহ নানা বিষয়ে তিনি বিস্তারিত
কথা বলেছেন আগামীর সময়ের সঙ্গে। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন সাঈদ জুবেরী
আগামীর সময়: চব্বিশের অভ্যুত্থানের পর সম্ভবত প্রথম ইন্টারভিউতে আপনি খুব জোর দিয়ে বলেছিলেন— ‘ছাত্র নেতৃত্বকে রক্ষা করতে হবে।’ শুরুতেই আপনার মধ্যে কেন এমন শঙ্কা জেগেছিল?
ফরহাদ মজহার: প্রথমত, আমি আমার আগের অবস্থান থেকে মোটেই সরে আসিনি। জুলাই গণঅভ্যুত্থানে যেসব ছাত্র-তরুণ অংশগ্রহণ করেছে, তাদের ঐতিহাসিক অবদানকে এখনো আমাদের রক্ষা করতেই হবে। পলিটিক্যাল এস্টাবলিশমেন্ট বা পরাশক্তি সবসময় একটি সফল অভ্যুত্থানকে নিজেদের সুবিধাজনক কাঠামোর ভেতর ম্যানিপুলেট করতে চায়। ৫ আগস্টের অভ্যুত্থানটি ছাত্ররাই মাঠে ঘটিয়েছে, যদিও এর পেছনে আন্তর্জাতিক ভূরাজনৈতিক সমীকরণও ছিল। কিন্তু আমরা যখন নিজস্ব ব্যক্তিগত প্রত্যাশা দিয়ে মেলাতে পারি না, তখন সব দোষ ছাত্রদের ওপর চাপাই— যা ভুল। ছাত্ররা লড়াই করে নতুন রাষ্ট্র গঠনের ঐতিহাসিক শর্ত তৈরি করেছিল। কিন্তু ৮ আগস্ট তথাকথিত ‘সংবিধানের ধারাবাহিকতা’র নামে শেখ হাসিনার সংবিধান বহাল রেখে হাসিনাহীন ‘হাসিনা ব্যবস্থা’ ফিরিয়ে আনা হয়েছে। এই গাঠনিক ব্যর্থতার দায় শুধু ছাত্রদের নয়। অভ্যুত্থানের পর নতুনভাবে রাষ্ট্র গঠনের ঐতিহাসিক ও বাস্তব শর্তও পুরোপুরি হাজির ছিল। কিন্তু সেই পরবর্তী গাঠনিক পর্যায়কে বাস্তবায়ন করার জন্য যে ধরনের সুসংগঠিত রাজনৈতিক সংগঠনের প্রয়োজন ছিল, বাংলাদেশে তার অভাব ছিল।
আগামীর সময়: ‘গণঅভ্যুত্থান ও গঠন’ বইটিকে কি জুলাই আপরাইজিংয়ের টেক্সটবুক বলব? অনেকে ‘গণঅভ্যুত্থান’ এবং ‘বিপ্লব’, ‘জিহাদ’— একই অর্থে ব্যবহার করেন; এতে জটিলতা তৈরি হয় না?
ফরহাদ মজহার: এটি কোনো এক রাতের চিন্তা নয়, দীর্ঘদিনের পাঠচক্র ও আলোচনার ফল। তাত্ত্বিকভাবে সতর্ক থাকার জন্য ‘বিপ্লব’ বা ‘জিহাদ’ শব্দ দুটিকে আমি সাবধানে পরিহার করতে চাই। চব্বিশের ৫ আগস্ট যা ঘটেছে, তা হলো একটি ‘রাজনৈতিক গণঅভ্যুত্থান’। এর মূল কাজ সংসদীয় ক্ষমতার বদলে জনগণকে সরাসরি রাষ্ট্র গঠনের ‘গাঠনিক শক্তি’ ও জনগণের সার্বভৌমত্ব হিসেবে হাজির করা— যেমনটি ফরাসি বা ইরানি বিপ্লবে ঘটেছিল। বাংলাদেশে সেই গণঅভ্যুত্থানটি ঘটে গেছে। কিন্তু তা সত্ত্বেও আমরা কেন একটি ‘গাঠনিক প্রক্রিয়ায়’ ঢুকতে পারলাম না, সেটি বোঝাই এখন মূল কাজ। অনেকেই বলেছেন— ‘আমাদের প্রত্যাশা পূরণ হয়নি।’ কিন্তু প্রশ্ন হলো, প্রত্যাশা কী ছিল? স্রেফ শেখ হাসিনাকে উৎখাত করা? সেটি তো হয়েছে। কিন্তু এর চেয়ে বড় যে প্রত্যাশা— ‘নতুন রাষ্ট্র গঠন’— সেই চিন্তাটি আমাদের সমাজে সুস্পষ্টভাবে উচ্চারিতই ছিল না। আমরা একটা ‘গাঠনিক রাজনীতির পর্বে’ ঢুকে পড়েছি।
আগামীর সময়: ড. ইউনূসের ব্যাপারে আপনার অবস্থান কী ছিল? তিনি তো ছাত্রদের চয়েস ছিলেন বলে আমরা জানি।
ফরহাদ মজহার: একক ব্যক্তি হিসেবে ড. ইউনূসের সমালোচনা করা অর্থহীন; কারণ মূল ক্ষমতা ছিল সেনাসমর্থিত কাঠামোর হাতে। তার পক্ষে দাঁড়ানোর পেছনে আমার দুটি যুক্তি ছিল— প্রথমত, অভ্যুত্থানের সুরক্ষায় তার আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তিকে কাজে লাগানো এবং দ্বিতীয়ত, উগ্র করপোরেট শোষণের বাইরে তার ‘সামাজিক ব্যবসা’ বা গণমুখী অর্থনৈতিক সংস্কারের সম্ভাবনা। কিন্তু আজ দুই বছর পর এসে স্বীকার করতেই হবে যে, সেই সামাজিক-অর্থনৈতিক সংস্কারের চেষ্টাও শেষ পর্যন্ত ব্যর্থ হয়েছে।
আতঙ্কিত হওয়া বা ভয় পাওয়া স্বাভাবিক হলেও, তাত্ত্বিকভাবে আমাদের বিষয়টিকে সঠিকভাবে ব্যবচ্ছেদ করতে হবে। আমি শুরু থেকেই খুব স্পষ্ট ভাষায় সতর্ক করে আসছি— যখনই সমাজে ‘সেক্যুলার স্বৈরাচার’-এর পতন ঘটে, ঠিক তখনই সেখানে ‘ধর্মীয় স্বৈরাচার’ মাথাচাড়া দিয়ে ওঠার চরম ঝুঁকি তৈরি হয়। আমাদের বর্তমান প্রধান রাজনৈতিক কাজই হলো এই ধর্মীয় স্বৈরাচারকে মোকাবিলা করা
আগামীর সময়: ছাত্ররা কি কোনো জাতীয় বা আন্তর্জাতিক ‘শেল্টার’ পাওয়ার আশায় ড. ইউনূসের নাম প্রস্তাব করেছিল?
ফরহাদ মজহার: প্রশ্নটি খুবই প্রাসঙ্গিক, তবে এ বিষয়ে সরলীকরণ করা ভুল হবে। ক্ষমতার সমীকরণে ব্যক্তি আর ক্ষমতা এক জিনিস নয়। ব্যক্তি ড. ইউনূস কতটুকু শক্তিশালী, তা মূল প্রশ্ন নয়; ক্ষমতা বিভিন্ন শ্রেণির লড়াই ও কাঠামোর ওপর নির্ভর করে। ব্যক্তি ড. ইউনূস স্রেফ একটি প্রতীক মাত্র। পুরনো ফ্যাসিবাদী সংবিধান অক্ষত রাখার শর্তে সম্মতি দেওয়ায় সেনাবাহিনী ও এস্টাবলিশমেন্ট তাকে সামনে রাখে। তখনকার পরিস্থিতিতে ছাত্ররা যখন আমার সঙ্গে কথা বলেছিল, আমি তাদের বলেছিলাম আমার অবস্থান ‘৫০-৫০’। ‘ড. ইউনূসকে আনলেই যুক্তরাষ্ট্রের নিঃশর্ত সমর্থন মিলবে’— তাদের এই ধারণাটি ভুল ছিল। আমি তাদের এই ভুল ধারণা ভেঙে দিয়েছিলাম। ডেমোক্র্যাটদের সঙ্গে ড. ইউনূসের সম্পর্ক থাকলেও রিপাবলিকান বা সামগ্রিক মার্কিন এস্টাবলিশমেন্টের হিসাব আলাদা। তাছাড়া প্রথমদিকে আইনি জটিলতার কারণে আসিফ নজরুল বা ওয়াকার-উজ-জামানরা তাকে চাইছিলেন না; পরে আদালত মারফত রায় বাতিল করে তাকে আনা হয়। ফলে ক্ষমতার এই টানাপড়েনে ড. ইউনূস স্রেফ একটি কৌশলগত অবস্থান ছিলেন।
আগামীর সময়: আগে ব্যক্তিবিশেষ ঘোষণা করলেও মোটাদাগে ‘দ্রোহযাত্রা’ থেকে ‘শেখ হাসিনার পদত্যাগের এক দফা’ চূড়ান্ত গতির দিকে যায় বলে বামপন্থীদের দাবি। এতে নীতিগত কোনো ভুল ছিল কি?
ফরহাদ মজহার: এখানেই হচ্ছে আমাদের বুদ্ধিবৃত্তিক শ্রেণির, বিশেষ করে তথাকথিত ‘বামপন্থীদের’ সবচেয়ে ন্যক্কারজনক ও অসচেতন ভূমিকা!
গণঅভ্যুত্থান শুরু হওয়ার আগেই নতুন রাষ্ট্র গঠন এবং নতুন গঠনতন্ত্র প্রণয়নের তাত্ত্বিক তর্কগুলো আমাদের রাজনৈতিক সাহিত্যে এসে গিয়েছিল। কিন্তু যখন মূল দাবি হিসেবে ঘোষণা করা হলো— ‘এক দফা, শেখ হাসিনার পদত্যাগ’— তখনই আন্দোলনের মৌলিক রূপান্তরের সম্ভাবনাকে সংকুচিত করা হলো। স্রেফ ব্যক্তিক পদত্যাগের এই লাইনটি ছিল মূলত সাম্রাজ্যবাদী বা যুক্তরাষ্ট্রের পছন্দের— যেখানে শেখ হাসিনা সরবেন কিন্তু বিদ্যমান শোষণমূলক সংবিধান অক্ষত থাকবে। মুখে সাম্রাজ্যবাদবিরোধী বুলি আওড়ালেও, শাসনব্যবস্থা ও সংবিধান না বদলে শুধু পদত্যাগের দাবি তুলে এরা না জেনেই পুরনো সাম্রাজ্যবাদী ব্যবস্থাকে টিকিয়ে রাখতে সাহায্য করেছে।
আগামীর সময়: ৫ আগস্টের পর থেকে একটি নির্দিষ্ট বয়ান তৈরি করে সারা দেশে মাজার, বাউল আখড়া ও সাংস্কৃতিক মঞ্চে হামলা চালানো হচ্ছে। অন্যদিকে— যারা মাজার হামলার প্রতিবাদ করতে যাচ্ছেন, তারাও ওই তথাকথিত ‘অসামাজিকতা’ বা ‘নেশা’র অভিযোগগুলো একপ্রকার মেনে নিয়ে প্রতিবাদ করছেন। এই মনস্তত্ত্বকে আপনি কীভাবে দেখেন?
ফরহাদ মজহার: প্রশ্নটি অত্যন্ত স্পর্শকাতর এবং গভীর তাত্ত্বিক গুরুত্ব বহন করে। প্রথমত, ‘আইনের শাসন’ এবং ‘সংবিধান’ রক্ষার দোহাই দিয়ে যারা সরকার চালাচ্ছেন, তাদের রাষ্ট্রীয় চোখেও মাজার বা আখড়ায় হামলা চালানো একটি মারাত্মক ফৌজদারি অপরাধ। যেকোনো ব্যক্তি তাত্ত্বিক বা ধর্মীয় কারণে মাজারের বিরোধিতা করতেই পারেন, কিন্তু ‘নেশা’ বা ‘অসামাজিক কাজ’-এর অজুহাতে সেখানে মব নিয়ে হামলা চালাতে পারেন না; বেআইনি কিছু ঘটলে ব্যবস্থা নেওয়ার দায়িত্ব একমাত্র প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর। তবে বড় সংকট তৈরি করছে তথাকথিত প্রগতিশীলরা। তারা হামলাকারীদের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানাতে গিয়ে আবার নিজেরাই বলে বসে— ‘হ্যাঁ, মাজারে অসামাজিক কাজ বা নেশা করা যাবে না, এসব বন্ধ করতে হবে।’ এভাবে কথা বলে তারা কিন্তু হামলাকারীদের উগ্র অভিযোগগুলোকেই পরোক্ষভাবে সত্য মেনে নিচ্ছে এবং তাদের অপপ্রচারে নৈতিক ও রাজনৈতিক বৈধতা জোগাচ্ছে।
বাম আন্দোলনকারীরা জ্বালানি নিয়ে কার্যকর কোনো বাস্তবসম্মত নীতি জাতিকে দিতে ব্যর্থ হয়েছে। ইস্যুগুলোকে তারা স্রেফ তাদের দলীয় রাজনীতির ‘পণ্য’ বা ‘বাজারে বিক্রি করার মতো এজেন্ডা’ বানিয়েছে
আগামীর সময়: মাজার বলেন বা আখড়া, এসবের তো একটা ইকোসিস্টেম আছে। সেটি ধ্বংসের প্রক্রিয়া কীভাবে তৈরি হলো?
ফরহাদ মজহার: এটি বুঝতে হলে মাজারের নিজস্ব ‘ইকোসিস্টেম’ এবং সেটিকে দখলের ইতিহাস বুঝতে হবে। মাজারে হামলার চক্রান্ত কিন্তু চব্বিশের আগস্টে হঠাৎ করে শুরু হয়নি; মাজারকে একটি নির্দিষ্ট ধারায় ‘ইসলামাইজেশন’ বা দখলের প্রক্রিয়া অনেক আগে থেকেই চলছে। উদাহরণস্বরূপ, বিভিন্ন ঐতিহ্যবাহী মাজার প্রাঙ্গণে জোর করে বড় মসজিদ বানিয়ে দেওয়ার প্রবণতা দেখা যায়। মাজারের সুফি বা লোকায়ত ধারার সঙ্গে মসজিদের প্রথাগত কাঠামোর একটি তাত্ত্বিক তফাত আছে। যখন আপনি মাজারে অহেতুক মসজিদ দাঁড় করিয়ে দেন, তখন কাঠামোগতভাবেই একটি বিশেষ গোঁড়া গোষ্ঠী তা ডমিন্যাট করা শুরু করে। এটি মাজারের নিজস্ব সাংস্কৃতিক চরিত্র দখলেরই প্রথম পদক্ষেপ। দ্বিতীয়ত, মাজার বা বাউল আখড়ায় মাদক বা অসামাজিক কাজ চলার যে অভিযোগ— এর দায় প্রশাসনের, মাজার সংস্কৃতির নয়। কুষ্টিয়ার লালন ধামের উদাহরণ দিলে দেখা যায়— জেলা প্রশাসক কার্যালয় বাইরের লোকজনকে মেলার ইজারা দেয় আর তাদের ছত্রছায়াতেই অসামাজিক কাজ চলে; অথচ উগ্রপন্থীরা ডিসি অফিসের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নিয়ে মাজার ভাঙতে আসে। ভাবসাধন ও আধ্যাত্মিক সাধনার সঙ্গে নেশার কোনো সম্পর্ক নেই। তবে কেউ যদি নিজস্ব ব্যক্তিস্বাধীনতায় অন্য ধারা পালন করে, তবে সেটি তার ব্যক্তিগত বিষয়। ঢাকা শহরের অভিজাত হোটেল বা বারগুলোতে কেন হামলা চালান না? আর কুষ্টিয়া বা উত্তরাঞ্চলের পুরো কৃষিজমি তামাক চাষ করে ধ্বংস করে ফেলা হচ্ছে— সেখানকার হুজুররা তো তামাক চাষের বিরুদ্ধে খুতবা দেন না বা আন্দোলন করেন না! অথচ মাজারের ক্ষেত্রে ‘মাদকবিরোধী’ ধর্মীয় সেন্টিমেন্ট উসকে দেওয়া হয়! এর কারণ একটাই— মাজার হলো এ দেশের খেটে খাওয়া দরিদ্র ও মেহনতি মানুষের শেষ আশ্রয় ও সাংস্কৃতিক স্পেস। মাজার স্রেফ কোনো কবর নয়। এটি আমাদের লোকায়ত অর্থনীতির সঙ্গেও যুক্ত। একে রক্ষা করা একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র গড়ে তোলার অন্যতম প্রধান পূর্বশর্ত।
আগামীর সময়: এক্ষেত্রে দেশের মূলধারার ইসলামি দলগুলোর ভূমিকা ও দায়ভারকে আপনি কীভাবে দেখেন?
ফরহাদ মজহার: ৫ আগস্টের পর সারা দেশে যখন বিভিন্ন মাজার ও সাধুর আশ্রমে হামলা হচ্ছিল, তখন বিভিন্ন স্থান থেকে জামায়াতে ইসলামীর নেতাকর্মীদের জড়িত থাকার অভিযোগ উঠছিল। আমি জামায়াতসহ সব ইসলামি দলের উদ্দেশে বারবার প্রকাশ্যে চ্যালেঞ্জ জানিয়ে বলেছি— মাজার ভাঙার এই ন্যক্কারজনক অভিযোগের বিরুদ্ধে আপনারা নিজেদের অবস্থান পরিষ্কার করুন। মাজার ও লোকায়ত ঐতিহ্য সম্পর্কে আপনাদের দলীয় নীতি ও প্রতিশ্রুতি কী, তা জনগণের সামনে স্পষ্ট করে বলুন। তারা কেন নিজেদের অবস্থান পরিষ্কার করে একটি সুনির্দিষ্ট প্রতিশ্রুতি দিতে পারে না?
আগামীর সময়: দেখা যাচ্ছে সমাজে ধর্মীয় পরিচয় ও শুদ্ধতার দাবিতে হামলা, মব, নারী-শিশু নিপীড়নসহ নানা কিছু বৃদ্ধি পেয়েছে। এখন এসব দেখে যদি কেউ ভয় পান? একে কি স্রেফ ‘প্রতিক্রিয়াশীল মনোভাব’ বলে এড়িয়ে যাওয়া সম্ভব?
ফরহাদ মজহার: এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি প্রশ্ন। তবে আতঙ্কিত হওয়া বা ভয় পাওয়া স্বাভাবিক হলেও, তাত্ত্বিকভাবে আমাদের বিষয়টিকে সঠিকভাবে ব্যবচ্ছেদ করতে হবে। আমি শুরু থেকেই খুব স্পষ্ট ভাষায় সতর্ক করে আসছি— যখনই সমাজে ‘সেক্যুলার স্বৈরাচার’-এর পতন ঘটে, ঠিক তখনই সেখানে ‘ধর্মীয় স্বৈরাচার’ মাথাচাড়া দিয়ে ওঠার চরম ঝুঁকি তৈরি হয়। আমাদের বর্তমান প্রধান রাজনৈতিক কাজই হলো এই ধর্মীয় স্বৈরাচারকে মোকাবিলা করা। তবে এই ধর্মীয় উগ্রতার ভয়ে যদি আপনি আবার ঢালাওভাবে পুরো ইসলাম বা ধর্মপ্রাণ মানুষকে দোষারোপ করা শুরু করেন, তবে তা হবে একটি ‘প্রতিক্রিয়াশীল প্রতিক্রিয়া’। সেক্যুলার ও ধর্মীয়— উভয় স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে কথা বলে আমরা একটি ভারসাম্যপূর্ণ রাজনৈতিক অবস্থান তৈরি করেছিলাম। এখন যদি উগ্রবাদীদের হিংস্রতার কারণে আবার ঢালাও ‘ইসলামফোবিয়া’ শুরু হয়, তবে সমাজের প্রকৃত রাজনৈতিক রূপান্তরের পথটিই চিরতরে বন্ধ হয়ে যাবে। প্রশ্ন হলো— উগ্র ইসলামিস্টরা যখন রাজপথে হুমকি দেয় বা মাজার ভাঙতে যায়, তখন প্রশাসন বা রাষ্ট্র নীরব ভূমিকা পালন করে কেন? যেমন সম্প্রতি ফজলুল আবেদীন আব্বাসীর মতো উগ্র বক্তারা প্রকাশ্যে আমার নামে বা অন্যদের নামে উসকানিমূলক হিংস্র বক্তব্য দিচ্ছে— বলছে ফরহাদ মজহারকে হত্যা না করলে ইসলাম কায়েম হবে না! রাষ্ট্র কেন এই উগ্র হিংসাত্মক বক্তব্য প্রদানকারীদের গ্রেপ্তার করছে না? যখন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও রাষ্ট্র তাদের দায়িত্ব পালন করে না, তখনই উগ্রতা ডালপালা মেলে।
আগামীর সময়: ‘ইসলামফোবিয়া’ বা সেক্যুলার স্বৈরাচারের সহযোগী হিসেবে ঢালাওভাবে ‘বামপন্থীদের’ অভিযুক্ত করা হচ্ছে। পেছনে কি সচেতনভাবে ‘বাম-ফোবিয়া’ তৈরির প্রবণতা কাজ করছে?
ফরহাদ মজহার: প্রথমত বুঝতে হবে, ‘বাম’ দাবি করা এ দেশের অধিকাংশ ধারা আসলে মার্কস বা লেনিনের বিপ্লবের চিন্তার সঙ্গে যুক্ত, নাকি তারা স্রেফ সামাজিক ও সাংস্কৃতিক প্রতিক্রিয়াশীলতার অংশ? খেয়াল করুন, যে রুশ সাম্রাজ্যে লেনিন রাজনৈতিক বিপ্লব ঘটালেন, সেখানে বিশাল অর্থোডক্স খ্রিস্টান ধর্মাবলম্বী জনগোষ্ঠী ছিল। কিন্তু লেনিনের কোনো লেখায় কি ঢালাওভাবে খ্রিস্টধর্ম বা ধর্মপ্রাণ মানুষের বিশ্বাসের বিরুদ্ধে বিদ্বেষপূর্ণ প্রচার দেখতে পাবেন? পাবেন না। এ দেশের বামরা ধর্মপ্রাণ মেহনতি মানুষের ইতিহাস ও স্পন্দন বোঝে না।
আগামীর সময়: তেল-গ্যাস-বন্দর-রক্ষার প্রশ্নে বামপন্থীদের যে দীর্ঘ রাজপথের লড়াই— সেটিকে তো অস্বীকার করার সুযোগ নেই। এক্ষেত্রে তাদের ভূমিকা আপনার দৃষ্টিতে কতটা সফল ছিল?
ফরহাদ মজহার: প্রথমত, তেল-গ্যাস-বন্দর রক্ষা আন্দোলনটি একটি গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু হলেও, বামপন্থীদের ব্যর্থতার কারণেই এটি একটি জাতীয় রাজনৈতিক রূপান্তরে ব্যর্থ হয়েছে। তারা এটিকে একটি অতি সংকীর্ণ দলীয় বা একটি নির্দিষ্ট গণ্ডির আন্দোলনে বন্দি করে রেখেছিল। তারা আন্দোলনের মূল সুরকে সাধারণ মানুষের সামগ্রিক জাতীয় মুক্তির রাজনীতিতে রূপান্তর করতে পারেনি। দ্বিতীয়ত, বাম আন্দোলনকারীরা জ্বালানি নিয়ে কার্যকর কোনো বাস্তবসম্মত নীতি জাতিকে দিতে ব্যর্থ হয়েছে। ইস্যুগুলোকে তারা স্রেফ তাদের দলীয় রাজনীতির ‘পণ্য’ বা ‘বাজারে বিক্রি করার মতো এজেন্ডা’ বানিয়েছে।
আগামীর সময়: আপনি আরেকটু স্পেসিফিক করুন...
ফরহাদ মজহার: ফুলবাড়ী আন্দোলনের সময়ে যখন আনু মুহাম্মদ আহত হয়ে হাসপাতালে ছিলেন, তখন কে তাকে দেখতে গিয়েছিল? বিএনপি নেত্রী খালেদা জিয়া নিজে হাসপাতালে গিয়ে তাকে দেখে এসেছিলেন, রাজপথের আন্দোলনের প্রতি রাজনৈতিক সম্মান দেখিয়েছিলেন। কিন্তু এর বিপরীতে তারা কী করেছিলেন? তারা বিরোধী রাজনৈতিক শক্তির সঙ্গে কোনো জাতীয় রাজনৈতিক মৈত্রী গঠন করতে পারল না। তারা বিএনপি থেকে শুরু করে অন্য সব রাজনৈতিক শক্তিকে ‘শত্রু’ বা ‘খারাপ’ ভেবে দূরে ঠেলে দিল অথচ নিজেদের তথাকথিত প্রগতিশীলতার দোহাই দিয়ে দিনের পর দিন আওয়ামী ফ্যাসিবাদকেই স্পেস দিয়ে গেল।
আগামীর সময়: ইতিহাসকে যখন আমরা দূর থেকে মেলাই— ১৯৭৫ সালে সিরাজুল আলম খান-এর ভূমিকা এবং ২০২৪-এর অভ্যুত্থানে আপনার তাত্ত্বিক উপস্থিতি— উভয় ক্ষেত্রেই ক্ষমতায় ছিল আওয়ামী লীগ এবং আপনারা আত্মীয়। এখানে একটা প্রশ্ন করে ফেলতে চাই— বাংলার রাজনৈতিক আকাশে কী নোয়াখালীর একটা ঘনঘটা আছে?
ফরহাদ মজহার: হা হা হা..., এভাবে তো ভাবিনি। প্রশ্নটির উত্তর কিছুটা ব্যক্তিকেন্দ্রিক, আবার একই সঙ্গে রাজনৈতিক ও সামাজিক। প্রথমত, আমাদের পরিবারে একটা পারিবারিক আধ্যাত্মিক ও লোকায়ত ঐতিহ্য সবসময়ই অত্যন্ত প্রভাব বিস্তার করেছিল— বিশেষ করে আমার মায়ের দিক থেকে। আমার মামাতো ভাই হিসেবে সিরাজুল আলম খান (দাদা ভাই) যেমন আমার পারিবারিক সম্পর্কের অংশ ছিলেন, তেমনি আমাদের পরিবারের একটা বিশেষ চরিত্রই ছিল— প্রথাগত দলবাজির চেয়ে ‘মানুষের মনের যত্ন নেওয়া’ এবং তাদের বাস্তব জীবনের কষ্ট অনুধাবন করাকে রাজনীতি ও জীবনের মূল স্পিরিট মনে করত। দাদা ভাই যখন তৎকালীন সময়ে এক হাতে স্বাধীন বাংলা বিপ্লবী পরিষদ ও ছাত্রলীগ গড়ে তুলেছিলেন, তখন কমিউনিস্ট বা অন্যান্য প্রথাগত রাজনৈতিক দলগুলো কিন্তু অত্যন্ত শক্তিশালী ও ডমিন্যান্ট ছিল। কিন্তু তিনি একা হাতে সেই ছাত্র-যুব আন্দোলন গড়ে তুলে শেখ মুজিবুর রহমানের জাতীয় রাজনৈতিক নেতৃত্ব বিকাশের মূল ভিত্তি তৈরি করেছিলেন। তিনি ইতিহাসকে দেখতেন সুভাষচন্দ্র বসুর রাজনীতি দিয়ে— তার মূল যুক্তি ছিল, ১৭৫৭ সালে পলাশীর আম্রকাননে লর্ড ক্লাইভের কাছে যে স্বাধীনতা হারিয়েছি, উপনিবেশবিরোধী লড়াইয়ের সূত্রটি সেখান থেকেই আবার শুরু করতে হবে।
ফলে ১৯৭৫ হোক কিংবা ২০২৪— রাজনৈতিক পরিস্থিতি ও কৌশল ভিন্ন হলেও মূল বিষয় কিন্তু একটাই: খেটে খাওয়া মেহনতি মানুষের মৌলিক রাষ্ট্র গঠন এবং তাদের সার্বভৌম অভিপ্রায়কে রাজপথে ও রাষ্ট্রে জয়যুক্ত করা।
আগামীর সময়: আগামীকাল আপনার ৮০তম জন্মদিন। জন্মদিনের আগাম শুভেচ্ছা আপনাকে।
ফরহাদ মজহার: আপনাকেও ধন্যবাদ।





